Home আলোচিত সংবাদ ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ইতিবৃত্ত

ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ইতিবৃত্ত

98


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।


কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ। এই মসজিদ মুসলিম-অমুসলিম সবার কাছেই একটি বিস্ময়। মূলত বিপুল পরিমাণের টাকা, বৈদেশিক মুদ্রা ও সোনা-রুপা দান হিসেবে পাওয়ার জন্যে এই মসজিদ সর্বাধিক আলোচিত।
পাগলা মসজিদের ইতিহাস: প্রচলিত আছে, পাগল বেশে এক আধ্যাত্মিক সাধক নরসুন্দা নদীর বুকে মাদুরে ভেসে মসজিদের স্থানে এসে অবস্থান নেন। ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে ভক্তদের সমাগম হতে থাকে। আধ্যাত্মিক সাধকের মৃত্যুর পর তার কবরের পাশে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। যা বর্তমানে পাগলা মসজিদ নামে অত্যন্ত সুপরিচিত।

অন্য এক জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, প্রাচীন বাংলার ১২ ভুঁইয়ার মধ্যে অন্যতম একজন বীর ঈশাখাঁ। তার ৫ম পুরুষ হয়বতনগরের প্রতিষ্ঠাতা দেওয়ান হয়বত দাদ খানের দৌহিত্র দেওয়ান জিলকদর খান ওরফে জিলকদর পাগলা সাহেব এখানে এসে ধ্যানমগ্ন হতেন ও নামাজ পড়তেন। পরবর্তীতে তার নামানুসারে এই মসজিদকে পাগলা মসজিদ নামকরণ করা হয়। স্থানীয় আরেকটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, হয়বতনগর এলাকার জমিদার দেওয়ান হয়বত দাদ খানের অধস্তন তৃতীয় পুরুষ জিলকদর খানের বিবি আয়শা দাদ খান এই মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান এবং প্রজারা তাকে ‘পাগলা বিবি’ বলে ডাকতেন। স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে তিনি দেওয়ানবাড়ি থেকে একরশি দূরে নরসুন্দার তীরে এই মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন।


মসজিদের গঠন ও স্থাপত্য: আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই পাগলা মসজিদের বর্তমান জমির পরিমাণ ৩ একর ৮৮ শতাংশ। যদিও প্রথম দিকে হয়বতনগর দেওয়ানবাড়ির ওয়াকফকৃত ১০ শতাংশ জমিই কেবলমাত্র মসজিদের নামে অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিন তলাবিশিষ্ট পাগলা মসজিদের ছাদে তিনটি বড় গম্বুজ এবং ৫ তলা ভবনের সমান একটি মিনার রয়েছে। প্রায় সহস্রাধিক মুসল্লির ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই মসজিদে নারীদের নামাজ আদায়ের জন্য পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে।
বর্তমানে লেকসিটি প্রকল্পের আওতায় পাগলা মসজিদের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নরসুন্দা নদী খনন, দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণ, মসজিদের শোভাবর্ধন এবং রঙিন আলোকসজ্জার জন্য দিনে ও রাতে মসজিদটি দেখতে চমৎকার লাগে।


এত দান পাওয়ার কারণ?: সব ধর্মের মানুষের কাছে পাগলা মসজিদ এক সার্বজনীন পবিত্র ধর্মীয় কেন্দ্র। মানুষজন বিশ্বাস করেন, যদি যেকেউ একনিষ্ঠ নিয়তে পাগলা মসজিদে কোনোকিছু দান করে তাহলে তার মনের বাসনা পূর্ণ হয়। এমন বিশ্বাসের কারণে মানুষজন পাগলা মসজিদে প্রচুর দান-খয়রত করেন। অনেক মানুষ মনের বাসনা, রোগমুক্তি, উচ্চশিক্ষা, সন্তান লাভ, ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়তে এই মসজিদে মানত করে থাকেন। শুধু টাকা পয়সা নয়, অনেকেই স্বর্ণালংকার, হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী দান করে থাকেন। কয়েক মাসেই দান খয়রাতের সিন্দুকগুলো টাকা দিয়ে ভরে যায়। সাধারণত প্রতি ৩ থেকে ৪ মাস পর পর সিন্দুকগুলো খোলা হয়। দেখা যায় প্রতিবারই আগের চেয়ে বেশি টাকা পাওয়া যাচ্ছে। গত ১৭ আগস্ট মসজিদের ৯টি দানবাক্স খুলে ২৮ বস্তা টাকা পাওয়া যায়। সেই টাকা গণনার কাজে ২২০ জনের একটি দল দীর্ঘ সাড়ে ১৮ ঘণ্টা গণনা শেষে ৭ কোটি ২২ লাখ ১৩ হাজার ৪৬ টাকা ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যায়।


