ঢাকা অফিস
সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত তেল মজুদ থাকার কথা বলা হলেও দেশের পাম্পগুলোতে গ্রহীতাদের লাইন দীর্ঘ হচ্ছে| জ্বালানি সংকটের কারণে গ্রাহকদের ভোগান্তি শুধু মাঠে আটকে নেই| এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে জাতীয় সংসদে| তবে ভোক্তা পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার নিশ্চিত করতে এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু|
রবিবার (১৯ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদেরর প্রথম অধিবেশনের ১৬তম দিনে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের লিখিত প্রশ্নের জবাবে এই দাবি করেন টুকু| জ্বালানি সংকটের পাশপাশি বিদ্যুতের লোডশেডিং বাড়ছে| আর গ্যাস সংকটের কথা সংসদে ¯^ীকার করেছেন মন্ত্রী নিজেই| জাতীয় সংসদে তেল-বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট নিয়ে সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের মুখে পড়েছেন সরকারের মন্ত্রীরা|
সংসদে ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনায় ¯^তন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কাদ¤ি^নী মরিয়া প্রমাণ করিল যে, কাদ¤ি^নী মরে নাই| আমাদের তেলের দাম শেষমেশ বৃদ্ধিই হইলো| কিন্তু তার আগে আমরা দেখলাম কয়েক কিলোমিটার জুড়ে ল¤^া লাইন| মাঝরাত পর্যন্ত ড্রাইভাররা দাঁড়িয়ে আছে, তারা তেল পাচ্ছে না| কিন্তু সরকারের সে ব্যাপারে কোনও হেলদোল নাই|”
রুমিন ফারহানা বলেন, “মন্ত্রীরা যখন সংসদে বক্তব্য দেন, তখন তারা অবলীলায় বলেন, বাংলাদেশে জ্বালানির কোনও ঘাটতি নাই| কিন্তু মাননীয় স্পিকার, যখন তেল নিতে যায়, তখন দেখা যায় তিন কিলোমিটার ল¤^া লাইন|”
¯^তন্ত্র এই সংসদ সদস্য বলেন, “সরকার সম্ভবত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করবার ঘোষণা দিয়েছে| তার একটা হচ্ছে— মার্কেটপ্লেস ৭টা বাজে বন্ধ করে দেওয়া| চমৎকার সিদ্ধান্ত| তবে মনে রাখতে হবে, কেনাকাটা বা শপিং যেটুকু হয়, সেটুকু সন্ধ্যার পরেই হয়| তার আগে হয় না| দুই হলো— অফিস-আদালতের সময় নাকি পরিবর্তন করবে| পাঁচ দিনের জায়গায় চার দিন বা তিন দিন তারা কর্মঘণ্টা ঠিক করবে| কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, যদি জ্বালানির কোনও সংকটই না থাকে, তাহলে এত ল¤^া লাইনই-বা কেন? দামই বাড়াইতে হয় কেন? অফিস কর্মসূচির সময় পরিবর্তন করতে হয় কেন? এই প্রশ্নগুলো তো ওঠে মাননীয় স্পিকার|”
স্পিকারের উদ্দেশে রুমিন বলেন, “আপনার মাধ্যমে এই সংসদের কাছে আমি জানতে চাই, জ্বালানিমন্ত্রী যখন গণমাধ্যমে কথা বলেন, তখন মনে হয়, বাংলাদেশে আল্লাহর রহমতে কোনও সংকট নাই| উনারা যদি পরিষ্কার করে বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে কত দিনের অকটেন-ডিজেলের মজুত আছে, কত দিন চলতে পারবে, পাম্পগুলো কেন পর্যাপ্ত পরিমাণ তেল পায় না|”
রুমিন ফারহানা বক্তব্য দেওয়ার সময় সরকারি দলের এমপিরা হইচই করতে থাকেন| এসময় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা রুমিন ফারহানার পক্ষে অবস্থান নেন| এসময় স্পিকার বলেন, “মাননীয় সদস্যবৃন্দ, প্লিজ লেট আস ডিসিপ্লিন আওয়ারসেলভস|”
এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, “এই সংসদ দেশের সর্বোচ্চ সম্মানের জায়গা| যারা এখানে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, দেশের জনগণের সমর্থন, ভোট, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা নিয়ে এসেছেন| আমরা সব সদস্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলবো, কোনও সংসদ সদস্য যখন দাঁড়িয়ে কোনও কথা বলবেন, তা নিয়ন্ত্রণ অথবা তাকে অ্যালাও করার একক এখতিয়ার হচ্ছে স্পিকারের|”
বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, “আজকে লক্ষ করলাম যে, একজন ¯^তন্ত্র সংসদ সদস্য, তিনি যখন কথা বলছিলেন, দুঃখজনকভাবে ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে সম্মানিত কিছু সদস্য এমন কিছু অঙ্গভঙ্গি করেছেন, যেটা আমার বিবেকে আঘাত লেগেছে| আমি এটা আশা করি না| এমনকি আমি এও লক্ষ করলাম, একবার দুইবার নয়, চারবার-পাঁচবার নির্বাচিত হয়ে সংসদে যারা এসেছেন, তাদের কেউ কেউ এই কাজটা করেছেন| আমি এখানে তাদের নাম বলে নিজে লজ্জা পেতে চাই না|” বিরোদী দলীয় নেতা এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে নিন্দা জানান|
এর আগে নোটিশের আলোচনায় গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আইউবী বলেন, “এখন আমাদের বিশেষ করে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়| সেখানে চিকিৎসাব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে| বিদ্যুৎ না থাকার কারণে সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে| এসএসসি পরীক্ষার্থীরা হায় হায় করছে| বিদ্যুতের সংকটের কারণে চতুর্দিকে যে অবস্থা চলছে, এটা উত্তরণে আশু ব্যবস্থা না নিলে তারা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে|”
