Home জাতীয় ভাঁওতাবাজির ভোট বর্জনের ডাক বিএনপির: আজ থেকে ৪৮ ঘণ্টার হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে পালনের...

ভাঁওতাবাজির ভোট বর্জনের ডাক বিএনপির: আজ থেকে ৪৮ ঘণ্টার হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে পালনের নির্দেশনা

45

ঢাকা অফিস।।

সরকারের সব হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে আগামীকাল ৭ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের নামে ‘ভাঁওতাবাজির ভোট’ বর্জনের জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছে বিএনপি। গতকাল শুক্রবার দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন থেকে এই আহ্বান জানানো হয়।

ভোট বর্জনের ডাক দিয়ে আজ শনিবার ভোর ৬টা থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো। হরতালের এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালনের জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছে বিএনপি। একইসাথে নির্বাচনের দিন কোনো সংঘর্ষে না জড়াতেও বলা হয়েছে।

ভোটের দুই দিন আগে গতকাল সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি। এতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘৭ জানুয়ারি কিসের ভোট? নির্বাচন তো আগেই হয়ে গেছে, ৭ তারিখে এর ঘোষণা হবে মাত্র। আমরা সরকারের এই ভাঁওতাবাজি, ধাপ্পাবাজি, ভুয়া নাটক, তামাশার নির্বাচনের বৈধতা দেবো না। সেই কারণেই আমরা এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছি। এটা ইলেকশন না এটা সিলেকশন।’
জনগণের প্রতি ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আজকে গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রতি এই আহ্বান জানাব, আপনারা এই জনপ্রতিনিধিত্ববিহীন সরকারের কোনো হুমকি-ধমকি অথবা তাদের কোনো ভয়-ভীতিতে চিন্তিত হবেন না। আপনারা সাহসিকতার সাথে ভয়ভীতির মোকাবেলা করুন, যে বা যারা আপনাকে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধ্য করতে চায় তাদের চিহ্নিত করুন। আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানাতে চাই, ভাতা কার্ড জব্দ করে কিংবা ভাতা বন্ধ করে দিয়ে কিংবা আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধ্যকরণ কোনো অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাথে যারা জড়িত হবেন বা হচ্ছেন ভবিষ্যতে তাদের আইনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।’
মঈন খান বলেন, এই একদলীয় বাকশালী সরকারের সময় ফুরিয়ে এসেছে। তাই তাদের অন্যায় ও অবৈধ হুমকিকে পরোয়া করার আর কোনো কারণ নেই। সর্বজনীন ভোট বর্জনের মাধ্যমে চলমান আন্দোলনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও অংশগ্রহণ একদলীয় শাসনের কবল থেকে বাংলাদেশের মানুষ শিগগিরই মুক্তি পাবে।

৭ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট কারচুপি করতে সরকার ও সরকারি দলের বিভিন্ন নীলনকশার পরিকল্পানা যেমন, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা লাগামহীন জ্বাল ভোট প্রদানের পরিকল্পনা, ভোটার সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো, মৃত ও প্রবাসী ব্যক্তির নামে ভুয়া ভোট প্রদান প্রভৃতি বিষয়গুলো তুলে ধরেন মঈন খান।
তিনি বলেন, আজ থেকে অল্প কয়েক মাস আগে এক উপনির্বাচনে ৫৩ সেকেন্ডে ৪৭টি ভুয়া ভোটের সিল মারা হয়েছিল। আমরা কি বলব এটা গিনেস বুকের রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। সেই ধারা ৭ জানুয়ারির পাতানো নির্বাচনে তারা আরেকটি কলঙ্কিত অনিয়ম ঘটাতে যাচ্ছে। সেটা আমাদের কারো বলার অপেক্ষা রাখে না। বিএনপির পক্ষ থেকে আজ আমরা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করার হুমকি, ভাতা কার্ডধারী অসহায় মানুষের জীবনজীবিকাকে হুমকিতে ফেলা কিংবা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোস্টাল ভোট অথবা অন্য কোনো ভূমিকায় তাদেরকে অবতীর্ণ করিয়ে নির্বাচনেপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এর প্রত্যেকটি আইনগত অপরাধ। বিশেষত যারা আমাদের দরিদ্র ট্যাক্সপেয়ারের যে অবদান সেই অবদান থেকে রাষ্ট্রীয় ভাতা ও বেতন পাচ্ছেন তারা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র থেকে এই সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। এটা দল ও ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোনো অনুদান নয়। অতএব ভাতা কার্ডের বিনিময়ে বাংলাদেশের কোনো নাগরিককে ভোট দিতে বাধ্য করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

