Home Uncategorized খুলনার যে হাটে এখনও মানুষ বেচাকেনা হয় !

খুলনার যে হাটে এখনও মানুষ বেচাকেনা হয় !

161

স্টাফ রিপোর্টার।।


আধুনিক এই যুগেও খুলনা মহানগরীতে প্রতিদিন বসছে মানুষ বেচাকেনার হাট। বয়স, গায়ের শক্তি সমর্থ অনুযায়ী দরদামে নিজেকে বিক্রি করেন তারা। প্রাচীনকালের মতো মানুষ বিক্রির হাট বসে খুলনার সিটি বাইপাস এলাকার মোস্তফার মোড়ে। দু-বেলা রুটি-রুজির জন্য প্রতিদিন ভোর থেকেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিম্ন আয়ের মানুষ হাজির হন এখানে। শুধু পুরুষ নন, নারীরাও আসেন এই হাটে।


মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) সরেজমিন দেখা যায়, জীর্ণ পোশাক আর ব্যাগ হাতে নিজের দর কষছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব শাহবুদ্দিন ঢালী। কর্মের সন্ধানে কাকডাকা ভোরে নিজেকে বিক্রি করতে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার গাওঘরা গ্রাম থেকে ছুটে এসেছেন মানুষের হাটে। দীর্ঘ ১০ বছরের বেশি সময় ধরে এ হাটে তার আনাগোনা। কখনো ভালো দামে নিজেকে বিক্রি করেন আবার কখনও হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরেন।

শাহবুদ্দিন ঢালী বলেন, পেটের দায়ে এখানে আসি। কাজ না হলে সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়। প্রতিদিন ফজরের আজানের আগে ঘুম থেকে উঠে ভ্যানে করে এ হাটে আসেন। ১০-১৫ কিলোমিটার দূরে গিয়েও কাজ করেন। ধান কাটা থেকে শুরু করে, এমন কোনো কাজ নেই করেন না। তিনি আরও বলেন, এই হাটে গায়ে বল না থাকলে কেউ কেনে না। আর বিক্রি না হলে তখন সংসার চলে না। ধারদেনা করে চলতে হয়।

হাতে ব্যাগ আর বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে তার মতো হাজারো মানুষের অপেক্ষা এ হাটে। খুলনার সিটি বাইপাস এলাকার মোস্তফা মোড়ের চিত্র এটি। দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে এখানে প্রতিদিন বসে মানুষ বিক্রির হাট। ভোর থেকে দিনমজুরসহ নানা পেশার শ্রমজীবী মানুষে সরগরম হয়ে ওঠে এলাকা। একেবারে পণ্যের মতো দর কষাকষিতে বিক্রি হন শ্রমজীবী এসব মানুষ। শুধু পুরুষ নন, নারীরাও আসেন।

বটিয়াঘাটার লতা রানী জানান, প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর ধরে তিনি এই হাটে আসেন। তিনি বলেন, ‘পুরুষদের তুলনায় নারীদের কষ্ট অনেক বেশি। আমরা এখানে বিক্রি হওয়ার পর কোথায় যাব জানি না। অনেক সময় ওয়াশরুমের ব্যবস্থা থাকে না। আর পুরুষদের থেকে আমাদের শ্রমের মূল্য অনেক কম। কিন্তু কাজ একই থাকে।’

ডুমুরিয়া উপজেলার থুকড়া থেকে নিজের শ্রম বিক্রি করতে এসেছেন আব্দুল গফুর। তিনি জানান, কাজের সন্ধানে প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি এখানে আসেন। তবে প্রতিদিন কাজ জোটে না। ভাগ্য যেদিন সহায় হয় সেদিন কাজ পাওয়া যায়। আবার কাজ পেলে কোথায় যেতে হবে সেটিও অজানা। অনেক স্থানে ৮ ঘণ্টার জায়গায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। কেউ কেউ ভালো আচরণ করলেও মাঝে মাঝে অনেকে খারাপ আচরণ করে।

পাইকগাছার লতা ইউনিয়নের শাহাদাত হোসেন বলেন, অনেক স্থানে ২ দিনের কাজের কথা বলে ৪-৫ দিন কাজ করায়। অনেক সময় ন্যায্যমূল্য আমরা পাই না। আবহাওয়া খারাপ হলে এখানে ক্রেতারা কম আসে। তখন সারা দিন বেকার থাকতে হয়। আমাদের কোনো ঈদ, পূজা বা উৎসব নাই। বেতন নাই বোনাস নাই। অসুস্থ হলে কাজ নাই। কোনো রকম ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকি।

আর এক স্থানে একত্রে অনেক শ্রমিক পাওয়া যায় বলে ক্রেতারাও ছুটে আসেন এই হাটে। তেমনিই এক ক্রেতা নূরুল আমিন। তিনি বলেন, ধান কাটার এই সময়টা গ্রামে শ্রমিক পাওয়া যায় না। কিন্তু এখানে এলে একসঙ্গে অনেক শ্রমিক পাওয়া যায়। দরদাম করে দেখেশুনে শ্রমিক নেয়া যায়।

এদিকে তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশ। দুই যুগের তাপমাত্রার সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছে খুলনা। খরতাপে পেটের দায়ে বন্ধ নেই কাজ। আছে সভ্য সমাজের বঞ্চনা।

মাসুদ নামের এক শ্রমিক বলেন, সমাজে অন্যান্য কাজ করা মানুষগুলো যতটুকু সম্মান পায়, আমরা কখনও সেই সম্মান পাই না। কারণ আমরা শ্রমিক। সব সময় সমাজের নিচের কাতারে থাকতে হয়। কোথাও গেলে তো মূল্যায়ন পাওয়া যায় না। তিনি আরও বলেন, তীব্র গরমে কাজ করতে অনেক কষ্ট হয়। জন্মের পর এত গরম দেখিনি। তবে গরমের ভয়ে কাজ না করে ঘরে বসে থাকলে পেট আর সংসার চলবে না।

অভাবের তাড়না আর রুটিরুজির সন্ধানে ৩ ঘণ্টার এই হাটে শ্রম বিক্রি করতে আসেন এই অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ। তাদের মতো এমনসব শ্রমিকদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে আজকের সভ্যতা। তাই তারা যেন বঞ্চিত না হয় প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদা থেকে এটাই হোক মে দিবসের প্রত্যাশা। মানুষ বিক্রির এই হাট ভোর ৫টা থেকে শুরু হয়ে চলে সকাল ৮টা পর্যন্ত।