এর আগে প্রশ্নোত্তর পর্বে লিখিত জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “দেশের বিভিন্ন স্থানে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে জ্বালানি তেলের মজুত ও কালোবাজারি করছে| ফলে পাম্পগুলোতে কৃত্রিম তেলসংকট ˆতরি হচ্ছে| ‘দেশে জ্বালানির কোনও সংকট নেই’|”
সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ আরও বলেন, সরকার গত বছরের মার্চে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করেছে, চলতি বছরের মার্চে একই পরিমাণ তেল সরবরাহ করেছে|
জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, “জ্বালানি তেলের সরবরাহ ¯^াভাবিক রাখার লক্ষ্যে সারা দেশে জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও বিপিসি ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে| প্রতিদিন অবৈধ মজুতদারকে আইনের আওতায় এনে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে| মজুত ও কালোবাজারি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত আছে| এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে| সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ১১৬টি অভিযানে ৩ হাজার ৫১০টি মামলা হয়েছে| ১ কোটি ৫৬ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ টাকা অর্থদণ্ড আদায় হয়েছে| ৫ লাখ ৪২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার হয়েছে|”
সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “দেশের এলপিজির বাজার প্রায় ৯৮ দশমিক ৬৭ ভাগ আমদানিনির্ভর| মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে এলপিজির সরবরাহ ¯^াভাবিক রাখতে আমদানি পরিস্থিতি নিয়মিতভাবে মনিটর করা হচ্ছে| এ লক্ষ্যে জাতীয় রাজ¯^ বোর্ডের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম থেকে নিয়মিত দেশে এলপিজির আমদানি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে| কোনও অ¯^াভাবিকতা দেখা গেলে সে বিষয়ে আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে| তাছাড়া ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে জানানো হচ্ছে|”
বিদ্যুৎ মন্ত্রী জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ জারি করা হয়েছিল| এই আইনের আওতায় কোনও ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র বা ক্রয় প্রক্রিয়া ছাড়াই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অযাচিত প্রস্তাব অনুমোদনের সুযোগ ˆতরি করা হয়|
তিনি বলেন, “এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রভাবশালী নেতারা এবং তাদের আত্মীয়-¯^জনরাও জড়িত ছিলেন| এতে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে|” তিনি আরও জানান, লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সমšি^তভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে| দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে|
বকেয়া বিল ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা: সংসদ সদস্য এস. এম. জাহাঙ্গীর হোসেনের লিখিত প্রশ্নের বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী জানান, দেশের বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ ˆতরি হয়েছে| সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল এবং ব্যাংকের কাছে ঋণের পরিমাণ বিশাল আকার ধারণ করেছে| গত ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকারও বেশি| এর বাইরেও ব্যাংক খাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ঋণের বোঝা রয়েছে প্রায় দেড় লক্ষ কোটি টাকা|
পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার প্রয়োজন হয় না: সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “বছরে ১৩ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়| ¯^াভাবিক অবস্থায় আমদানিকৃত ক্রুড অয়েলের শতভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি করা হয়| পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না| সামগ্রিকভাবে মোট আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ থেকে ২৩ শতাংশ জ্বালানি তেল হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে পরিবহন করা হয়ে থাকে| বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিপিসির সম্মত কার্গো প্রাপ্তিতে ¯^াভাবিক সময়ের চেয়ে বিল¤^ হচ্ছে| দেশে জরুরি চাহিদা পূরণের জন্য বিকল্প উৎস হতে জ্বালানি তেল আমদানির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে|”









