দানের টাকা দিয়ে কি করা হয়?: পাগলা মসজিদের দানের টাকার একটা অংশ মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং খাদেমদের বেতন ও মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণে খরচ করা হয়। আশপাশের অনেক মসজিদ ও এতিম খানার উন্নয়নে দান করা হয়। এছাড়া দানের টাকা হতে এতিমখানা ও মাদরাসায় ব্যয় করা হয়। কিছু টাকা স্থানীয় অসচ্ছল বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা ও দুস্থদের আর্থিক সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়।


বর্তমানে পাগলা মসজিদের আধুনিকায়নে ১৫০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এখানে আন্তর্জাতিক মানের ৬ তলাবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন পাগলা মসজিদ ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। পাগলা মসজিদ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসক। আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পৌর মেয়র।
জেলা প্রশাসক জানান, পাগলা মসজিদের দানের টাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। কমপ্লেক্সটি এশিয়া মহাদেশের মধ্যে অন্যতম স্থাপত্য হিসেবে বানানো হবে। এ জন্য আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৫ থেকে ১২০ কোটি টাকা। সেখানে একসঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। ২০০ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া পাঁচ হাজার নারীর জন্য নামাজের আলাদা ব্যবস্থা থাকবে।

দান করেন কারা?: কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্স খুললেই মেলে কোটি কোটি টাকা। দানের এই টাকার পরিমাণ প্রতিনিয়ত শুধু বেড়েই চলেছে। দিনে তো বটেই, রাতের আঁধারেও অনেকে গোপনে এসে দান করে থাকেন মসজিদের দানবাক্সগুলোতে। টাকা ছাড়াও মেলে বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার। এ ছাড়া প্রতিদিন মসজিদে দান করা হয় হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল। পাগলা মসজিদের নৈশপ্রহরী মকবুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘শুধু মুসলিম নয়, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এখানে এসে দান করেন। টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার, বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়াও প্রচুর পরিমাণ হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলও দান করেন অনেকে। করোনার শুরুতে যখন জনসমাগম বন্ধ ছিল, তখনো অনেকে গভীর রাতে এসে দানবাক্সে দান করেছেন।’


তিনি আরো বলেন, অতীতে এই মসজিদে কেবল আশেপাশের এলাকার মানুষ দান করতেন। আর এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন এসে টাকা-পয়সা দান করেন। এছাড়া বিদেশিরা অনেক সময় আসেন, পুরো মসজিদ ঘুরে দেখে যাওয়ার সময় দানবাক্সে বৈদেশিক মুদ্রা দেন।
মসজিদের পেশ ইমাম মুফতি খলিলুর রহমান জানান, প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এসে দান করছেন এই মসজিদে। যারা দান করতে আসেন তারা বলেন, এখানে দান করার পর তাদের আশা পূরণ হয়েছে। আর এ বিষয়টির কারণেই এখানে দান করেন তারা।


