>>ঢাকায় নিউরোসাইন্স হাসপাতালে ভর্তি: মুক্তিযোদ্ধা পিতাও গুরুতর আহত, ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি
খুলনাঞ্চল রিপোর্ট
দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, শঙ্কামুক্ত নন তিনি। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টা ৫ মিনিটের দিকে তার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের উপপরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ইউএনও ওয়াহিদার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। অস্ত্রোপচার শেষে তাকে আইসিইউতে অবজারভেশনে রাখা হয়েছে। আগের চেয়ে অবস্থা কিছুটা উন্নতি বলা যায়, তবে তিনি এখনো শঙ্কামুক্ত নন। অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম বলেন, অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়েছে। তবে অস্ত্রোপচার সাকসেস হয়েছে কিনা সেটা বলতে সময় লাগবে। সেটা আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।
তবে আশার কথা হলো ইউএনও ওয়াহিদার অপারেশন পূর্ববর্তী ও বর্তমান সব প্যারামিটার ভালো। এটা আশাব্যঞ্জক। রাত ৯টার দিকে তাকে অস্ত্রোপচারের জন্য হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়। অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার আগে তার সিটিস্ক্যান করা হয়। প্রেসার চেক করে অবস্থা স্বাভাবিক থাকায় তার অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসকরা জানান, দুর্বৃত্তের হামলায় ইউএনও ওয়াহিদার মাথার বাঁ-দিকটা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাথার কিছু অংশ ভেঙে মস্তিষ্কের ভেতরে প্রেসার তৈরি করেছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেটি অপসারণ করা গেলে অবস্থার উন্নতি হবে এমন আশা থেকে তার অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর আগে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওয়াহিদাকে দেখতে যান জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ওয়াহিদা খানমের সঙ্গে হাসপাতালে কথা বলেছি। এখন তার অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো। তবে তার প্রেসারটা আপ-ডাউন করছে। যদিও সাক্ষাৎকারে তার প্রেসার ৮০/১২০ এর মধ্যে ছিল। ফরহাদ হোসেন বলেন, তার মাথার বাঁ-দিকটা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডান পাশের কিছু অংশ প্যারালাইজড অবস্থায় আছে। এদিকে ইউএনও ওয়াহিদা খানমের চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্ব নিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাতে এক বার্তায় মন্ত্রী এই পৈশাচিক হামলার তীব্র নিন্দা ও দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে শাস্তির দাবি করেন।
ভেন্টিলেটর ভেঙ্গে গভীর রাতে সরকারী বাসায় ঢুকে ইউএনও এবং তার মুক্তিযোদ্ধা পিতার ওপর ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় ইউএনও মারাত্মক জখম হয়েছেন। তার মাথার খুলির হাড় ভেঙ্গে ভেতরে মস্তিকে ঢুকে গেছে। এজন্য তার শরীরের অনেক অংশ অবশ হয়ে পড়েছে। তাকে এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় এনে শেরেবাংলা নগরে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসাইন্স এ্যান্ড হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। তাকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিভাবে সরকারী বাসভবনের ভেতরে ঢুকে হামলার ঘটনা ঘটল তা জানতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে সাত সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কাজ করছে। হামলাকারীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি তাদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই, সিআইডি, থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থা আলামত সংগ্রহ করেছে। আলামতের পর্যালোচনা চলছে।
ইতোমধ্যেই বাড়ির নিরাপত্তা রক্ষীকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। বুধবার রাত আড়াইটার দিকে দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম (৩৫) ও তার পিতা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখের (৬০) ওপর ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা রাতের আঁধারে সরকারী বাসভবনের পেছনের বাথরুমের ভেন্টিলেটর ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে। হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র ও হাতুড়ি দিয়ে তাদের মারাত্মক জখম করে। তাদের সারা গায়ে আঘাতের চিহ্ন। ছুরিকাঘাত ও কুপিয়ে তাদের রক্তাক্ত করা হয়। আশপাশের সরকারী ভবনের বাসিন্দারা জানান, ইউএনও এবং তার পিতা প্রায় প্রতিদিনই ভোরে হাঁটেন। ইউএনও প্রতিদিন না হাঁটলেও তার পিতা নিয়ম করে রোজ হাঁটেন। বৃহস্পতিবার সকালে তারা হাঁটতে বের না হলে সেখানকার বাসিন্দারা বাড়িতে যান। ডাকাডাকিতে সাঁড়া না পেয়ে তারা পুলিশকে খবর দেন। তাদের উদ্ধারকালে মেঝেতে ইউএনওর তিন বছরের শিশুপুত্র কাঁদছিল। আহতদের প্রথমে ঘোড়ঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাদের রংপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী সেখানেই চিকিৎসাধীন।
