-মোঃ আতিকুর রহমান মুফতি
জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোন দেশের সরকারের জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সেই চ্যালেঞ্জকে আরো কঠিন করে তুলেছে। বিশ^বাজারে খাদ্য পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়া ও মূল্যবৃদ্ধির ফলে খাদ্যঘাটতির দেশগুলো বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তবে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে এই খাদ্যঘাটতির প্রভাব তেমন প্রকট নয়। এর পেছনে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের যুগোপযোগী কৃষিনীতি এবং দেশের পরিশ্রমী কৃষকদের অবদান রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র হিসাব অনুযায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষির অবদান ছিলো প্রায় ১১.৫০ শতাংশ। আবাদি জমি কমে যাওয়ার বিপরীতে বাড়তি জনসংখ্যার চাপ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং করোনা মহামারী সত্ত্বেও দেশে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। এ সময়ে বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ স্থান থেকে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে, ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি আরো সুদৃঢ় হয়েছে। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষি গবেষণার উন্নয়নে ভূমিকা রাখায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলকে ২০২১ সালে এবং বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটকে ২০২২ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়েছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লাভজনক কৃষি নিশ্চিত করতে না পারলে সময়ের সাথে কৃষক ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাবে, অনিশ্চিত হবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। এবিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখেই সরকার জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮, জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতি ২০২০, জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা ২০২০, দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি উন্নয়নে মহাপরিকল্পনাসহ ডেল্টা প্ল্যান, রূপকল্প ২০৪১ ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আলোকে কৃষিখাতে উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চলমান রেখেছে। ফসলের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে উন্নত ও প্রতিকূলতাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন এবং এর সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রণোদনা প্রদান, বিনামূল্যে ও ভর্তুকিমূল্যে সার ও উচ্চফলনশীল জাতের বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। সেই সাথে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, নতুন শস্যবিন্যাস উদ্ভাবন, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ, ট্রান্সজেনিক ফসল উৎপাদনের মতো কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দেশী ফলের উন্নত জাত সম্প্রসারণের পাশাপাশি লাভজনক হওয়ায় দেশে ত্বীন, ড্রাগন, এভ্যোকাডো, আরবী খেজুর, রামবুটান, পার্সিমনের মতো বিদেশী ফলের চাষাবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া পাহাড়ি এলাকায় কফি ও কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সমন্বিত হিসাব অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদন হয়েছে ৪৪৩.৫৬ লাখ মেট্রিক টন । এর মধ্যে আউশ ৩২.৮৫ লাখ মেট্রিক টন, আমন ১৪৪.৩৮ লাখ মেট্র্রিক টন, বোরো ১৯৮.৮৫ লাখ মেট্রিক টন এবং গম ১০.৮৫ লাখ মেট্রিক টন।
দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখা ও কৃষকের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকারিভাবে মোট খাদ্যশস্য সংগ্রহের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪.০৪ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে চাল ১৩.০৪ লাখ মেট্রিক টন এবং গম এক লাখ মেট্রিক টন। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে শুধু বোরো ও আমন ফসল থেকে ১৪.৫০ লাখ মেট্রিক টন চাল এবং প্রায় একলাখ তিন হাজার মেট্রিক টন গম সংগ্রহ করা হয়েছিল। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ২০২১-২২ অর্থবছরের ১৯.৬১ লাখ মেট্রিক টন ধান-চাল ও ৪.৪১ লাখ মেট্রিক টন গম সংগ্রহ করা হয়। এসময়ে সরকারের খাদ্যশস্য মজুতের পরিমান ছিলো ১৬.১২ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের সরকারি ব্যবস্থাপনায় খাদ্যশস্য মজুতের পরিমান দাঁড়ায় ১৯.৩২ লাখ মেট্রিক টন।
নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকার ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস), খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, এসেনসিয়াল প্রায়োরিটি (ইপি), আদারস প্রায়োরিটি (ওপি) এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির অংশ হিসেবে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), টেস্ট রিলিফ (টিআর), ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ), ভালনারেবল গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট (ভিজিডি), গ্রাটিসাস রিলিফ (জিআর) এর মাধ্যমে খাদ্যশস্য বিতরণ করে। ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকারিভাবে ২২.৮৯ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বিতরণ করা হয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে সরকারি খাদ্য গুদামসমূহের মোট ধারণক্ষমতা ছিলো ২১.৮৬ লাখ মেট্রিক টন যা বর্তমানে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য উন্নতমানের বীজ একটি মৌলিক কৃষি উপকরণ। মানসম্মত বীজ এককভাবে ফসলের উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে সক্ষম। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সারাদেশে ২৪টি দানা শস্যের বীজ উৎপাদন খামার, দুইটি পাট বীজ উৎপাদন খামার, দুইটি আলু বীজ উৎপাদন খামার, চারটি ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদন খামার, দুইটি সবজি বীজ উৎপাদন খামার এবং ৮৬টি চুক্তিবদ্ধ চাষি জোনের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এছাড়া এ সংস্থা নয়টি উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্র ও ১৪টি এগ্রোসার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে উৎপাদিত বিভিন্ন ফসলের চারা, কলম, গুটি ইত্যাদি উৎপাদন ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ৮৬টি চুক্তিবদ্ধ চাষি জোনের আওতায় ৯৮,৬৯৩ জন চাষির মাধ্যমে ২,১৬,৪৩৪ একর জমিতে বীজ উৎপাদনের কর্মযজ্ঞ চলমান রয়েছে। দেশে বীজের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে বিএডিসি ২০২১-২২ অর্থবছরে ১,৪৬,০০০ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করেছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের কৃষিতে মোট সার ব্যবহার হয়েছে ৫৬.৯১ লাখ মেট্রিক টন যার মধ্যে ইউরিয়া ২১.৫৮ লাখ মেট্রিক টন, টিএসপি ৩.৩০ লাখ মেট্রিক টন, এমওপি ৪.১৩ লাখ মেট্রিক টন, ডিএপি ৭.৫১ লাখ মেট্রিক টনসহ অন্যান্য সার। যার প্রায় পুরোটা সরকারি ব্যবস্থাপনায় ও ভর্তুকি মূল্যে কৃষকদের সরবরাহ করা হয়েছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে বিএডিসি’র মাধ্যমে ১৫টি সেচ প্রকল্প ও পাঁচটি সেচ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ সকল সেচ প্রকল্প ও কর্মসূচির মাধ্যমে ৭১২ কিলোমিটার খাল বা নালা পুনঃখনন, ৬৫০টি সেচ অবকাঠামো, দুইটি রাবার ড্যাম, ৮২০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ ও ভূপরিস্থ সেচনালা, ৩৫২টি শক্তিচালিত পাম্প, ৫০৫টি সেচযন্ত্রে বিদ্যুতায়ন, ১৬০টি সৌরশক্তিচালিত সেচপাম্প স্থাপন, ২০ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও ২০ হাজার মিটার ফিতা পাইপ কৃষকদের সরবরাহ করা হয়েছে। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ২০২১-২২ অর্থবছরের জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত আউশ, আমন ও রবি মৌসুমে ১৪,১২০টি গভীর নলকূপ এবং ৩৮৯টি এলএলপি ব্যবহার করে প্রায় ৩.৯০ লাখ হেক্টর জমিতে নিয়ন্ত্রিত সেচ প্রদান করেছে। ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৩,৪৪৩টি পুকুর, নয়টি দীঘি ও ২,০৯৩ কিলোমিটার খাস খাল/খাঁড়ি পুনঃখনন এবং উক্ত খালে ৭৪৯টি পানি সংরক্ষণ কাঠামো (ক্রসড্যাম) নির্মাণ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে প্রায় ৯৭,৭০০ হেক্টরেরও অধিক আয়তনের জমিতে সম্পূরক সেচ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে সেচের আওতাধীন মোট জমির পরিমাণ ছিল ৫৪.৯০ লাখ হেক্টর, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫৬.৫৪ লাখ হেক্টরে।
কৃষিকাজে কৃষকদের পুঁজির অভাব দূর করতে ২০২০-২১ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক, বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকসমূহের মাধ্যমে মোট ২৫,৫১১.৩৫ কোটি টাকা কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করা হয়। পরবর্তী অর্থবছরে বিতরণের পরিমাণ ২৮,৩৯১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।
করোনা মহামারির প্রভাব ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতে বিগত বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্য ও জ¦ালানির মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশে^ সম্ভাব্য যেকোন ধরণের খাদ্যসংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রতি ইঞ্চি আবাদযোগ্য জমিকে চাষের আওতায় আনার জন্য সবাইকে তাকিদ দিচ্ছেন। এরই প্রেক্ষাপটে কেবল খুলনা জেলায় ১০ হাজার ৯৭৫ হেক্টর অনাবাদি পতিত জমির ১৩ শতাংশকে নতুন করে চাষের আওতায় আনা হয়েছে। এ জেলায় বিগত বছরে ৭০ হাজারের বেশি কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও সার প্রদান করা হয়েছে। ফলে চলতি বোরো মৌসুমে খুলনায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। সরকারের এরূপ হাজারো কৃষিবান্ধব পরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি, নিশ্চিত হচ্ছে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা।
পিআইডি ফিচার/ লেখক- মোঃ আতিকুর রহমান মুফ্তি, সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।
সেল ফোন-০১৯৩৮৬৭৬৮২০











