ব্যয় হয় যেসব খাতে: পাগলা মসজিদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শওকত উদ্দিন ভূইয়া জানান, প্রতিমাসে পাগলা মসজিদের স্টাফ খরচ বাবদ ব্যয় হয় ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ২০২১ সালে দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত ১২৪ জন ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য এবং অসহায় ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচের জন্য ১৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও করোনাকালীন সময়ে শহিদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, পাগলা মসজিদের টাকায় ২০০২ সালে মসজিদের পাশেই একটি হাফেজিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বর্তমানে এই মাদরাসায় ১৩০ জন এতিমশিশু পড়াশোনা করছে। মসজিদের টাকায় তাদের যাবতীয় ভরণপোষণ ও জামাকাপড় দেওয়া হয়ে থাকে। ওয়াকফ স্টেটের অডিটর দ্বারা প্রতিবছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে পাগলা মসজিদের আয়-ব্যয়ের অডিট করা হয়। পাগলা মসজিদ ও ইসলামী কমপ্লেক্স পরিচালনা করার জন্য ৩১ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি রয়েছে। এই কমিটিতে জেলা প্রশাসক সভাপতি এবং কিশোরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র সাধারণ সম্পাদক। এছাড়াও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি, আইনজীবী, সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা এই কমিটিতে আছেন।


পাগলা মসজিদ ভ্রমণ:
কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের হারুয়া এলাকায় গুরুদয়াল সরকারি কলেজ এবং আধুনিক সদর হাসপাতালের খুব কাছেই ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের অবস্থান। কিশোরগঞ্জ পৌর শহরের যেকোনো স্থান থেকে রিকশা বা ইজিবাইক ভাড়া নিয়ে পাগলা মসজিদে যেতে পারবেন।


ঢাকা থেকে ট্রেনে কিশোরগঞ্জ: কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কিশোরগঞ্জ যাওয়ার ৩টি আন্তঃনগর ট্রেন রয়েছে। ট্রেনে কিশোরগঞ্জ যাওয়ার ক্ষেত্রে সকালের এগারোসিন্ধুর প্রভাতীতে চড়লে হাতে অনেক সময় পাবেন। ট্রেন ভাড়া শ্রেণি অনুযায়ী ১৩৫-৩৬৮ টাকা এবং সময় লাগবে প্রায় ৪ ঘণ্টা। কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে অটোরিকশা রিজার্ভ নিয়ে পাগলা মসজিদ আসতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা খরচ হবে।


ঢাকা থেকে বাসে কিশোরগঞ্জ: ঢাকার মহাখালী থেকে অনন্যা পরিবহন, অনন্যা ক্লাসিক এবং গোলাপবাগ (সায়েদাবাদ) থেকে যাতায়াত, অনন্যা সুপার ইত্যাদি বাস ঢাকা-কিশোরগঞ্জ রুটে চলাচল করে। বাসভাড়া ৩৫০-৩৮০ টাকা। মহাখালী থেকে সময় লাগবে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা এবং গোলাপবাগ থেকে সময় লাগবে প্রায় ৪ ঘণ্টা। কিশোরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে ৩০-৪০ টাকা রিকশা ভাড়ায় সরাসরি পাগলা মসজিদ যেতে পারবেন।


কোথায় খাবেন?: কিশোরগঞ্জ শহরে গাংচিল, তাজ, ধানসিঁড়ি, রিভার ভিউ, দোসাই রেস্টুরেন্ট, পানসী ইত্যাদি রেস্টুরেন্টে পছন্দের খাবার খেতে পারবেন। আর মিষ্টি পাগল হলে একরামপুরের লক্ষী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার কিংবা মদন গোপালে ঢু মারতে পারেন।

কোথায় থাকবেন? রাত্রিযাপনের জন্য কিশোরগঞ্জ সদরের স্টেশন রোডে হোটেল শেরাটন, রিভার ভিউ, গাংচিল, নিরালা, উজান ভাটি, ক্যাসেল সালামসহ বেশকিছু ভাল মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। এছাড়া অনুমতি সাপেক্ষে জেলা সদরের সরকারি ডাক-বাংলোতে থাকতে পারবেন।


আশেপাশের দর্শনীয় স্থান: কিশোরগঞ্জ জেলার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণ স্থানের মধ্যে আছে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান, কবি চন্দ্রাবতীর মন্দির, গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি, কিশোরগঞ্জ লেক পার্ক, ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি দূর্গ, বালিখলা, মিঠামইন হাওর ও নিকলী হাওর ইত্যাদি।