>> ৪৩৬ জন বা ২২.১৩ শতাংশই স্বতন্ত্র প্রার্থী >> আ’লীগের প্রার্থী সর্বোচ্চ ২৬৬ জন >> ২৭টি দলের প্রার্থী ১৫৩৪ জন >> কাল ভোরে প্রায় ৯৩ শতাংশ কেন্দ্রে ব্যালট পেপার যাবে
ঢাকা অফিস।।
সঙ্ঘাত, মৃত্যু, আচরণবিধি লঙ্ঘনের মধ্যে দিয়ে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শেষ। সংঘর্ষ, শঙ্কা, আতঙ্কের মধ্যে আগামীকাল দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ। নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়ে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অনেকগুলো রাজনৈতিক দলের ৪৮ ঘণ্টার হরতাল আহ্বান আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনে বেশির ভাগ আসনে স্বতন্ত্র নামে বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে নির্বাচনের দিন সঙ্ঘাত, সংঘর্ষ ও বিরোধী দলের হরতাল ও নির্বাচন বর্জনের ঘোষণায় দেশজুড়ে একটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। নির্বাচনে অন্তত ২২০টি আসনে ৪৩৬ জন বা ২২.১৩ শতাংশই স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোটের মাঠে প্রার্থী হয়েছেন।
এরাই ভোটের মাঠে সরকারি দলের প্রার্থীদের জন্য বিপদ। স্বতন্ত্রসহ ২৮ দলের এক হাজার ৯৭০ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে অংশ নেবে। হাইকোর্টের আদেশে ৭৭ জন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। সব থেকে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২৬৬ জন। নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে মাঠে নামানো হয়েছে সেনাবাহিনী। ভোটের দিন কাল ভোরে প্রায় ৯৩ শতাংশ কেন্দ্রে ব্যালট পেপার যাবে। ৭ শতাংশ কেন্দ্রে ইতোমধ্যে ব্যালট পেপার চলে গেছে বলে ইসি থেকে জানা গেছে।
২৮ রাজনৈতিক দল থেকে যত প্রার্থী : প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের (নৌকা) ২৬৬ জন, জাতীয় পার্টির (লাঙ্গল) ২৬৫ জন, জাকের পার্টির (গোলাপ ফুল) : ২১ জন, তৃণমূল বিএনপির (সোনালী আঁশ) ১৩৫ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (আম) : ১২২ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেস (ডাব) : ৯৬ জন, জাসদ (মশাল) : ৬৬ জন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (একতারা) : ৭৯ জন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (ছড়ি) : ৬৩ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফ (টেলিভিশন) : ৪৫ জন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম (নোঙর): ৫৬ জন, বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন (ফুলের মালা) : ৩৮ জন, ইসলামী ঐক্যজোট (মিনার) : ৪২ জন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ (চেয়ার) : ৩৯ জন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মোমবাতি) : ৩৭ জন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ (গামছা) : ৩০ জন, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি (হাতুড়ি) : ২৬ জন, গণফ্রন্ট (মাছ) : ২১ জন, জাতীয় পার্টি- জেপি (বাইসাইকেল) : ১৩ জন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি (হাতঘড়ি) : ১৬ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (বটগাছ) : ১১ জন, বিকল্প ধারা বাংলাদেশ (কুলা) : ১০ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (কাঁঠাল) : পাঁচজন, গণতন্ত্রী পার্টি (কবুতর) : ১০ জন, গণফোরাম (উদীয়মান সূর্য) : ৯ জন, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (চাকা) : চারজন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ (কুঁড়েঘর) : পাঁচজন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল (হাত পাঞ্জা): চারজন।