গুলশানে মঈন খানের বাসভবনে এই সংবাদ সম্মেলন হয়। এসময় তার সাথে ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সেলিমা রহমান।
‘বিএনপির অবস্থান’ : মঈন খান বলেন, বিএনপি একটি উদারনৈতিক শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দল। বিএনপিকে নিয়ে অনেক গল্প সরকার সাজিয়েছে, অনেক মিথ্যা ঘটনা তারা সৃষ্টি করে তার দায়দায়িত্ব বিএনপির ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছে। আমরা জানি অতীতে হয়তো এমন একটি বিশ্ব পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল আপনারা জানেন, আফগানিস্তানের একটি চিত্র ছিল তখন হয়তো সরকারের এই সব গালগল্প অনেককে মিথ্যাভাবে প্রভাবিত করেছে কিন্তু আজকের পৃথিবী আলাদা। বিশ্বের মিডিয়া ও বিশ্বের গণতন্ত্রীকামী মানুষ তারা বাংলাদেশের আজকের চিত্র দেখেছে এবং তারা ইতোমধ্যে প্রকাশ করে দিয়েছে। ২৮ অক্টোবরের ক্র্যাকডাউনের কথা তারাই বলেছে, তারা বলছে যে, একজন মানুষের ইচ্ছায় আজকে বাংলাদেশের ১২ কোটি ভোটারের ইচ্ছা নির্ধারিত হবে, এটা কোনদিন হতে পারে না।
তিনি বলেন, ইনশাআল্লাহ আমরা এই দেশের এই অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী সরকারকে একটি শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় হটিয়ে দিয়ে একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার আবার প্রতিষ্ঠা করব। সরকার ভাবছে ৭ জানুয়ারি তাদের জয়লাভের দিন। আমি বলব, ৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের পরাজয়ের দিন। কারণ সেদিন তারা বাংলাদেশের নতুন করে অপমৃত্যু ঘটাবে।
‘সরকার নাশকতা সৃষ্টি করে দায় চাপাচ্ছে’ : স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, অতীতে আমাদের আন্দোলনকে বিপথগামী করার জন্য, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য সরকার নিজেই বেশ কিছু ঘটনা ঘটিয়ে তার দায় আমাদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছে। এখনো সেই অপচেষ্টা চলছে। আপনারা কয়দিন আগে দেখেছেন যে, কেউ কিছু জানে না কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হলো যে, হাসপাতালগুলোতে একটা নির্দিষ্ট দিনে রেডি রাখার জন্য যাতে তারা চিকিৎসা করতে পারে। ঠিক ওই দিন একেবারে ঢাকা মহানগরীর ভেতরে বেশকিছু গাড়িতে আগুন ধরে গেল এবং বেশ কিছু লোক সেখানে মারা গেল। কোনো তদন্ত ছাড়াই সেদিন পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হলো যে, এটা করেছে, যারা অবরোধ করেছে তারা। এটা এখন থেকে নয়, বহু বছর ধরে সরকার এই অপকৌশল চালিয়ে আসছে। তারা বিরোধী দলের আন্দোলনকে বিপথগামী করার জন্য অপকৌশল চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এখনো তারা নির্বাচন করছে, বিরোধী দল এই নির্বাচনে নাই। এরপরও কয়েকজন মানুষ মারা গেল, অনেক মানুষ আহত হলো, অনেক জায়গায় অগ্নিসংযোগ হয়েছে, বাড়িঘর আক্রমণ হয়েছে সেটা কে বলবে? বিএনপি এই নির্বাচনের মধ্যে নাই বা যারা বিরোধী দল আন্দোলনে রত তারা নির্বাচনের এই প্রক্রিয়ার মধ্যে নাই। আমরা স্রেফ বলছি জনগণের কাছে এই নির্বাচন একটা প্রহসন, এটা অর্থহীন নির্বাচন যেটাতে দয়া করে কেউ জড়িত হবেন না। কারণ এটা একটা অপরাধমূলক তৎপরতা, এটাতে জড়িত হওয়াও অপরাধ। আমরা শুধু শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন বর্জন করার আহ্বান জানাচ্ছি। আর কোনো আহ্বান আমাদের নাই। এই বর্জন করার আইনগত অধিকার আমার কাছে। এই বর্জন যারা করবে তারা আমাদের আহ্বান শুনবে। এর বাইরে অন্য যা করবে সেটা তাদের (সরকার) হুকুমে করবে আমাদের হুকুমে না।
মঈন খান বলেন, ভোট তো যেদিন মনোনয়নপত্র দাখিল হয়েছে ৩০ নভেম্বর সেদিনই হয়ে গেছে। আজকে যেকোনো লোককে জিজ্ঞাসা করুন তারা বলে দেবে কোন আসনে কে আসবে।
‘ওরা দেশ নিয়ে খেলা করছে’
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ওবায়দুল কাদের খেলা হবে বলেছেন। কিন্তু বিএনপি রাজনীতিকে খেলা বলেই মনে করে না। বিএনপি মনে করে রাজনীতি একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা খেলার বিষয় না। আমরা এই খেলায় অংশগ্রহণ করি নাই, এই খেলায় অংশ নিতে রাজি না।
যারা নির্বাচনকে খেলা মনে করে তারা এটাকে নিয়ে খেলা করছে। তারা জনগণের ভাগ্য নিয়ে খেলা করছে, মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা নিয়ে খেলাধুলা করছে, আমাদের অর্জন নিয়ে খেলাধুলা করছে এবং দেশটার সর্বনাশ করে দিচ্ছে।
মুক্তকামী জনসাধারণের উদ্দেশে তিনি বলেন, লড়াই চালিয়ে যেতে হবে প্রকৃত গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। ইনশাআল্লাহ আমরা যেমন দেশকে স্বাধীন করতে পেরেছি, তেমনি এদেশে আবার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারব। বাকশালের কবরস্থানের ওপরে আমরা যেমন বাগান রচনা করেছিলাম, আবার আমরা করতে পারবো ইনশাআল্লাহ।
‘আমাদের হরতালের উদ্দেশ্য প্রতিবাদ জানানো’
স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, হরতাল মানে কী? আমাদের প্রতিবাদ। আমাদের নেতাকর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে যতখানি সম্ভব তারা করবে। আজকেও খবরের কাগজে এসেছে, সহিংসতায় দু’জন মারা গেছে, এটা প্রতিদিন ঘটছে। এখন ওদের (সরকার) একটা মাত্র লক্ষ্য আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর যেভাবে হোক দায় চাপানো। আমরা সেটা হতে দেবো না। আমরা জনগণের কাছে আবেদন জানিয়েছি, আপনারা হরতাল পালন করুন, এই নির্বাচন বর্জন করুন। সেজন্য আমাদের নেতাকর্মীরা সেইভাবে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করবে। উদ্দেশ্য আমাদের প্রতিবাদটা জাতির কাছে জানালাম, বিশ্বের কাছে জানালাম এবং জাতিও আজকে এর প্রতিবাদ করছে।