কয়রা প্রতিনিধি।।
‘একদিন বাদায় (সুন্দরবনে) না গেলি সংসার অচল হইয়ে পড়ে। এলাকায় তেমন কাজও নেই এখন। বাদাই আমাগের সবকিছুর জোগান দেয়। জীবনের বেশির ভাগ সুমাই বাদাবনে কাইটে যায় আমাগের। কিন্তুক বাদায় এখন ডাকাতির উপদ্রব বাড়িছে। ডাকাতির ভয়ে বাদায় ঢুকতি পারি নে। ডিঙি নিয়া ঢুকলি তাইড়ে আসে দল বেঁধে। ছোট ছাওয়াল-মাইরে ডরে কাঁপে। নিজেগেরও ডর লাগে। তাই বাদায় যাবা ছাইড়ে দিছি। এখন সংসার অচল।’
ক্ষোভ-আক্ষেপ আর অসহায়ত্ব নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন চতুর মুণ্ডা। তাঁর বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন টেপাখালী গ্রামে। ওই গ্রামের অর্ধশতাধিক মুণ্ডা পরিবারের সদস্য মনে করেন, সুন্দরবনের ওপর তাদের আজন্ম অধিকার। গ্রামটির পাশেই ছোট শাকবাড়িয়া নদী। সেই নদী পার হলেই সুন্দরবন। প্রতিদিন ভোর হতেই ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে দলবেঁধে সুন্দরবনে ঢুকে মাছ-কাঁকড়া শিকার করে সন্ধ্যায় গ্রামে ফিরতেন মুণ্ডারা। এভাবে নিয়মে বাঁধা জীবন ছিল তাদের। কয়েক মাস ধরে সুন্দরবনে বনদস্যুরা সক্রিয় হওয়ার পর সে নিয়ম বদলে গেছে। ছন্দপতন ঘটেছে আদিবাসী এ সম্প্রদায়ের জীবনে।
মুণ্ডাদের মতোই সুন্দরবন-সংলগ্ন গ্রামগুলোর বেশির ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বনের ওপর নির্ভরশীল। এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যও গড়ে উঠেছে সেভাবে। সাম্প্রতিক সময়ে বনদস্যুদের অত্যাচার-নির্যাতন বাড়তে থাকায় পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই। বনে যাওয়া বন্ধ হওয়ায় বনজীবী অনেক পরিবারে অভাব-অনটন এখন নিত্যসঙ্গী। বাড়ির পাশে নদীর চরে জেলেদের নৌকাগুলো বাঁধা থাকতে দেখা গেছে।
গত ২৯ নভেম্বর খুলনা রেঞ্জের কাশিয়াবাদ স্টেশন থেকে মাছ ধরার অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনে যান উপজেলার তেঁতুলতলারচর গ্রামের মইনুল ইসলাম (২৫)। ৩ ডিসেম্বর তাঁর বাবা আব্দুর রউফ গাজীর মোবাইল ফোনে অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে। ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি নিজেকে বনদস্যু আলামিন বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে মইনুলকে জিম্মি করার কথা জানায়। তাঁকে ছাড়াতে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়।
সোমবার আব্দুর রউফ গাজী বলেন, ‘আমার ছাওয়ালকে ডাকাতির কাছ থেইকে ছাড়াতি টাকা জোগাড় করতি গিয়ে জানতি পারলাম, তাঁকে কোর্টে চালান করা হয়েছে। কিছুই বুঝতি পারতিছি নে।’
সুন্দরবনলাগোয়া গ্রামগুলোর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সুন্দরবনজুড়েই এখন বনদস্যু আতঙ্ক। জেলেদের কেউ কেউ ভয় উপেক্ষা করে বনে ঢুকলেও অনেকেই আটক হয়ে বনদস্যুদের নৌকা চালাতে বাধ্য হন। কেউ কেউ মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পান। টাকা দিতে না পারায় নিরীহ অনেক জেলে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এমনকি তাদের হরিণের মাংসসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পাঠানো হয়। এই কাজে দস্যুদের সহায়তা করছেন লোকালয়ে অবস্থানকারী সহযোগীরা।
টাকা ছাড়া মুক্তি মেলে না
সম্প্রতি মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পাওয়া কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা হয় । তাদের ভাষ্য, বনদস্যু বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্য সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামগুলোর বাসিন্দা। এলাকার মহাজন নামধারী মাছ ব্যবসায়ীরা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তাদের খাবার, অস্ত্র-গোলাবারুদ সবই সরবরাহ হয় এসব মহাজনের মাধ্যমে। জেলেদের অভিযোগ, বনদস্যুদের কাছে জিম্মি হওয়ার পর ছাড়া পেতেও এসব মহাজনের মধ্যস্থতা লাগে।
প্রতি বাহিনীতে সদস্য ১৫-৪০ জন
জেলেসহ স্থানীয় একাধিক মাছ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জানা গেছে, সুন্দরবনে এখন সক্রিয় আছে ২০টির মতো বনদস্যু বাহিনী। এর মধ্যে রয়েছে আলামিন বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী, মানজুর বাহিনী, দাদাভাই বাহিনী, করিম-শরীফ বাহিনী, আসাবুর বাহিনী, দয়াল বাহিনী, রবি বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, রাঙা বাহিনী, সুমন বাহিনী, আনারুল বাহিনী, হান্নান বাহিনী ও আলিফ বাহিনী। প্রতিটি বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে ৪০ জন। তাদের অনেকের হাতেই আছে আগ্নেয়াস্ত্র। বনের গহিনে আস্তানা থাকা এসব দস্যুর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলা নিরাপদ নয় বলে জানান জেলেরা। তাদের অভিযোগ, মাছের আড়ত ও সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামেও দস্যুদের সহযোগীরা সক্রিয়। কারও বিরুদ্ধে তথ্য ফাঁস হলে পরে বনে ধরা পড়লে নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়ে।
বন বিভাগের সূত্র জানায়, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধাপে ধাপে সুন্দরবন অঞ্চলের ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু আত্মসমর্পণ করেছিল। তারা ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪টি গোলাবারুদ জমা দেয়। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সরকারের পক্ষ থেকে সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়। তবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে দস্যুরা।
এক বছরে অপহৃত তিন শতাধিক
বিভিন্ন সূত্রে এক বছরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে তিন শতাধিক জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে। নৌকাপ্রতি ২০-৩০ হাজার টাকা ও অপহৃত প্রতি জেলেকে মুক্ত করতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হচ্ছে।
বনদস্যুদের সঙ্গে মাছ ব্যবসায়ীর জড়িত থাকার বিষয়ে জানা নেই বলে মন্তব্য করেন কয়রা মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী। তাঁর ভাষ্য, এমন কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে ওই ব্যবসায়ীর সদস্য পদ বাতিল করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবেন।
উপকূল ও সুন্দরবন সুরক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সুন্দরবন থেকে বনদস্যু নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, প্রয়োজনে বন বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করা যায়। বনদস্যুরা নির্মূল না হলে এর ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়বে। পর্যটনেও বিরূপ প্রভাব পড়বে। সব মিলিয়ে বছরে কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে বন বিভাগ।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, বনদস্যু নির্মূলে বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় অভিযান অব্যাহত আছে। আদালতে হরিণ শিকারিকে সোপর্দ করার বিষয়ে বনদস্যু দলের সহযোগীদের সম্পৃক্ততা আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে সুন্দরবনে বনদস্যুর তৎপরতা বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও আলোচনা হয়েছে। শিগগিরই যৌথ অভিযান চালানো হবে।











