আগের নির্বাচনগুলোয় প্রার্থী সংখ্যা : আগের নির্বাচনের মধ্যে, একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৩৯টি দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিল এক হাজার ৮৬১ জন। যার মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১৭৩৩ জন ও ১২৮ জন স্বতন্ত্র। দশম সংসদ নির্বাচনে ১২টি দল অংশ নিয়েছিল। সেই নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে একজন করে প্রার্থী ছিল বলে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বাকি ১৪৭ আসনে প্রার্থী ছিলেন ৩৯০ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র ছিলেন ১০৪ জন। দল নিবন্ধনের পদ্ধতি চালুর পর সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল ২৮টি দল। প্রার্থী ছিলেন এক হাজার ৫৬৭ জন। নিবন্ধন চালু হওয়ার আগে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ৫৫টি দল অংশ নেয়।
প্রার্থী ছিলেন এক হাজার ৯৩৯ জন। সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ৮১টি দল অংশ নেয়, দুই হাজার ৫৭২ জন প্রার্থী ছিলেন। ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে এক হাজার ৪৫০ জন প্রার্থী ছিলেন। দল ছিল ৪২টি। পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে দুই হাজার ৭৮৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। দল ছিল ৭৫টি। চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে আটটি দল অংশ নিয়েছিল। প্রার্থী ছিলেন ৯৭৭ জন। তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে এক হাজার ৫২৭ জন প্রার্থী ছিলেন, দল ছিল ২৮টি। দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯টি দল অংশ নেয়, প্রার্থী ছিলেন দুই হাজার ১২৫ জন। প্রথম সংসদ নির্বাচনে ১৪টি দল অংশ নেয়, এক হাজার ৯১ জন প্রার্থী ছিলেন।
ইসির তথ্য অনুযায়ী এই নির্বাচনে এবার ভোট দেবে ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৩২ হাজার ৯৩৪ ভোটার। এর মধ্যে নতুন ভোটার এক কোটি ৫৪ লাখ ৫২ হাজার। মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ছয় কোটি পাঁচ লাখ ৯২ হাজার ১৯৭ জন ও নারী পাঁচ কোটি ৮৭ লাখ ৩৯ হাজার ৮৮৯ জন। আর ট্রান্সজেন্ডার বা হিজরা ভোটার ৮৪৯ জন। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা ছিল ১০ কোটি ৪১ লাখ। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা ছিল ৯ কোটি ১১ লাখ এবং নবম জাতীয় নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা আট কোটি ১০ লাখ। এবার নির্বাচনে মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ২৪টি। আর ভোটকক্ষ দুই লাখ ৬০ হাজার ৮৫৬টি।
নির্বাচন পরিচালনার জন্য এবার রিটার্নিং কর্মকর্তা ৬৬ জনের মধ্যে বিভাগীয় কমিশনার দুইজন, জেলা প্রশাসক ৬৪ জন। সহকারী রিটার্নিং অফিসার ৫৯০ জনের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ৪৯৩ জন, উপজেলা নির্বাচন অফিসার ৫৬ জন, উপপরিচালক, স্থানীয় সরকার ১৪ জন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আটজন, জোনাল এক্সিকিউটিভ অফিসার ১১ জন, ক্যান্টনমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার পাঁচজন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) দুইজন, সার্কেল অফিসার উন্নয়ন একজন।
মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স : বিজিবি, কোস্টগার্ড, র্যাব, পুলিশ, আর্মড পুলিশ ও আনসার ব্যাটালিয়ন বাহিনীগুলো আগামী ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩ থেকে ১০ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখ পর্যন্ত মোট ১৩ দিন (যাতায়াত সময়সহ) নিয়োজিত থাকবে। আর সশস্ত্রবাহিনী ৩ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ১০ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখ পর্যন্ত দায়িত্বে রয়েছে (যাতায়াত ব্যতীত)। এ দিকে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সে নিয়োজিত সদস্যদের মধ্যে সশস্ত্রবাহিনী ৬২ জেলায় সেনা ৩৮ হাজার ১৫৪ জন এবং দুইটি জেলাসহ ১৯টি জেলায় নৌবাহিনী দুই হাজার ৮২৭ জন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এক হাজার ১৫১ প্লাটুন বা ৪৪ হাজার ৯১২ জন, কোস্টগার্ড ৭০ প্লাটুন বা দুই হাজার ৩৫৫ জন, র্যাব ৬০০ টিম, রিজার্ভ ৯৫ টিম, পুলিশ এক লাখ ৭৪ হাজার ৭৬৭ জন এবং আনসার ব্যাটালিয়ন পাঁচ লাখ ১৪ হাজার ২৮৮ জন।
