খুলনা জেলা কারাগারে “দুই মাদক সম্রাটের সমর্থকদের সংঘর্ষ” এই সংবাদটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থার গভীর অসুস্থতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। যেখানে রাষ্ট্র বন্দিদের শোধরানোর দায়িত্ব নেয়, সেখানে কারাগারই আজ অপরাধীদের ক্ষমতার আস্তানা-এ দৃশ্য শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং লজ্জাজনক। গতকাল শনিবার বিকেলে খুলনা জেলা কারাগারে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে আধাঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও হাতাহাতি হয়েছে। এতে কয়েকজন আহত হলেও মূল প্রশ্ন আহতের সংখ্যা নয়, বরং-কীভাবে একটি কারাগারের ভেতরে দুই মাদক সম্রাটের গ্রুপ তৈরি হয়, নেতৃত্ব দেয়, এমনকি সংঘর্ষে জড়ায়-আর প্রশাসন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে? এ ঘটনা প্রমাণ করে, কারাগার এখন ‘শাস্তি ও সংশোধনের জায়গা নয়’, বরং প্রভাব ও ক্ষমতার নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। কারা প্রহরীদের চোখের সামনে যদি দুই অপরাধচক্র এমন সংঘর্ষে জড়াতে পারে, তাহলে ভিতরে মাদক, মোবাইল ফোন-সবকিছু প্রবেশ করছে না, এমন দাবি করাই হাস্যকর।
কারাগার প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। সংঘর্ষের সময় পুলিশ বাইরে থেকে “পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ” করেছে-এমন তথ্য শুনে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি শুধু ঘটনা শেষে বিবৃতি দেওয়া, নাকি এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে বন্দিরা নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ থাকবে? খুলনা জেলা কারাগারের এই ঘটনা একটি বড় সতর্কবার্তা। দেশের অনেক কারাগারই এখন রাজনৈতিক, অপরাধী ও মাদক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ‘অফিস ঘর’-এ পরিণত হয়েছে। যেখানে “প্রভাব” মানে, কে কয়জন বন্দিকে নিয়ন্ত্রণ করে, কে কতজন কারারক্ষীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। এই সংস্কৃতি চলতে থাকলে কারাগার অপরাধ নির্মূল নয়, বরং অপরাধের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে। রাষ্ট্রকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে-কারা প্রশাসনকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ করা ছাড়া এ অবস্থা থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন কারাগারে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা, এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা–কর্মচারীদের কঠোর শাস্তি। কারাগার কোনো গ্যাংয়ের যুদ্ধক্ষেত্র হতে পারে না। যদি কারাগারেও ‘মাদক সম্রাটদের’ প্রভাব চলে, তাহলে দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থা কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে-সেই প্রশ্ন আজ প্রতিটি নাগরিকের। এখন সময় এসেছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাব দেওয়ার- “কারাগারে আসল রাজা কে-রাষ্ট্র, না মাদক সম্রাট?”











































