মিলি রহমান।।
বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের মধ্যে ওজন নিয়ন্ত্রণ বা ওজন কমানো একটি আলোচিত বিষয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায়, চিয়া সিড ও ওটস যেন ওজন কমানোর জাদুকাঠি! অনেকেই মনে করেন, এই দুটি খাবার না খেলে যেন ওজন কমানো সম্ভব নয়। বাস্তবতা হলো, চিয়া সিড ও ওটস নিঃসন্দেহে উপকারী খাবার, তবে এগুলো ছাড়া ওজন নিয়ন্ত্রণ করা একেবারেই অসম্ভব—এই ধারণাটি ভুল। এ বিষয়ে চ্যানেল 24 অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন রাজধানী ঢাকার লাইফ কেয়ার মেডিকেল সেন্টার অ্যান্ড বিডিএন পল্লবী ডায়াবেটিস সেন্টারের ডায়েটিশিয়ান ইসরাত জাহান ডরিন।
চিয়া সিডে রয়েছে ফাইবার, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরাট রাখে। অপরদিকে, ওটস কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সম্পন্ন একটি শস্য, যা রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়তে সাহায্য করে এবং হজম হতে সময় নেয়। তবে এই দুটি উপাদানই একমাত্র নয়—সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপনই হচ্ছে ওজন নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। এবার জেনে নেয়া যান কীভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব-
১. ক্যালোরির হিসাব রাখা: শরীরের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন কত ক্যালোরি গ্রহণ করছেন এবং কতটুকু ব্যয় করছেন, এই হিসাব রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। চিয়া সিড বা ওটস ছাড়াও কম ক্যালরিযুক্ত ও উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ সবজি, ফলমূল, ডাল, বাদাম, মিষ্টিকুমড়ার বিচি, ঢেঁড়স, চাল কুমড়ার মতো খাবার দিয়ে আপনি দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করতে পারেন।
২. প্রোটিনের সঠিক অন্তর্ভুক্তি: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিম, মুরগির বুকের মাংস, মাছ, মসুর ডাল, ছোলা ইত্যাদি প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার রাখলে পেট ভরাট থাকে দীর্ঘসময়। এতে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে।
৩. প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন: ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত চিনি ও ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি যুক্ত করে এবং চর্বি জমার প্রধান কারণ। এগুলো যত কম খাবেন, ওজন তত সহজে শরীর নিয়ন্ত্রণে আসবে।
৪. শারীরিক পরিশ্রম ও জীবনধারা: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, সাঁতার কাটা, যোগব্যায়াম বা হালকা দৌড় শরীরের বিপাক হার বাড়ায়, যা ওজন কমাতে সহায়ক। পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৫. পানির যথাযথ গ্রহণ: অনেকেই খিদে ও তৃষ্ণাকে গুলিয়ে ফেলেন। পর্যাপ্ত পানি পানের মাধ্যমে আপনি অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ এড়াতে পারেন এবং বিপাক ক্রিয়াও সঠিকভাবে চলবে।
৬.মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ কর্টিসল হরমোন বাড়ায়, যা পেটের চর্বি বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। ধ্যান, যোগব্যায়াম বা নরমাল রিলাক্সেশন অ্যাক্টিভিটি ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত ভুল ধারণা: ইসরাত জাহান ডরিন বলেন, আমরা অনেকেই ভাবি ওজন কমাতে বিদেশি খাবারই লাগবে। আমাদের অনেকের মাঝে ধারণা তৈরি হয়েছে যে বিদেশি বা নামিদামি সুপারফুড ছাড়া ওজন কমানো সম্ভব নয়। অথচ আমাদের দেশের স্বাভাবিক খাদ্য উপাদানগুলো—যেমন শাক, ডাল, লাউ, মাছ, ডিম ইত্যাদি—খুবই উপযোগী। মূল বিষয় হলো পরিমাণ ও ভারসাম্য। প্রতিটি পুষ্টি উপাদানের সঠিক অনুপাত রক্ষা করলেই ওজন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
চিয়া সিড বা ওটস নিশ্চয়ই উপকারী, কিন্তু ওজন নিয়ন্ত্রণ কেবল সেগুলোর উপর নির্ভরশীল নয়। আপনি যদি চিয়া সিড বা ওটস পছন্দ না করেন বা প্রাপ্তির অসুবিধা থাকে, তাহলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। দেশি ও সহজলভ্য খাবারকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে, পরিমিত খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম, ঘুম এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রেখেই আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। স্মরণ রাখতে হবে—ওজন কমানো কোনো ম্যাজিক নয়, এটি একটি ধৈর্য ও সুপরিকল্পিত অভ্যাসের ফল।










































