Home Uncategorized সংঘাতের পথেই রাজনীতি

সংঘাতের পথেই রাজনীতি

57

পাল্টাপাল্টি অবস্থান কর্মসূচিতে সহিংসতা ।। সাঁজোয়া যান ভাঙচুর যাত্রীবাহী গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ।। গয়েশ্বর আমানসহ ৬ শতাধিক নেতাকর্মী ও ২০ পুলিশ আহত ।। বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৭ থানায় ১১ মামলায় আসামি ৫৪৭, আটক ৭ শতাধিক ।। শান্তি প্রত্যাশীদের সোচ্চার হতে হবে, বদিউল আলম মজুমদার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ঢাকা অফিস।।

সরকার পতনের একদফা দাবিতে রাজধানী ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে গত শনিবার বিএনপি ও সমমনা ৩৭টি রাজনৈতিক দলের অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে অন্তত পাঁচ স্থানে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরাও স্থানে স্থানে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। রাজধানীর মাতুয়াইল রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। জানা গেছে, এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাসহ ৬ শতাধিক নেতাকর্মী ও পুলিশের ২০ সদস্য আহত হয়েছেন, পুলিশের সাঁজোয়া যানসহ ৬টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এসব ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১১টি মামলায় ৫৪৭ জনকে আসামি করা হয়েছে, আটক করা হয়েছে ৭ শতাধিক নেতাকর্মীকে। সব মিলিয়ে সংঘাতের পথেই হাঁটছে দেশের রাজনীতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যারা দেশে সংঘাত চান না, শান্তি চান; উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাদের সোচ্চার হতে হবে।

শুক্রবার রাজধানীতে লাখো নেতাকর্মী-সমর্থকের জমায়েতে অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশ থেকেই পরদিন অর্থাৎ শনিবার রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেয় বিএনপি। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাজধানীতে প্রবেশের ৫ মুখে অবস্থান নেয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। কিন্তু পুলিশের বাধা এবং আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ‘সতর্ক পাহারা’র মুখে তারা বেশি সময় টিকে থাকতে পারেনি। বেলা ১১টা থেকে পাঁচ ঘণ্টা অবস্থান

কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হলেও কোথাও আধা ঘণ্টা, কোথাওবা ঘণ্টাখানেকের বেশি অবস্থান নিতে পারেনি বিএনপি। মাতুয়াইল এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষ হয় ধোলাইখালেও। এ দুটি স্থানে পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, শেল ও রাবার বুলেট ছুড়েছে।

পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষে ধোলাইখালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় এবং গাবতলীতে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান আহত হন। অন্যদিকে আহত ২০ পুলিশ সদস্যের মধ্যে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মেহেদী হাসানও রয়েছেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি বলছে, ৭টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, ২৪টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে।

এসব ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজধানীর সাত থানায় ১১টি মামলা করা হয়েছে। মামলায় দলটির নেতা আব্দুস সালাম আজাদ, অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরীসহ ৫৪৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মী। বিস্ফোরক উদ্ধার, বাস পোড়ানো, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় করা এসব মামলায় ১৪৯ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, জানান ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের উপকমিশনার ফারুক হোসেন। সংঘর্ষের ঘটনায় আরও অন্তত তিনটি মামলা প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার কে এন রায় নিয়তি। ডিএমপি সূত্র জানায়, মাতুয়াইলে বিএনপি ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় কদমতলী থানায় পুলিশ বাদী হয়ে ৭০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ী থানায় দুটি মামলা হয়েছে। ৬১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জুম্মন হোসেনসহ ১০৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। উত্তরায় সংঘর্ষের ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় দুটি মামলা হয়েছে। একটি মামলায় গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন সরকারসহ ১৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য মামলায় আসামি করা হয়েছে ১৬ জনকে। ধোলাইখাল এলাকায় সংঘর্ষে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালামসহ ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা মামলায় অজ্ঞাত ৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে বংশাল থানায়। সেখানে আসামি করা হয়েছে ২৫ জনকে। সংঘর্ষের ঘটনায় উত্তরা পূর্ব থানায় মোট মামলা হয়েছে তিনটি। এই তিনটি মামলায় মোট আসামি করা হয়েছে ১০০ জনকে।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ফারুক হোসেন জানান, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, নয়াবাজার, ধোলাইখাল ও শ্যামলী এলাকায় পুলিশের সাঁজোয়া যান, পিকআপ ভ্যান ও কয়েকটি বাসে আগুন এবং ভাঙচুর করে বিএনপি নেতাকর্মীরা। মাতুয়াইলে সকালে বিএনপির সমর্থকরা পুলিশের আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) লক্ষ্য করে হামলা চালায়। ওই হামলায় মেহেদী হাসান আহত হন। মাতুয়াইলে আরও দুজন এএসআই আহত হয়েছেন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির সমর্থকদের হামলায় এখন পর্যন্ত ২০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। আহত পুলিশ সদস্যদের রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও সরকার সমর্থকদের বাধার মুখে পড়ে। এরপর আন্দোলনকারীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে তারা ইটপাটকেল মারতে শুরু করেন। পুলিশও এ সময় লাঠিচার্জের পাশাপাশি রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এভাবেই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