তিনি ১৯ নম্বর নিউরো সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন। তার মাথা ও শরীরে ধাতব বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় বলেন, ‘আমি ভোর সাড়ে চারটার দিকে নামাজ আদায় করতে উঠি, পাশের ঘর থেকে মেয়ের চিৎকার শুনতে পাই। সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করলে একজন মুখে কাপড় বাঁধা অবস্থায় এসে আমাকে ভয় দেখিয়ে আলমারির চাবি চায়। চাবি না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আমার কাছে চাবি নেই বলতেই সে হাতুড়ি দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করলে আমি লুটিয়ে পড়ি। এরপর আর কিছু বলতে পারি না।’
ইউএনওর বাবা আরও বলেন, ‘ঘোড়াঘাটে মেয়ে একা থাকে। জামাতা মেজবাহুল হোসেন রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ইউএনও। মেয়ের সঙ্গে তিন বছর বয়সী নাতি থাকে। এই উপজেলায় আড়াই বছর ধরে মেয়ের সঙ্গে থাকছি। মাঝে-মধ্যে নাটোর জেলার মহাদেবপুরের বাড়িতে যাই। আমি মেয়ের সঙ্গে থাকা অবস্থায় আমার মেয়েকে কেউ কোন হুমকি দিয়েছে কিনা, তা আমার জানা নেই।’ রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডাঃ তোফায়েল হোসেন ভূঁইয়া জানান, ইউএনওর মাথার বাম দিকে বেশি আঘাত লেগেছে। সেখানে দেবে যাওয়ায় ডান হাত ও পা অবশ হয়ে গেছে। এছাড়া মাথার পানি গহ্বরে রক্তক্ষরণ হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইউএনওর সরকারী বাসভবনের টয়লেটের ভেন্টিলেটর কেটে দুর্বৃত্তরা তার শয়নকক্ষে ঢুকে পড়ে। এর আগে দুর্বৃত্তরা ওই বাসভবনের নিরাপত্তা প্রহরীকে বেঁধে তার কক্ষে তালা দিয়ে আটকে রাখে। এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনায় উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। হামলাকারীদের গ্রেফতারে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইউএনও ওয়াহিদা খানম এবং তার বাবাকে দুর্বৃত্তরা হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। ঘোড়াঘাটের ইউএনও’র সরকারী বাসভবনের দোতলার ভেন্টিলেটর ভেঙ্গে বাসায় প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। বাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। হামলাকারীরা মুখোশ পরা ছিল। দুই হামলাকারীর মুখোশ ছিল। সার্বিক দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে। হামলাকারীদের গ্রেফতার করতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ডাকাতির উদ্দেশ্যে নাকি উদ্দেশ্যমূলকভাবে হামলার ঘটনাটি ঘটেছে তা জানার চেষ্টা চলছে। এ ব্যাপারে জেলাটির ডিসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ডিসি তাৎক্ষণিকভাবে এ ধরনের কোন তথ্য দিতে পারেননি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইউএনও এবং তার পিতার ওপর হামলার ঘটনাটি রহস্যের জন্ম দিয়েছে। কারণ শত্রুতাবশত হামলা হলে ইউএনও টার্গেট থাকত। আবার পরিকল্পিতভাবে ঘটনা ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দিতেও দুইজনের ওপরই হামলা হতে পারে। ডাকাতির উদ্দেশ্যে এমন ঘটনা ঘটেছে কিনা তা জানার চেষ্টা চলছে। বাড়ি থেকে কোন কিছু খোয়া গেছে কিনা তার তদন্ত অব্যাবহ আছে।
দিনাজপুর-৬ আসনের সাংসদ শিবলী সাদিকের ধারণা, এটি কোন ডাকাতির ঘটনা নয়। কারণ ঘরের কোন মালামাল খোয়া যায়নি। তাকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যেই এই ঘটনা ঘটেছে। উপজেলায় বড় কোন শিল্প-কারখানা নেই। অধিকাংশই কৃষক। স্থানীয়ভাবে তার শত্রু থাকার কথা না। ইউএনওর বাড়ি নাটোর জেলায় এবং শ্বশুরবাড়ি নওগাঁ জেলায়।
রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওয়াহাব (যুগ্ম সচিব) জানান, কে বা কারা ঠিক কী কারণে এ হামলা চালিয়েছে তা এখনও জানা যায়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনার তদন্ত করছে। শীঘ্রই জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে। এ হামলার কারণ জানতে দিনাজপুর-৬ আসনের এমপি শিবলী সাদিক, দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ মাহমুদুল আলম, পুলিশ সুপার মোঃ আনোয়ার হোসেনসহ র্যাবের কর্মকর্তারা সিসিটিভির ফুটেজসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে যাচাই-বাছাই করছেন। তবে কি কারণে ইউএনও ওপর এমন বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছে তা এখন পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেনি।
সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘোড়াঘাট থানার ওসি আমিরুল ইসলাম জানান, সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে হামলাকারীরা দুজন ছিল। তাদের একজনকে মাস্ক পরিহিত অবস্থায় দেখা গেছে। আরেকজনের চেহারা বোঝা যাচ্ছিল না। বাড়ির পেছনে ভাঙ্গা ভেন্টিলেটর দিয়ে দুর্বৃত্তরা ঘরে প্রবেশ করে। এ কাজে তারা একটি মই ব্যবহার করে। বাড়ির পেছনে মইটি পাওয়া গেছে। ওই বাসা থেকে কোন কিছু খোয়া যায়নি। এটি ডাকাতির চেষ্টা, না আক্রোশ থেকে কেউ হামলা করেছে, সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দিনাজপুর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক ইমাম আবু জাফর জানান, ইতোমধ্যেই সরকারী বাসভবনের নিরাপত্তা প্রহরী পলাশকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গোয়েন্দা পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। হামলাকারীরা নিরাপত্তা প্রহরী তার মুখ, হাত পা বেঁধে একটি কক্ষে আটকে রেখেছিল বলে দাবি করেছেন। নিরাপত্তা প্রহরী হামলাকারীদের কাউকেই চিনতে পারেননি বলেও দাবি করেছেন। এমনকি কোনদিন দেখেছেন বলেও মনে হয় না বলে দাবি করেছেন নিরাপত্তা প্রহরী পলাশ।









































