-মো: মেহেদী হাসান
গত ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ তারিখে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটি আপাতদৃষ্টিতে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও সংবাদটি যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে, তা মোটেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং অনেক সুদুরপ্রসারী হতে পারে। আগেই বলেছি, সংবাদটি একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ঘটনাটি ঘটে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার বড় শ্যামনগর গোতামারিপাড়া গ্রামে গত ১১ আগস্ট, ২০২২ সালে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী ঐদিন গ্রামে তিন যুবক এসে এক শিক্ষিকার বাড়িতে টেবিল-চেয়ার পেতে বসে এবং একটি মুঠোফোন কোম্পানির সিম বিনামূল্যে দেয়ার কথা বলে। সঙ্গে ইন্টারনেট ও টকটাইমের কথা বলা হয়। স্বাভাবিকভাবেই গ্রামের অনেকেই এ সিম কিনতে আগ্রহী হয়। দেড় শতাধিক লোক সিম নিতে আসলেও এই যুবকেরা মোট ৭৪ জনকে সিম দেন এবং বাকিদেরকে সার্ভারে সমস্যা, আঙ্গুলের ছাপ মিলছেনা ইত্যাদি কথা বলে সিম দেননি। তবে তারা সবার আঙ্গুলের ছাপ, চোখের মনির ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি নেন। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, সম্প্রতি একটি প্রতারনা ও অর্থ আত্মসাতের মামলা অনুসন্ধানে নামে আইন প্রয়োগকারি সংস্থা। তারা প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত সিম ও মুঠোফোনে আর্থিক সেবার (এম এফ এস) হিসাবগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে। দেখা যায়, এগুলো দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার দুজন শিক্ষক, একজন ভিক্ষুক, একজন কৃষক ও একজন হতদরিদ্র বিধবা নারীর নামে নিবন্ধিত। আইন প্রয়োগকারি সংস্থা সাতজনের নামে নোটিশ পাঠিয়ে হাজির হতে বলে। ওই নোটিশ পাওয়া ব্যক্তিরা এখন আতঙ্কিত।
ঘটনাটি পর্যালোচনা করলে যেটি মনে হয়, দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার বড় শ্যামনগর গোতামারিপাড়া গ্রামের ঐদিনের সিমগ্রহীতারা সম্ভবত একটি প্রতারকচক্রের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। প্রতারকচক্রের সদস্যরা তাদের আঙ্গুলের ছাপ ও চোখের রেটিনার মত অত্যন্ত স্পর্শকাতর ব্যাক্তিগত তথ্যাদি চুরি করেছেন এবং সম্ভবত সেগুলি ব্যবহার করে মুঠোফোনে আর্থিক সেবার একাউন্ট করেছেন ও প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাত করেছেন। কিন্তু এ ঘটনায় দায় এখন বর্তাচ্ছে মূলত ঐ তথ্যগুলি যাদের কাছ থেকে নেয়া হয়েছে, তাদের উপর। ব্যক্তিগত তথ্য চুরির এ ধরণের ঘটনা অত্যন্ত বিপদজনক। কারণ, বাংলাদেশ আগামীতে ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। আগামীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবাসহ অন্যান্য নানা কার্যক্রম এর অটোমেশন সম্পন্ন হবে যাতে একটি বড় ভূমিকা রাখবে একজন নাগরিকের বায়ো বা এসব ব্যক্তিগত তথ্য। সুতরাং, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যাদি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বর্তমান সরকার স্মার্ট বাংলাদেশের ধারণায় যে চারটি স্তম্ভ নির্ধারণ করেছেন, তার প্রথমেই আছে স্মার্ট সিটিজেন। কারণ সাধারণ জনগোষ্ঠীর নূন্যতম ডিজিটাল লিটারেসি ছাড়া অটোমেশন বাস্তবায়িত হলে এ ধরনের ডিজিটাল চুরি ও অপরাধ বেড়ে যেতে পারে এবং আমরা আমাদের অজান্তেই বড় ধরনের বিপদে পড়ে যেতে পারি।
পাশাপাশি এ চুরি ও অপব্যবহার রোধে আইনের সুরক্ষাও প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে বিশ্বের নানা দেশেই ব্যক্তিগত তথ্যাদি এবং তার সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে। এ বছরের গোড়ার দিকে যখন চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা দেখা দেয়, সেসময় তাইওয়ান তার দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যাদি নিয়ে কাজ করে এমন টেক প্রতিষ্ঠানদেরকে নিরাপত্তার স্বার্থে তার দেশের অভ্যন্তরে সার্ভার স্থাপনের নির্দেশনা দেয়। সুতরাং এখন বিশ্বের নানা দেশ তাদের নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যাদি সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন করেছে বা করছে। ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আঙ্কটাড) এর হিসাবমতে বিশ্বের ১৯৪ টি দেশের মধ্যে ১৩৭ টি দেশে অর্থাৎ ৭১ % দেশে এ সংক্রান্ত আইন রয়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৬০ টি দেশের মধ্যে ৩৪ টি দেশে অর্থাৎ ৫৭ % দেশে এ আইন রয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলো নানা কারনে এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের মধ্যে ভূটানে ‘ভূটান ইনফরমেশন, কমিউনিকেশন এন্ড মিডিয়া এ্যাক্ট ২০১৮’ নামে, ইন্দোনেশিয়াতে ‘সিস্টেম রেগুলেশন ২০১৬’ নামে, মালয়েশিয়াতে ‘পার্সোনাল ডাটা প্রোটেকশন এ্যাক্ট ২০১০’ নামে, নেপালে ‘দি প্রাইভেসি এ্যাক্ট ২০১৮’ নামে, ফিলিপাইনে ‘ডাটা প্রাইভেসি এ্যাক্ট অব ২০১২’ নামে, সিংগাপুরে ‘পার্সোনাল ডাটা প্রোটেকশন এ্যাক্ট নং ২৬ ২০১২’ নামে এবং থাইল্যান্ডে ‘পার্সোনাল ডাটা প্রোটেকশন এ্যাক্ট বি.ই.২৫৬২, ২০১৯’ নামে এ সংক্রান্ত আইন বলবৎ রয়েছে। এছাড়া আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে ‘পার্সোনাল ডাটা প্রোটেকশন, ২০১৯’ নামে, মায়ানমারে ‘সাইবার সিকিউরিটি ল এন্ড প্রাইভেসি এন্ড ডাটা প্রোটেকশন’ নামে এবং পাকিস্তানে ‘ইলেকট্রনিক ডাটা প্রোটেকশন এ্যাক্ট ২০০৫’ নামে খসড়া আইন পাশের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশেও এ সংক্রান্ত আইন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত খসড়া ‘উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৩’ ইতিমধ্যে সর্বসাধারনের মতামত গ্রহণের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এর ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করা হয়েছে। জনসাধারনের এ সংক্রান্ত সচেতনতা এবং আইনি সুরক্ষা এ দু’য়ে মিলে আগামিতে আমাদের স্পর্শকাতর ব্যক্তিগত তথ্যাদি সুরক্ষিত থাকবে বলে আমরা আশা করি।
পিআইডি ফিচার/ লেখক: মো: মেহেদী হাসান, সিনিয়ন তথ্য অফিসার আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা। তাং ০১-১০-২০২৩











































