Home Lead কপোতাক্ষের কূল-কিনার আছে, প্রাণ নেই

কপোতাক্ষের কূল-কিনার আছে, প্রাণ নেই

29


কয়রা প্রতিনিধি
খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের খরস্রোতা কপোতাক্ষ নদ এখন প্রাণহীন সরে খালে পরিণত হয়েছে। ২০-২৫ বছর আগেও নদটি ছিল এ অঞ্চলের প্রধান যাতায়াত ও নদীপথে বাণিজ্যের মাধ্যম। সূত্রঃ সমকাল
খনন না করায় নদে পলি জমে নাব্য সংকট হয়েছে। যে কারণে বছরের অধিকাংশ সময় নদটি বালুচরে রূপ নেয়। দখল হচ্ছে নদের দুই পাড়। গড়ে উঠছে জনবসতি, প্রতিষ্ঠান। এতে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন কৃষকরা। নদের পানি সেচকাজে ব্যবহার করতে না পারায় ফসল উৎপাদনে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে তাদের।
কপোতাক্ষ নদটি যশোর, সাতক্ষীরা হয়ে খুলনার কয়রা উপজেলার বুক চিরে শিবসা নদীতে গিয়ে মিশে গেছে। কয়রা উপজেলার আমাদী এলাকা থেকে প্রবাহিত হয়ে পার্শ্ববর্তী পাইকগাছা উপজেলার বোয়ালিয়া পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার খরস্রোতা কপোতাক্ষ নদের অংশটি প্রাণ হারিয়েছে ২০-২৫ বছর আগে।
এক সময়ের ১৫০ মিটার প্রশস্ত নদটি এখন ৩-৪ মিটার প্রাণহীন সরু খালে পরিণত হয়েছে। ভাটায় সেখানে নৌকা চালানো যায় না।
হেঁটেই পার হয় মানুষ। নদের প্রাণ হচ্ছে বিলের পানি, কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় কালভার্ট, সেতুর মুখ বন্ধের কারণে পানি ঠিকভাবে প্রবাহিত হচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশাল এলাকাজুড়ে নতুন নতুন চর জেগে উঠেছে। যা একের পর এক দখল করে নেওয়া হচ্ছে। তৈরি করা হয়েছে পাকা ও কাঁচা-পাকা একাধিক বসতবাড়ি ও দোকানপাট। আবার নদের জেগে ওঠা চর ভূমিদস্যুরা অবৈধভাবে দখল করে মাছের ঘের করেছে।
এ ছাড়াও নদের চর ভরাটের জায়গায় জনবসতি ও সরকারিভাবে ভূমিহীনদের জন্য ঘর নির্মাণ করায় দখলবাজদের অধীনে চলে যাচ্ছে সমস্ত এলাকা। জোয়ারের সময় কপোতাক্ষ নদে কোনো পানিই ওঠে না।
কপোতাক্ষ পাড়ের মসজিদকুড় গ্রামের বাসিন্দা আজিবর সানা জানান, ২০ বছর আগেও এই দুটি নদী ঘিরে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা চলত। বণিকরা কপোতাক্ষ নদ দিয়ে কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলায় বাণিজ্য করতে আসতেন। বড় বড় মালবাহী জাহাজ চলত, জোয়ার-ভাটা, মাছ শিকার ও নৌযান চলাচল ছিল নিয়মিত চিত্র। ধীরে ধীরে কপোতাক্ষ নদে পলি জমে ভরাট হয়ে যায়। পরে নদ খনন করা হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে ফের ভরাট হয়ে গেছে। এ অবস্থায় এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পানিতে তলিয়ে যায় কৃষিজমি, বসতবাড়ি।
কয়রার আমাদী এলাকার কপোতাক্ষের পাশেই রফিকুল ইসলামের বাড়ি। পুরোনো দিনের স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘একসময় তাঁর বাড়ির পাশেই ছিল লঞ্চঘাট। ১৫-২০ বছর আগেও এই নদে স্রোত ছিল, ছিল জোয়ারভাটা। কিন্তু কপোতাক্ষের দিকে তাকালে এখন সে কথা বিশ্বাস করাই কঠিন।’
স্থানীয় বাসিন্দা রুদ্র রাজন জানান, কপোতাক্ষ নদ আগাগোড়া ভরাট হয়ে গেছে। নদ দখল করে গড়ে উঠেছে জনবসতি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান। দ্রুত নদ খনন ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা না হলে কপোতাক্ষ নদ যেটুকু আছে সেটুকুও বিলীন হয়ে যাবে। পুরোটাই দখল করে নেবে দখলবাজরা। কপোতাক্ষ নদের প্রবাহ স্বাভাবিক না রাখতে পারলে নদপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকায় আরো বিপর্যয় নেমে আসবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) খুলনা-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, ‘কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে কিছু অংশে খনন করা হয়েছে। খুলনার পাইকগাছার বোয়ালিয়া থেকে কয়রা উপজেলার আমাদী পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ প্রক্রিয়াধীন।’
তিনি আরো বলেন, ‘কিছু জায়গায় দুদিক থেকে পানির সঙ্গে পলি এসে দ্রুত ভরাট করে দিচ্ছে। এ ছাড়া ফারাক্কা বাঁধের কারণে ভারত থেকে পানি কম আসে। ফলে পদ্মা, মেঘনা ও মধুমতী নদীর সঙ্গে এসব নদীর সংযোগও অনেক কমে গেছে। সে কারণে পানির প্রবাহ কম থাকায় পলি জমে যাচ্ছে। ভরাট হচ্ছে নদ। পুরো দক্ষিণাঞ্চলের সব নদী নিয়ে স্টাডি করতে হবে। তারপর সেই আলোকে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই সুফল মিলবে।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রুলী বিশ্বাস বলেন, ‘কপোতাক্ষ নদটি খনন হলে জলাবদ্ধতা নিরসন হবে। সেই সাথে নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম হবে।’