৬৫৩ জন বিচারিক হাকিম : নির্বাচন উপলক্ষে সংঘটিত অপরাধসমূহ আমলে নেয়া ও তা সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার সম্পন্নের জন্য ভোটগ্রহণের পূর্বের দুই দিন, ভোটগ্রহণের দিন ও ভোটগ্রহণের পরের দুই দিন অর্থাৎ ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ জানুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত সর্বমোট পাঁচ দিনের জন্য ৩০০টি আসনে ৬৫৩ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারিক হাকিম নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
ইসির আইন শাখার যুগ্ম সচিব মো: মাহবুবার রহমান সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী অপরাধ আমলে নিয়ে ব্যালট পেপার ছিনতাই, ব্যালট পেপার ধ্বংস করা, ব্যালট বক্স ছিনতাই, ভোটদানে বাধা দেয়া বা বাধ্য করা, ভোটকেন্দ্রের পরিবেশকে ভোটের উপযোগী না রাখা, এসব অপরাধের তাৎক্ষণিকভাবে বিচার করতে পারবেন তারা। তিন থেকে সাত বছরের দণ্ড দিতে পারবেন।
ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন :
মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে : সাধারণ প্রতি কেন্দ্রে পুলিশ-দুইজন (অস্ত্রসহ), অঙ্গীভূত আনসার-সাধারণ আনসার-১২ জন, গ্রাম পুলিশ-এক থেকে দুইজন দফাদার-মহল্লাদার থাকবে। আর গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ প্রতি কেন্দ্রে পুলিশ- তিনজন (অস্ত্রসহ), অঙ্গীভূত আনসার-সাধারণ আনসার-১২ জন
গ্রাম পুলিশ-এক থেকে দুইজন দফাদার-মহল্লাদার থাকবে। আর মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রতি সাধারণ কেন্দ্রে পুলিশ-তিনজন (অস্ত্রসহ), অঙ্গীভূত আনসার-সাধারণ আনসার-১২ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পুলিশ-চারজন (অস্ত্রসহ), অঙ্গীভূত আনসার-সাধারণ আনসার-১২ জন মোতায়েন থাকবে।
তবে বিশেষ এলাকার প্রতি কেন্দ্রে পুলিশ-দুইজন (অস্ত্রসহ), অঙ্গীভূত আনসার-সাধারণ আনসার-১২ জন এবং গ্রাম পুলিশ-এক থেকে দুইজন, দফাদার-মহল্লাদার এবং গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পুলিশ-তিনজন (অস্ত্রসহ), অঙ্গীভূত আনসার-সাধারণ আনসার-১২ জন এবং গ্রাম পুলিশ-এক থেকে দুইজন, দফাদার-মহল্লাদার মোতায়েন থাকবে।
এ দিকে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল এ কে এম আমিনুল হক বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের নাশকতা মোকাবেলার জন্য আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত আছে। বিরোধী অনেক পক্ষ চায় না নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক। এ ব্যাপারে তাদের নানা প্রচেষ্টা আছে। তারা চাইবে এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হোক। আমরা সচেতন আছি। কোনো ধরনের নাশকতা নির্মূলে আমরা সক্ষম হবো।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ২৫০ প্লাটুন আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্যরা এক হাজারটি সেকশনে ভাগ হয়ে গত ২৯ ডিসেম্বর থেকে আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩ দিনের জন্য স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মোতায়েন রয়েছে। উপকূলের ১৩টি উপজেলা বাদে সব উপজেলায় আনসার ব্যাটালিয়নের একটি করে স্ট্রাইকিং টিম নির্বাচনী পরিবেশ অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ রাখতে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার পরিকল্পনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছে। এ ছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই হাজার ৮৫৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন।








































