ঢাকা অফিস
জনআকাঙ্খা পুরণে দলকে ‘সর্বাত্মক প্রস্তুত’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। শুক্রবার দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলের বৃহস্পতিবারের বর্ধিত সভার প্রস্তাবলী ও সিদ্ধান্তে একথা জানানো হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএনপিকে জনআকাঙ্খা পূরণের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বর্ধিত সভায় দল এবং সকল অঙ্গ দল ও সহযোগী সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের জনবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে জনগণের মাঝে সক্রিয় হওয়ার এবং কথা ও কাজে জনগণের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা অর্জনের নির্দেশ দিচ্ছে।
একই সাথে দলীয় নীতি, আদর্শ, কর্মসূচি বাস্তবায়নে অবহেলা এবং দুর্নীতি-অনাচারসহ গণবিরোধী সকল কর্মকাণ্ড ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে বিরত থাকার জন্যও সকলকে কঠোর নির্দেশ প্রদান করছে।
বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনের এলডি হল সংলগ্ন মাঠে বিএনপির বর্ধিত সভা হয়। সকাল ১১টায় শুরু হওয়া এই বর্ধিত সভা রাত সাড়ে ১১টায় শেষ হয়।
লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বর্ধিত সভায় সভাপতিত্ব করেন। এতে লন্ডনে চিকিৎসাধীন দলের চেয়ারম্যান বেগম খালেদা জিয়া প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন।
সভার মূল মঞ্চে ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন স্থায়ী কমিটির সদস্য এজেডএম জাহিদ হোসন।
দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যগণসহ জাতীয় নির্বাহী কমিটি, মহানগর, জেলা, উপজেলা, থানা, পৌর কমিটির নেতৃবৃন্দ, অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ, ২০১৮ সালে সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থী ও মনোনয়ন ইচ্ছুক প্রার্থীগণ এবং বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ মিলে সাড়ে তিন হাজার নেতা এই বর্ধিত সভায় অংশ নেন।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সকালে উদ্বোধনী পর্বে এবং রাতে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যের পর সমাপনী বক্তব্য দেন।
শুক্রবার বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সভার প্রস্তাবলী ও সিদ্ধান্তগুলো জানায় বিএনপি। এতে বলা হয়, স্বাধীনতার ঘোষক বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের ঘোষিত-‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’ এই আদর্শকে ধারণ করে এই সভা ‘ঐক্যেই শক্তি-ঐক্যেই মুক্তি’ এই আপ্তবাক্যকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দলের সৎ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করে বিজয়ের পথে এগিয়ে চলার দূঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেছে।
‘২০১৫ সালে বেগম খালেদা জিয়ার ঘোষিত ভিশন ২০৩০ এবং যুগপৎ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দলের সমর্থনে গৃহিত ২০২৩ সালে তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের রূপরেখার আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচী বাস্তবায়নে ফ্যাসীবাদ বিরোধী সকল দল/সংগঠনের সাথে মিলে অব্যাহতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলা হয়, ঐক্যমত্যে গৃহিত যে সব সংস্কার প্রস্তাব নির্বাচনের আগে বাস্তবায়ন সম্ভব তা অবিলম্বে বাস্তবায়ন এবং যে সব সংস্কারের জন্য আইন কিংবা সংবিধান পরিবর্তন প্রয়োজন তা নির্বাচিত জাতীয় সংসদে অনুমোদনের লক্ষ্যে পেশ করার জন্য বিএনপি বর্ধিত সভায় প্রস্তাব করছে।’
সর্বাগ্রে সংসদ নির্বাচনের দাবি : একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমেই শুধু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে থাকে। এই মৌলিক অধিকার থেকে এদেশের জনগণকে প্রায় দেড় যুগ বঞ্চিত রাখা হয়েছে।
ফলে এই বঞ্চনার মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে যথাশীঘ্র সম্ভব সর্বাগ্রে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি : দেশে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির অযৌক্তিক উর্দ্ধগতি এবং আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির ক্রমবর্দ্ধমান অবনতিতে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখা এবং আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি উন্নত করার জন্য অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের প্রতি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল এবং শ্রেণী-পেশার সংগঠনকে আস্থায় নিয়ে সম্মিলিতভাবে পতিত সরকারের সৃষ্ট ও সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের পাশাপাশি অযৌক্তিক কারণে আন্দোলনের নামে জনজীবন বিপর্যস্তের অপচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে গণ প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। চাঁদাবাজী, দখলদারিত্ব ও বিশৃংখলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারি ব্যর্থতা গ্রহণযোগ্য নয়।
সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি : গণবিরোধী ও মানবতাবিরোধী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ তার সহযোগীরা কিভাবে নির্বিঘ্নে দেশ থেকে পালিয়ে গেল এবং এখনও অসংখ্য অপরাধী অবাধে বিচরণ করছে তার একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা বিএনপির বর্ধিত সভা সরকারের কাছে দাবি করছে। এই সকল অপরাধীর বিচার ও শাস্তি প্রদানে বিলম্বে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, বিদেশে অবস্থান করে যারা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও শান্তি-শৃংখলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এবং অপপ্রচার চালাচ্ছে তাদের এবং তাদের দেশীয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে কার্যকর কূটনৈতিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের আরো উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। একই সাথে এই সভা পতিত ফ্যাসিবাদী সরকার এবং তাদের সহযোগী এক-এগারোর সরকারের দায়ের করা সকল মিথ্যা ও গায়েবী মামলা দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানায়।
বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার অঙ্গীকার : বর্ধিত সভায় ঐক্যবদ্ধ বিএনপি ও অঙ্গদল, সহযোগী সংগঠনগুলোকে আরো ঐক্যবদ্ধ, শক্তিশালী, কার্যকর ও জনপ্রিয় করার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দীর্ঘ দিন ধরে রাজনৈতিক অধিকারবিহীন, অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত ও মানবিকভাবে অবহেলিত জনগণকে তাদের কাঙ্খিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক মর্যাদায় ফিরিয়ে দেওয়ার প্রধান দায়িত্ব দেশের সবচেয়ে বড়, নির্ভরযোগ্য এবং অতীতে বার বার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রদানকারী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রশংসা : বর্ধিত সভায় ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যূত্থানের ভিত্তি স্থাপন ও শক্তিশালী করণের মাধ্যমে বিজয়ী করার লড়াইয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কৌশলী, সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গণতন্ত্রকামী জনগণের প্রশংসা অর্জন করেছে। দলের দুঃসময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে দলের কার্যক্রমকে শক্তিশালী, দলকে ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত করা, বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এবং সর্বোপরি ফ্যাসিবাদ পতনে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। একই সাথে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনে নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত নেতা-কর্মীদের সহায়তার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি মানবিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।
বর্ধিত সভায় দীর্ঘ ১৬ বছরের অবিরাম আন্দোলন এবং তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই আগস্টের ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণঅভ্যূত্থানের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং আহত, পঙ্গু, দৃষ্টিহীন ও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে সকল প্রকৃত শহীদদের তালিকা প্রণয়ন, তাঁদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান, তাঁদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান, আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের সুচিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে।
লন্ডনে চিকিৎসাধীন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আশু আরোগ্যে দেশবাসীসহ দলের সর্ব স্তরের নেতা-কর্মীদের কাছে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করার আহ্বান জানানো হয়।











































