>> মামলা দায়ের, তিনজন পুলিশ হেফাজতে >> চার মাসে ১২ খুনে নাগরিক নেতাদের উদ্বেগ
স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অর্নব সরকার হত্যাকান্ডে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন জনকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় থানায় অজ্ঞাতনামা আসামীদের নামে মামলা করেছে নিহতের পিতা নীতিশ সরকার। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে বাবার ঠিকাদারী ব্যাবসা, নারী সংশ্লিষ্ট বিষয়, সন্ত্রাসী গ্রুপের কোন সংশ্লিষ্টতাসহ নানা বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে নিহতের পরিবারের দাবী অর্নব শান্ত শিষ্ট ছেলে, রাজনীতি বা সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে কোন সংশ্লিষ্টতা নেই তার।
শুক্রবার বিকালে নগরীর ইসলাম কমিশনার মোড়ের বাসা থেকে বের হয় অর্ণব সরকার। রাত আটটার দিকেও তাকে বসুপাড়া এতিম খানা মোড়ে দেখা যায় বলে জানায় পরিবার।
রাত আটটার দিকে তেঁতুলতলা মোড়ে সন্ত্রাসীদের গুলি ও ধঁড়ালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হয় সে। পরিবারের সদস্যরা বলছেন হত্যাকান্ডের কারন হিসাবে তারা কিছুই ভাবতে পারছেন না। অর্ণব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ পড়ছিল সে আর বাবা নীতিশ সরকারের ঠিকাদারী পেশায় সহযোগিতা করত। দুই ভাইয়ের মধ্যে সে বড়। তার কেন রাজনৈতিক বা সন্ত্রাসী সংশ্লিষ্টতা নেই।
অর্ণবের কাকা তুষার সরকার জানান, অর্ণব সরকারের মত ভালো ছেলে আর নেই। ও কোন রাজনীতির সাথে জড়িত না। এলাকার কেউ ওকে নিয়ে কোন খারাপ কথা বলতে পারবে না। ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে তিনি বাবার কাজে সহযোগিতা করতেন। আমাদের পরিবারের সবার খেয়াল রাখতো।
আরেক কাকা সুকুমার সরকার জানান, হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসাবে আমরা কোন কিছুই ভাবতে পারতেছি না। আমাদের পরিবারের কেউ কোন রাজনীতি বা দলদারী করে না।
শনিবার দুপুরে পোস্ট মর্টেম শেষ হওয়ার পরে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। হত্যাকান্ডের ঘটনায় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন জনকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে বাবার ঠিকাদারী ব্যাবসা, নারী সংশ্লিষ বিষয়, সন্ত্রাসী গ্রুপের কোন সংশ্লিষ্টতাসহ নানা বিষয় খতিয়ে দেখছে তারা।
অর্ণব হত্যাকাণ্ড নিয়ে খুলনায় গত চার মাসে বারোটি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। যা েিনয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক নেতারা।
এদিকে শনিবারও সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ছোপ ছোপ রক্ত পড়ে আছে। জায়গাটি ইট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। উৎসুক মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখছেন।
অর্ণবদের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার রাজনগর গ্রামে। তাঁর বাবা নীতীশ চন্দ্র সরকার একজন ঠিকাদার। তাঁরা ১৫ বছর ধরে খুলনা নগরের বানরগাতি ইসলাম কমিশনারের মোড় এলাকার করতোয়া লেনে বাড়ি করে বসবাস করছেন। ওই লেনের একেবারে শেষ বাড়িটি তাঁদের।
অর্ণবের লাশ শনিবার দুপুরে বাড়িতে পৌঁছায়। দুপুর ১২টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। লাশ বাড়িতে নিয়ে ঘণ্টাখানেক রেখে সৎকারের জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে গিয়ে দেখা যায়, লাশ সৎকারের জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাড়িতে অর্ণবের মা দীপিকা সরকার আহাজারি করছেন। স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। অর্ণবের পিসি (ফুফু) রুপা সরকার বলেন, ‘অর্ণবের মাকে এখনো অর্ণবের খুন হওয়ার কথা জানানো হয়নি। তাঁকে বলা হয়েছে, অর্ণব মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছে।’
অর্ণবের মা দীপিকা সরকার বারবার বিলাপ করতে করতে বলছেন, ‘বাবা তুই কেন মোটরসাইকেল নিয়ে বের হলি!’ তিনি আরও বলেন, ‘বিকেল পাঁচটার দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিল অর্ণব। কয়েকটি স্থানে ওর বাবার ঠিকাদারির কাজ চলছে। সেই কাজ দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ করে জানতে পারি, অর্ণব মোটরসাইকেল অ্যাক্সিডেন্ট করেছে।’
অর্ণবরা দুই ভাই। বড় অর্ণব। ছোট ভাই অনিক কুমার সরকার এবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছেন। শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ছিল। কিন্তু বড় ভাই মারা যাওয়ায় তাঁর আর পরীক্ষা দিতে যাওয়া হয়নি।
অর্ণবদের প্রতিবেশী মো. চুন্নু বলেন, অর্ণব খুবই ভদ্র ছেলে। এলাকায় কারও সঙ্গে তাঁকে কোনো খারাপ আচরণ করতে দেখা যায়নি। তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার ব্যবসা দেখতেন। হঠাৎ অর্ণবের খুন হওয়ার খবর শুনে এলাকার সবাই হতবাক হয়েছেন।
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) উপকমিশনার (দক্ষিণ) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ঘটনার পরপরই বিভিন্ন জায়গায় অভিযান শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বিভিন্ন দিক মাথায় নিয়েই তদন্ত কার্যক্রম চলছে। তিনি বলেন, হত্যার ঘটনায় দুপুর পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। পরিবারের সবাই লাশের সৎকার নিয়ে ব্যস্ত আছেন। বিকেলের দিকে হয়তো তাঁরা মামলা করতে পারেন।
সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় নিহতের পিতা শনিবার রাতে থানায় অজ্ঞাত নামা ২৫/৩০ জনকে আসামী করে মামলা করেছেন। মামলা নং ২৬ , তারিখ ২৫/০১/২৫।
তিনি আরো বলেন, অর্ণবের শরীরে বেশ কয়েকটি গুলির চিহ্ন রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে তিনটি পিস্তলের গুলি ও একটি শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অর্ণবের বাবা ঠিকাদার ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সেই ব্যবসা দেখাশোনা করতেন অর্ণব। এটা নিয়ে কোনো পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি নারীঘটিত কোনো ঘটনা বা অন্য কোনো দ্বন্দ্ব ছিল কি না, সে ব্যাপারগুলো তদন্তে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, হেফাজতে থানা তিন জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের এই হত্যাকাণ্ডের সাথে কোন সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনানুগ ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে চার মাসে ১২ খুনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক নেতারা। খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, নগরীর আইনশৃঙ্খলা এতো অবনতি হয়েছে। সন্ধ্যার পর মানুষ ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। এতে অস্ত্রের ঝনঝনানি ও লাশ এর আগে খুলনাবাসী দেখেনি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী শুধু মুখে মুখে তৎপরতার কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবে তার কোন চিহ্ন নেই।











































