Home আঞ্চলিক হাসপাতালের কাজ বন্ধ, বিল তুলে উধাও সাবেক এমপি বাবু

হাসপাতালের কাজ বন্ধ, বিল তুলে উধাও সাবেক এমপি বাবু

126


স্টাফ রিপোর্টার
খুলনার কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৩১ শয্যাবিশিষ্ট তিনতলা ভবন নির্মাণের জন্য ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট কার্যাদেশ দেওয়া হয়। যৌথভাবে কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জিয়াউল ট্রেডার্স ও মেসার্স শামীম আহসান ট্রেডার্স। প্রায় ১০ কোটি টাকার কাজের মেয়াদ ছিল ৯ মাস। কাজের অগ্রগতি না হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১ কোটি ৭২ লাখ ৯৯ হাজার টাকা তুলে নিয়ে পালিয়ে গেছে।
কাজের মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জিয়াউল ট্রেডার্সের মালিক জিয়াউল আহসান টিটু খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। তিনি বলেন, আমার লাইসেন্সে হলেও কাজটি করছিলেন খুলনা-৬ আসনের সাবেক এমপি আকতারুজ্জামান বাবু। তিনি নানা অজুহাতে কাজে কালক্ষেপণ করায় সব দায় এখন আমাদের কাঁধে চেপেছে।
জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় এলাকাছাড়া হয়েছিলেন তিনি। এরপর আবার গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার পরপরই আত্মগোপনে চলে যান সাবেক এমপি বাবু।
সম্প্রতি বাবুর জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনেকে বলছেন, তিনি সিঙ্গাপুর অথবা মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। এ পরিস্থিতিতে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণকাজ শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। হাসপাতালে আসা রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য প্রকৌশল দফতরের খুলনার এক কর্মকর্তা বলেন, যদিও আমরা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ সম্পর্কে যাবতীয় যোগাযোগ করি, তারপরেও সাবেক এমপি বাবু কাজটির দায়িত্বে থাকায় আমাদের তদারকি বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাজের বরাদ্দ তুলে নিয়েছেন। এ প্রকল্পের কার্যাদেশ বাতিল হলে অবশ্যই ক্ষতি অনুযায়ী জরিমানা দিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৪ সালে কয়রা উপজেলার জায়গীরমহল গ্রামে স্থাপিত হয় ৩১ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সেখানে ২০১১ সালে ১৯ শয্যার একটি ভবন নির্মাণ করা হয় এবং ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। পরে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট পুরনো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ২০২২ সালে অপসারণ করা হয়। একই বছরের ১৬ আগস্ট ৩১ শয্যার তিনতলা ভবন নির্মাণে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। যার কাজের মেয়াদ ছিল ২০২৩ সালের ১২ জুন পর্যন্ত। ছয়তলা ফাউন্ডেশনের তিনতলা ভবন নির্মাণ কাজের ব্যয় ধরা হয় ৯ কোটি ৭৬ লাখ ৭৬ হাজার ৫৮০ টাকা। কাজের মেয়াদ শেষ হলেও হয়েছে মাত্র ১১ শতাংশ কাজ। কাজের অগ্রগতি না হওয়ায় গতি বাড়াতে বারবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেয় খুলনা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর। একপর্যায়ে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজের মেয়াদ বর্ধিত করা হয়। দুদফা মেয়াদ শেষে কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হওয়ায় কাজ বাতিলের সুপারিশ করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী।
সূত্রে জানা গেছে, কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পুনর্র্নিমাণ প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট। ৩১ শয্যাবিশিষ্ট তিনতলা ভবনটি নির্মাণের কার্যাদেশ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জিয়াউল ট্রেডার্স ও মেসার্স শামীম আহসান ট্রেডার্স। এ কাজ বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল নয় মাস। কার্যাদেশ পাওয়ার পর দুবছর পার হলেও ১৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এই কাজের বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১ কোটি ৭২ লাখ ৯৯ হাজার টাকা উঠিয়ে নিয়েছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাজ আদায় করতে পারছে না স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর। এ অবস্থায় ১৯ মার্চ কাজ বাতিলের সুপারিশ করে পত্র দেন খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী।

পত্রে তিনি উল্লেখ করেন, নির্মাণ কাজটি অত্যন্ত ধীরগতিতে চলমান ছিল এবং চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১০টি পাইল ক্যাপ কাস্টিং করা হয়। তারপর থেকে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বাকি পাইল ক্যাপ দ্রুত কাস্টিং করার নির্দেশনা প্রদান করা হলেও কার্যত কোনো অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। কার্যাদেশ ও অনুমোদিত সম্প্রসারিত সময়সীমা অনুযায়ী বর্ণিত কাজটি শতভাগ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে কাজটির ভৌত অগ্রগতি মাত্র ১৮%। কাজটি বাতিলের সুপারিশের পরে মাত্র এক শতাংশ কাজ করে বন্ধ রেখেছেন ঠিকাদার।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, কক্ষের অভাবে বহির্বিভাগেও চিকিৎসা সেবা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আগের দরপত্র বাতিল করে নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল দফতর খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ার হাসান মহিউদ্দিন বলেন, কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৩১ শয্যাবিশিষ্ট তিনতলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি ক্লোজড আছে। এটা বর্তমানে প্লানিং কমিশনে রয়েছে। প্লানিং কমিশন থেকে প্রকল্পটি বাতিল বা রিনিউ যা হোক একটি করা হবে। পরে এ প্রকল্পটির জন্য আবার টেন্ডার আহ্বান করা হবে।
এ বিষয়ে সাবেক এমপি মো. আক্তারুজ্জামান বাবুর মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ রয়েছে। তিনি আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানা যায়।