Home আঞ্চলিক খননে নবগঙ্গা নদী যেন পরিণত হচ্ছে খালে!

খননে নবগঙ্গা নদী যেন পরিণত হচ্ছে খালে!

32


নড়াইল প্রতিনিধি
চারদিকে সবুজের সমারোহ। দেখে মনে হবে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চাষ করা কোন ফসলের ক্ষেত। আসলে তা নয়; কচুরিপানায় ঢাকাপড়া এক সময়ের বহমান খরস্রোতা নদী ‘নবগঙ্গা’। এ নদী রক্ষায় খনন প্রকল্পের কাজ সাড়ে তিন বছরেও শেষ হয়নি। দ্বিতীয় মেয়াদেও কাজ শেষ হওয়া নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে শঙ্কা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। নাগরিক নেতারা বলছেন, খনন কাজে সরকারের টাকা যেন পানিতে না যায়। এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, নির্দিষ্ট এ মেয়াদের মধ্যেই কাজ শেষ হবে।
খনন চলছে বহুল কাঙ্ক্ষিত নবগঙ্গা নদীর। তবে দেখে বোঝার উপায় নেই কতটুকু হচ্ছে কাজ। মাটি কাটা যন্ত্র দিয়ে নদীর সীমানা নির্ধারণ করে পানির মধ্যে খনন যন্ত্র বসিয়ে কাটা হচ্ছে মাটি। তবে পাড়ের মাটি সরিয়ে নিলেও অদৃশ্য কারণে কোথাও কোথাও সরু হয়ে যাচ্ছে নদী। এতে অনেকটা খালের আকৃতি হয়ে যাচ্ছে নবগঙ্গা।
পলি পড়া ছাড়াও স্রোতের অভাবে বেদখল হওয়া প্রায় মৃত নদীটির নাব্যতা ফেরাতে নবগঙ্গা নদী খননের উদ্যোগ নেয় পাউবো। মধুমতি-নবগঙ্গা উপ-প্রকল্প পুনর্বাসন ও নবগঙ্গা নদী পুনঃখননের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবন ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ২০২০ সালে নেয়া হয় এ প্রকল্প। খননের চুক্তি মূল্য ৮৩ কোটি টাকায় লক্ষ্মীপাশা থেকে মহাজন মধুমতি নদীর সংযোগস্থল পর্যন্ত এ নদীর ২১ কিলোমিটার খননের কাজ শুরু করে নটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
পাউবো সূত্র বলছে, খনন শুরুর পর ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এ প্রকল্পের মেয়াদ ফুরোলেও কাজ শেষ না হওয়ায় পুনরায় মেয়াদ বাড়িয়ে দ্বিতীয় দফায় কাজ শুরু হয়। যেটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে চলতি বছরের ডিসেম্বরে। এদিকে নবগঙ্গা নদী খননে এখন পর্যন্ত সাড়ে ৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে লক্ষ্মীপাশা থেকে পাচুড়িয়া পর্যন্ত সাড়ে ৫ কিলোমিটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি সাড়ে ১৫ কিলোমিটারে খনন কাজ হয়েছে মাত্র ৬০ শতাংশ। সংযোগস্থলে প্রস্থ ৬৫ থেকে ৭০ মিটার হলেও গোড়ার অংশে ৩০ মিটার গভীরতায় স্থান ভেদে ৩ থেকে ৪ মিটার খনন করার কথা রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে নদী খননের নামে খাল খনন করা হচ্ছে যেন!
ইমরান নামে এক স্থানীয় বলেন, নদী খনন যেটুকু অংশে হয়েছে, তা কি সঠিকভাবে হচ্ছে? দাদা-নানাদের মুখে শুনেছি এ নদীতে লঞ্চ চলেছে, মালবাহী কার্গোও আসতো। কিন্তু খনন যা হচ্ছে, তাতে তো নৌকাই ঠিকমতো চলবে কিনা সন্দেহ!

স্থানীয় ৮০ বছর বয়সি জালাল শেখ বলেন, ‘এই নদীতে বড় বড় পালের নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার চলেছে। আমরা খুলনা গোপালগঞ্জ গেছি এ ঘাট (লোহাগড়া বাজার) থেকে বড় লঞ্চে করে। গাঙ কাটা যখন শুরু হলো ভাবলাম আগের মত হবে। কিন্তু যেটুকু কাটছে তা দেখে তো মনে হচ্ছে, নদী কেটে খাল বানানো হচ্ছে।’

মহিতন বিবি নামে একজন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে দেখছি এই নদী। আমরা ডুব দিলে স্রোত ঠেলে চলে যাইতাম। কিন্তু নদী কাইটে তো কচুরিপানায় ভরে দিছে, ময়লা পানি। আগের মত নদী বানাইতে না পারলে কাটার কী দরকার ছিল। সরকারের টাকাগুলো শেষ করতেছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ১৯৬২ সালের সিএস রেকর্ড ধরেই নদী খননের কাজ হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে নদীর গতি পথের পরিবর্তনে স্থানীয়দের চাহিদা মোতাবেক সমসাময়িক বেশ কয়েকটি ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। তিনটি ছোট বড় ব্রিজের অবস্থান বর্তমান নদী পথের বাইরে হওয়ায় খনন কাজের শেষে ক্রমান্বয়ে সেগুলোও সম্পন্ন করবে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

নবগঙ্গা নদীর সীমানা নির্ধারণ করে পানির মধ্যে মাটি কাটার যন্ত্র বসিয়ে চলছে খনন। তবে পাড়ের মাটি সরিয়ে নিলেও অদৃশ্য কারণে কোথাও কোথাও নদী হয়ে যাচ্ছে হচ্ছে সরু, যা অনেকটা খালের মতো। ছবি: সময় সংবাদ

বিভিন্ন সময়ে নদীর জমি দখল করে স্থাপনাসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। আর সেগুলোর মালিকানা নিজের করতে নানা কৌশলে ভুয়া দলিল তৈরির মাধ্যমে আদালতে মামলাও চালাচ্ছে। খনন কাজে এসব প্রতিবন্ধকতাকে দায়ী করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তমা কনস্ট্রাকশনের ক্রিয়েটিভ ডাইরেক্টর মো. ওয়াহিদুজ্জামান।

কনজুমারস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সাধারণ সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমান সময় সংবাদকে বলেন, নদীগুলোকে জীবিত করতে সরকার পর্যাপ্ত টাকা ব্যয় করছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া কাজটির তদারকি করার তৃতীয় কোন মাধ্যম না থাকায় টাকাটির যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি-না তা নিয়ে আছে সংশয়। সরকারি টাকার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে কাজটি সঠিকভাবে করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সতর্ক থাকার দাবি নাগরিক নেতাদের।
এদিকে, জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার সেন বলেন, ‘নানা প্রতিবন্ধকতা ও জটিলতায় খনন কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও নিয়ম মেনে খনন কাজ করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময় অর্থাৎ এ বছরের মধ্যেই খনন কাজ শেষ করতে পারবো আমরা।’

২০২০ সালে শুরু হওয়া নবগঙ্গা নদী খননের কাজ দুবছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় সময় বাড়িয়ে পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত।