ঝালকাঠি প্রতিনিধি।।
শত বছরের প্রচলিত হাতে ঘুরানো তাঁতের চাকার বদলে এবার দেশে এসেছে কোরিয়ার আধুনিক মেশিন। ফলে আধুনিকতার ছোঁয়ায় ফিরেছে ঝালকাঠির গামছার ঐতিহ্য। বাড়ছে উৎপাদন; মিটছে চাহিদা। দৈর্ঘ্য সাড়ে চার হাত আর প্রস্থে আড়াই হাতের এক একটি গামছা দেশের খুচরা বাজারে ৩৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর জেলার এ প্রাচীন শিল্পটি ঘুরে দাঁড়ানোয় নতুন উদ্যোক্তারা আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
সারাদেশে যেসব পণ্যে ঝালকাঠির সুনাম রয়েছে তার মধ্যে ঝালকাঠির গামছা অন্যতম। শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও সমাদৃত এই ঐতিহ্যবাহী তাঁতের গামছা। ৪০ বছর আগে শুরু হওয়া এই গামছা শিল্প এখনও টিকে আছে মাথা উঁচু করে। ঝালকাঠির গনি মিয়ার গামছা সারাদেশেই একটি ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি। তবে সেই গনি মিয়া এখন আর নেই। গনি মিয়ার মৃত্যুর পরে তার ছেলে নাসির উদ্দিন কয়েকবছর তাতে গামছা বুনে প্রতিষ্ঠানটি ধরে রেখেছিলেন। বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে নাসির উদ্দিন পৈত্রিক পেশার হাল ছেড়ে দেন। ওই প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেছেন গনি মিয়ার ভাইয়ের ছেলে খোকন মিয়া।
এতদিন এই গামছা তাঁতশিল্পের মাধ্যমে হাতে বোনা হতো। যার কারণে চাহিদা বেশি থাকলেও উৎপাদন হতো কম। এছাড়া হাতে বোনা তাতের সংখ্যাও এখন অনেক কম। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার ধরে রেখেছে পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য। এ রকম একটি সংকটময় পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে আবার ঝালকাঠির গামছা শিল্প। গামছা তৈরিতে আধুনিকতার ছোঁয়া এনেছে ঐতিহ্যবাহী গনি মিয়ার গামছা। প্রায় সাতমাস ধরে আধুনিক মেশিনে প্রস্তুত হচ্ছে গনি মিয়ার গামছা।
সরেজমিনে পশ্চিম ঝালকাঠির কির্ত্তীপাশা সড়কের রামনগরে গিয়ে দেখা যায়, কোরিয়া থেকে আমদানি করা স্বয়ংক্রিয় মেশিনে গামছা তৈরি করছেন কারিগররা। প্রতিদিন এখন কারখানায় ২৫০টি গামছা উৎপাদন হচ্ছে।
কারিগররা জানান, ঝালকাঠির গামছা যাচ্ছে চট্টগ্রাম, নরসিংদি, চাঁদপুর, বরগুনা ও পিরোজপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ঝালকাঠির এ ঐতিহ্যবাহী গামছা দেশি-বিদেশি উর্ধ্বতন মেহমানদেরও দেওয়া হয় উপহার-উপঢৌকন হিসেবে। ঝালকাঠির শীতলপাটি ও গামছা উপহার দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে দীর্ঘদিনের। প্রতিটি গামছার খুচরা মূল্য ৩৬৫ টাকা। গামছার তৈরি কাঁচামাল আনা হয় নারায়নগঞ্জ থেকে। নিজস্ব ডিজাইনাররা কারাখানায় বসেই ডিজাইন করছে বাহারী রংয়ের গামছার। গনি মিয়ার গামছার চাহিদা বরাবরই বেশি। কিন্তু তাঁতে বুনে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতো না। বর্তমানে মেশিনে তৈরি গামছার উৎপাদন এখন বেড়েছে। উৎপাদন আরো বাড়াতে হলে মেশিন ও কারখানার সংখ্যা বাড়াতে হবে বলে জানিয়েছেন কারিগররা।
স্থানীয় যুবক তালাশ মাহামুদ বলেন, শৈশবে দেখেছি বাসন্ডা গ্রামে ঘরে ঘরে তাঁতে শাড়ি-লুঙ্গি আর গামছা বোনা হতো। শতাধিক কারিগর পরিবারের প্রধান আয় ছিল এই শিল্প। তাঁতের খট খট শব্দে দিন-রাত মুখরিত ছিল। তবে তা এখন অতীত স্মৃতি। এখন দুই-তিনটি পরিবার কেবল গামছা তৈরি করে বাপ-দাদার পেশা টিকিয়ে রেখেছেন। গত দুই যুগে আস্তে আস্তে তাঁত বোনাও বন্ধ হয়ে যায়। তবে সংকটময় পরিস্থিতি কাটিয়ে আবারো ঘুরে দাঁড়িয়েছে ঝালকাঠির গামছা শিল্প। কয়েকজন উদ্যোক্তা মিলে গত মে মাসে বাসন্ডা গ্রামে তাঁতের আধুনিক মেশিনে উৎপাদন করছেন গুণগতমানের গামছা।
উদ্যোক্তা খোকন হোসেন জানান, কোরিয়া থেকে আমদানি করা স্বয়ংক্রিয় এ মেশিনে এখন প্রতিদিন কারখানায় ২৫০ গামছা উৎপাদন হচ্ছে খুব সহজেই। আর তা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
পাকা রঙ এবং টেকসইসহ গুণগতমানে ঝালকাঠির গামছা দেশসেরা দাবি করে গামছার উদ্যোক্তা খোকন আরো বলেন, দৈর্ঘ্য সাড়ে চার হাত আর প্রস্থে আড়াই হাতের এখানকার এক একটি গামছা দেশের খুচরা বাজারে ৩৬৫ টাকায় বিক্রি হয়।
ঝালকাঠি বিসিকের শিল্পনগরী কর্মকর্তা মো. আল-আমীন বলেন, জেলার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি একেবারেই হারিয়ে যাচ্ছিল। নতুন করে আধুনিক মেশিনের যাত্রায় তা আবারো প্রাণ ফিরে পেয়েছে। আসলে মেশিনে উৎপাদন লাভজনক হয় ও সময় বাঁচায়। স্থানীয় এই প্রাচীন শিল্পটির প্রসারে উদ্যোক্তা ও কারিগরদের প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
ঝালকাঠি বিসিক উপ-ব্যবস্থাপক এইচ এম ফাইজুর রহমান জানান, ঐতিহ্যবাহী গামছা শিল্পের প্রসারে কারিগরদের পাশে দাঁড়াবে বিসিক। কারিগররা ঋণের আবেদন করলে তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।










































