Home আঞ্চলিক হিলটন মেটা এফএক্স: কোটি কোটি টাকা মেরে জাল গুটাচ্ছে ওরা

হিলটন মেটা এফএক্স: কোটি কোটি টাকা মেরে জাল গুটাচ্ছে ওরা

48

কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি।।
মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের (এমএলএম) নামে ভুঁইফোঁড় কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে ঠকেছেন দেশের লাখো মানুষ। কিছুদিন আগে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়েছে অ্যাপভিত্তিক বিদেশি প্রতিষ্ঠান মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ (এমটিএফই)। এতে ফতুর হয়ে হায় হায় করছেন বহু নাগরিক। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই প্রকাশ্যে এসেছে আরেক প্রতারক অ্যাপভিত্তিক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তথ্য। এরই মধ্যে বিনিয়োগ পেয়েছে কোটি কোটি টাকার। এখন চলছে কারবার গুটানোর পাঁয়তারা। এতে ঘরে বসে কোটিপতি হওয়ার লোভে হিলটন মেটা এফএক্স নামে নতুন ডিজিটাল ফাঁদে পা দিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর পাঁচ শতাধিক গ্রাহক।

জানা গেছে, তিন মাস আগে হিলটন মেটা এফএক্স অ্যাপে বিনিয়োগ করেন কুমারখালী পৌরসভার আবেদমোড় এলাকার আরজু আহমেদ। ওই মোড়ে তাঁর একটি মোবাইল ফোনের দোকান রয়েছে। তিনি স্থানীয় হোচেন আলীর ছেলে। আরজুর মাধ্যমে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এই প্রতারণার জাল। এ ছাড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান সোহাগও চালাচ্ছেন হিলটন। তাঁর মাধ্যমেও শত শত মানুষ এই অ্যাপে বিনিয়োগ করেছেন। এর কোনো নির্দিষ্ট কার্যালয় নেই। পাওয়া যায়নি কোনো এজেন্ট বা প্রতিনিধিও। ফেসবুক মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে কয়েকটি গ্রুপ খুলে এই কারবার চালানো হচ্ছে। এর একটি গ্রুপের স্ক্রিনশট (ছবি) সমকালের হাতে রয়েছে। সেখানে ১০২ জন সদস্য যুক্ত আছেন। তবে এমটিএফইর মতো প্রকাশ্যে প্রচার, সভা-সেমিনার করছে না এ প্রতিষ্ঠান। এমটিএফই বন্ধের পর হিলটনের জ্যেষ্ঠ গ্রাহক ও তথ্যদাতারাও অনেকটা গা-ঢাকা দিয়েছেন। মোবাইল ফোনে কথা বলা ছাড়া সশরীরে কারও সঙ্গে দেখা দেন না তারা। চেষ্টা চলছে পালানোর।

বিনিয়োগকারীরা জানান, নতুন এমএলএম কোম্পানি হিলটনে ১০০ ডলার থেকে শুরু করে কয়েক হাজার ডলার বিনিয়োগ করেছেন উপজেলার গ্রাহকরা। প্রতিষ্ঠানটি সপ্তাহে পাঁচ দিন লভ্যাংশ দেয়। প্রতিদিন মূল বিনিয়োগের প্রায় তিন শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিচ্ছে। নতুন কাউকে যুক্ত করতে পারলে বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ সঙ্গে সঙ্গেই মধ্যস্থতাকারীর অ্যাকাউন্টে যোগ হয়। তবে দু-তিন দিন ধরে লভ্যাংশ কম পাচ্ছেন গ্রাহকরা। অনেকের লভ্যাংশ আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অনুমান করা হচ্ছে যে তারা প্রতারণার জাল গুটিয়ে নিচ্ছে।

বিনিয়োগকারী মো. রাকিব বলেন, দেড় মাস আগে দুটি অ্যাকাউন্টে ২০০ ডলার (বাংলাদেশি টাকার প্রায় ২২ হাজার টাকা) বিনিয়োগ করি। সপ্তাহে পাঁচ দিন লভ্যাংশ পাচ্ছি। শুরুর দিকে ১০ ডলার হলেই অর্থ উত্তোলন করা যেত। মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে বিকাশে টাকা পাওয়া যেত। কিন্তু এখন ২৫ ডলারের কম উত্তোলন করা যাচ্ছে না। আবার সঙ্গে সঙ্গে টাকাও পাওয়া যায় না।

মো. তুষার নামে আরেক বিনিয়োগকারী বলেন, আমার জানামতে উপজেলায় হিলটনের প্রধান ব্যক্তি আরজু। আমিও তাঁর মাধ্যমেই ১০০ ডলার বিনিয়োগ করেছি। পরে কয়েকজনকে রেফার করেছি। উপজেলার এলংগী এলাকায় ঘরে ঘরে এখন হিলটন কারবার চলছে। এরই মধ্যে অন্তত ৫০০ গ্রাহক কয়েক কোটি টাকা খাটিয়েছেন।

এ বিষয়ে কথা বলতে আরজু আহমেদের বাড়িতে গেলে তাঁকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, আমি ইউটিউব দেখে প্রথমে হিলটনে ১০০ ডলার বিনিয়োগ করি। এরই মধ্যে আমার মূল বিনিয়োগের টাকা উঠে গেছে। আমার সঙ্গে আরও ১০ থেকে ১২ জন যুক্ত রয়েছেন। অন্যরা কীভাবে এই অ্যাপে টাকা খাটাচ্ছেন তা জানি না। আর আমি কোনো মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলিনি।

ছাত্রলীগ নেতা মনিরুজ্জামান বলেন, আমি বিনিয়োগ করে লাভ পাওয়ায় কয়েকজনকে যুক্ত করেছি। এখন আমার পরিচিত ১০-১২ জন হিলটনের সঙ্গে আছে। তবে আমি কারও ক্ষতি করছি না। যারা ভালো মনে করছেন, বিনিয়োগ করছেন, যারা মন্দ মনে করছেন তারা টাকা তুলে নিচ্ছেন।

কুমারখালী নাগরিক কমিটির সভাপতি আকরাম হোসেন বলেন, মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করে। এরপরও কীভাবে বিভিন্ন অবৈধ কোম্পানি প্রতারণার জাল বিছায় আর বছরের পর বছর ব্যবসা পরিচালনা করে? আবার এগুলো কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে চলেও যায়। প্রশাসন এর দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

থানার ওসি আকিবুল ইসলাম বলেন, উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণসহ কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এমটিএফইর মতো পালিয়ে যাওয়ার পর অভিযোগ দিলে কীভাবে সেই টাকা উদ্ধার হবে?

ইউএনও বিতান কুমার মণ্ডল বলেন, লোভে পড়ে বিনিয়োগকারীরা প্রথমে বিষয়টি গোপন রাখেন। পরে লোকসান হলে প্রশাসনের কাছে আসেন। সে জন্য প্রতারকদের ধরা যায় না। তবে সাংবাদিকের কাছে এ বিষয়ে জানার পর অভিযান চালিয়ে কাউকে শনাক্ত করা যায়নি।