খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
ফুলের রাজধানী হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিতি যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীর। এই এলাকার চাষিরা ফুলের মৌসুমের প্রথম আয়োজন বিজয় দিবসের জন্য সব প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। চাষিরা জানিয়েছেন, এ বছর অতিবৃষ্টির কারণে ফুলের চাষাবাদ শুরু করতে হয়েছে দেরিতে। উৎপাদন ভালো হলেও তারা দুর্ভাবনায় পড়েছেন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট জটিলতা নিয়ে।
গদখালী এলাকার চাষিরা জানিয়েছেন, তারা বছরজুড়ে ফুলের চাষ করলেও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এই দুই মাসেই চাষ হয় বেশি। এর আগে ডিসেম্বরের মহান বিজয় দিবস, ক্রিসমাস ডে, জানুয়ারির শুরুতে খ্রিষ্টীয় নতুন বছর, ফেব্রুয়ারিতে বসন্তবরণ, ভ্যালেনটাইনস ডে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও মহান শহীদ দিবস এবং স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের কর্মসূচি ঘিরে ফুলের ব্যাপক চাহিদা থাকে দেশজুড়ে। নিবিড় পরিচর্যায় মাঠে মাঠে এখন শোভা পাচ্ছে গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ, জারবেরা ও গ্লাডিওলাসসহ নানা ধরনের ফুল। গাছে গাঁদা ফুল ধরে রাখতে চলছে ভিটামিন ও বালাইনাশক স্প্রে। এর মধ্যে বাড়তে শুরু করেছে সব ধরনের ফুলের দামও। বিজয় দিবসের আগে এই দাম আরও বাড়বে বলে আশা করছেন চাষিরা।
গদখালীর ফুলচাষি ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা শীতের মৌসুমের বিশেষ দিবসগুলো ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে থাকি। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের জন্য কয়েক মাস আগে থেকেই ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকি। এবারও আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে ফুলের দামে ধস নেমেছে। বিশেষ দিবসগুলোতে ফুলের দাম বাড়বে কিনা সংশয় রয়েছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে ফুলের বাজার। তবুও আশা করছি, বাজার ভালো হবে।’
যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পাশে অবস্থিত গদখালী বাজার জেলা শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে এখানে বসে ফুলের মোকাম। চাষিরা উৎপাদিত ফুল নিয়ে হাজির হন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। গদখালীতে বছরে ৫০০-৬০০ কোটি টাকার ফুল হাতবদল হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে দেখা যায়, কেউ বাইসাইকেলে কেউবা ভ্যানে করে বাহারি সব ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এদিন প্রতি পিস গোলাপ বিক্রি হয়েছে ৩-৪ টাকায়। রজনীগন্ধার দাম ছিল ৮-১৫ টাকা। এ ছাড়া জারবেরা ৮-১০ টাকা, গাঁদা প্রতি হাজারের দর মিলেছে ১০০ টাকা। গ্লাডিওলাস ৬-৮ টাকা ও চন্দ্রমল্লিকা বিক্রি হয়েছে ২-৩ টাকায়।
মোকামে ফুল বিক্রি করতে আসা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শীতকালে ফুলের উৎপাদন ও বিক্রি বাড়ে। এ বছরও আমরা ফুল বিক্রির প্রস্তুতি নিয়েছি। আজকে বাজারে গোলাপ ফুল বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ তিন টাকা পিস। বর্তমানে বাজারে গোলাপ ও গাঁদার দাম সবচেয়ে কম। বাকি সব ফুলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। আশা করছি বিজয় দিবস উপলক্ষে সব ধরনের ফুলের দাম বাড়বে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে ফুলের বাজার।’
যশোর কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার প্রায় সাড়ে ৬০০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ১৩ ধরনের ফুলের চাষ হয়। এ ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে যুক্ত মানুষের সংখ্যা লক্ষাধিক।
ঝিকরগাছার কুলিয়া গ্রামের আরিজুল ইসলাম এক বিঘা জমিতে রাজনীগন্ধার চাষ করেছেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ টাকার ফুল বিক্রি করেছেন। আরিজুল ইসলামের আশা, আরও প্রায় তিন লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবেন।
পটুয়াপাড়ার চাষি তৈয়ব আলীর এক বিঘা জমিতে গোলাপ চাষে খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, গোলাপ ফুলের উৎপাদন বেশি। যে কারণে দাম কমেছে। গাঁদা ফুলের দামেও ধস নেমেছে একই কারণে।
যশোর ফুল উৎপাদন ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিমের ভাষ্য, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে অনুষ্ঠান বা জাতীয় দিবসগুলো জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয় না। তখন ফুলের চাহিদা ও বিক্রি কমে যায়। দিবসগুলোতে ফুলের দাম আরও বাড়বে– এই আশায় বুক বাঁধছেন।









































