Home সম্পাদকীয় বিবস্ত্র করে ছাত্রী নির্যাতন: ক্যাম্পাসে প্রতিকার মেলে না

বিবস্ত্র করে ছাত্রী নির্যাতন: ক্যাম্পাসে প্রতিকার মেলে না

11

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন সারা দেশে অন্যায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। কিছু ক্ষেত্রে সর্বময় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে তাদের। সরকার ও প্রশাসনের সমান্তরালে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এসব সংগঠনের নেতাকর্মীরা। কিছু ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ। সেখানে অন্যরা তাদের অধীনে চলেন কিংবা চলতে বাধ্য হন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের কথা উল্লেখ করা যায়। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সংগঠনটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। এ সুযোগে দলটির কিছু সংখ্যক সদস্য যা খুশি তাই করছেন। তাদের বাধা দেয়ার কেউ নেই। এতে শিক্ষার্থীদের অধিকার, সম্মান, ইজ্জত ও জীবন শঙ্কার মধ্যে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রলীগের অনুগত থেকে কার্যক্রম চালানোর কারণে নির্যাতিত শিক্ষার্থীদের পক্ষে কোনো প্রতিকার করতে পারে না।
এ অবস্থায় জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় শিক্ষার্থীরা ভূমিকা রাখার বদলে তারা নিজেরাও অনেকটা বন্দী বা অবরুদ্ধ হয়ে আছেন। যারা সরকারি দল করেন কিংবা তাদের ছত্রছায়ায় থেকে অন্যায় অপকর্ম করছেন তাদের সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় নগণ্য। তবে সরকার তাদের সব অপরাধ সমর্থন দেয়ায় তারা সেটা অনায়াসে চালিয়ে যাচ্ছেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনায় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অসহায়ত্ব খোলাসা হয়েছে। ফুলপরী নামের নবাগত ওই ছাত্রীকে সাড়ে চার ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। এ সময় তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। এতেও ক্ষান্ত হননি নির্যাতনকারীরা। তারা তাকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করেন। ঘটনা জানালে হত্যার হুমকিও দেন ছাত্রলীগের পদধারী ওই নেত্রীরা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে যেসব বড় অপরাধ করেছে সে তুলনায় ফুলপরীর সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, তা বড় কোনো ঘটনা নয়। রাতভর পিটিয়ে হত্যা ছাড়াও একই ধরনের পৈশাচিক আনন্দ তারা করেছেন। ছাত্রীদের শ্লীলতাহানি, র্যাগিংয়ের নামে অপমান লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের বহু ঘটনা ঘটেছে। এসব অপরাধের মোটাদাগে কোনো বিচার হয়নি। বরং দেখা গেছে, ইডেন কলেজে যেসব ছাত্রী ছাত্রলীগ নেত্রীদের অপরাধের প্রতিবাদ করেছেন; তারা মামলার শিকার হয়েছেন। ছাত্রীদের দিয়ে জোরপূর্বক মনোরঞ্জন করানোর কাজ এক ছাত্রী সাহস করে ফাঁস করার পর তার ওপর নেমে আসে হয়রানি। এমনকি কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছে বলে ওই ছাত্রী অভিযোগ করেছিলেন। এ অবস্থায় ছাত্রলীগ সারা দেশে প্রায় প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেপরোয়াভাবে শিক্ষার্থী নির্যাতন করছে।
ফুলপরীর ঘটনায় প্রতিকার এসেছে তখনই, যখন উচ্চ আদালত আদেশ দেন। ওই আদেশ মেনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নির্যাতিতাকে নিরাপত্তা দিয়ে ক্যাম্পাসে এনেছে। অথচ গুরুতর ঘটনাটি ১২ ফেব্রুয়ারি ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের এক সহসভাপতি, ফুলপরীর বিরুদ্ধে তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব বা মান্য না করার অভিযোগ এনে বিবস্ত্র করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঠিকভাবে কাজ করলে সাথে সাথে এর প্রতিকার মিলত। হাউজ টিউটররা এজন্য দোষী ছাত্রলীগ নেত্রীর বিচার করতেন। এমনকি এ বিষয়ে হল প্রভোস্টের মাথা ঘামানোর দরকার হতো না। এখন বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর, ভিসি ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসককে।
ছাত্রলীগের এভাবে বেপরোয়া হওয়ার পেছনে নাগরিক সমাজও কম দায়ী নয়। ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের কথা বাদই দিলাম, অন্তত নারী নির্যাতনের ঘটনা যখন ঘটে; তখন নারী অধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন তারা এর প্রতিবাদ দূরের কথা, মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নারী অধিকার রক্ষাকারী, মানবাধিকার সংগঠন ও এনজিও নেতারা একেবারে চুপ। ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে লাশ ফেলে দিলেও মানবাধিকার সংগঠনও কোনো আওয়াজ করছে না। মিডিয়ার ভূমিকাও জোরালো নেই। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর আমরা দোষারোপ করি। কিন্তু নাগরিক সমাজ সময়মতো দায়িত্ব পালন না করায় বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে। এখন মশা মারতে কামান দাগাতে হচ্ছে। যে কাজটি হলের হাউজ টিউটরের; তা করতে উচ্চ আদালতের মাথা ঘামাতে হচ্ছে। দলীয় লোকজনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করতে গিয়ে দেশের পুরো প্রশাসন যে, প্রায় অকেজো হয়ে গেছে; সেটা এ ঘটনাগুলো তার প্রমাণ বহন করছে। ফুলপরীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করার বিষয়টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নিলে আমাদের মুক্তি মিলবে না।