এদিকে আটকদের বিষয়ে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ইতোমধ্যে আমরা সাতশরও বেশি লোককে হাতেনাতে ধরেছি। যারা আগুন ধরাতে গিয়েছিল তাদের আমরা হাতেনাতে ধরেছি। এর মধ্যে যাদের সংশ্লিষ্টতা থাকবে না, তাদের থানা থেকেই ছেড়ে দেওয়া হবে। আমরা সিসি ক্যামেরার সাহায্য নিচ্ছি। জনগণও এ ধরনের দুষ্কৃতকারীদের ধরিয়ে দিচ্ছে। অনেক সময় পুলিশের নজর এড়িয়ে গেলেও জনগণ তাদের ধরে আমাদের সামনে আনছে। আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না।

আহত দ্ইু নেতা গয়েশ^রচন্দ্র রায় এবং আমান উল্লাহ আমান প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমান উল্লাহ আমান রাস্তায় পড়ে গিয়েছিলেন। পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে হৃদরোগ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। একইভাবে গয়েশ্বর রায়কেও হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদার অব হিউম্যানিটি। তিনি তাদের চিকিৎসা ঠিকমতো হচ্ছে কি না, সেই খোঁজখবর নিয়েছেন। আমরা তাদের অ্যারেস্ট করিনি, সুস্থ হওয়ার পর তারা বাড়িতে চলে গেছেন।

অগ্নিসন্ত্রাস প্রতিরোধ করব : কাদের

শনিবারের ঘটনা প্রসঙ্গে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘পরিষ্কার বলতে চাই, বিএনপির অগ্নিসন্ত্রাস আবার শুরু হয়ে গেছে। এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চুপ করে থাকতে পারেন না। আমাদের দায়িত্ব আমরা পালন করব। নির্বাচন পর্যন্ত মাঠে থাকব। অগ্নিসন্ত্রাস প্রতিরোধ করব।’

সরকার নাটকের প্লট তৈরি করে : ফখরুল

ওবায়দুল কাদেরের অভিযোগের বিপরীতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এটা তারা তাদের লোকজন দিয়ে করে। সরকারি লোকেরা, এজেন্সির লোকেরা, এমনকি আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা এই ঘটনাগুলো ঘটিয়ে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পুলিশের সাহায্যে ভিডিও করে তারা আবার মোটর সাইকেলে করে পুলিশের সামনে দিয়ে চলে যায়, অগ্নিদগ্ধ গাড়ির চালকও বলেছে। যারা প্রত্যক্ষদর্শী তারাও একই কথা বলেছে। এটা স্পষ্ট সরকারের পরিকল্পিত প্লট তৈরি করা, নাটক তৈরি করা পুরো বিষয়টি।’

‘শান্তিপ্রত্যাশীদের সোচ্চার হতে হবে’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিএনপির অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশ ও ক্ষমতাসীনদের ভূমিকায় মনে হচ্ছে বিরোধীদের কর্মসূচিতে সরকার শক্তি প্রয়োগের দিকে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে রাজনীতিতে আরও সংঘাত হবে। তাই সংঘাত পরিহার করতে আলাপ-আলোচনার বিকল্প নেই। আমরা যারা দেশে সংঘাত নয়, শান্তি চাই- তাদের এ বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে।