Home আন্তর্জাতিক ৮-১০ মিটার উঁচু বরফ, পাথর, কাদার তোড়ে জনপদ ধ্বংস

৮-১০ মিটার উঁচু বরফ, পাথর, কাদার তোড়ে জনপদ ধ্বংস

2

অনলাইন ডেস্ক।।

আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল-চীনের তিব্বত সীমান্ত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ এ প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪০০-তে দাঁড়িয়েছে। গত বুধবার সকালের এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৩৫টি দেশের পর্যটক ও পুণ্যার্থী রয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে নেপালের পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপি ও রয়টার্সের খবর অনুসারে, কয়েক মিটার উঁচু কাদা-পাথরের তোড়ে নদীর দুই তীরের একাধিক গ্রাম সম্পূর্ণ মুছে গেছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং অনেক সেতু ভেসে গেছে। কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরের উদ্দেশে যাওয়া শত শত তীর্থযাত্রী ও পর্যটক এই আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের মুখে পড়েন। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৩৫টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টার, ড্রোন ও তল্লাশি কুকুর নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে নেপাল ও চীনের জরুরি উদ্ধারকারী দল।

নেপালের পুলিশ, জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুসারে, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯২-এ দাঁড়িয়েছে এবং মোট নিখোঁজের সংখ্যা পৌঁছেছে

১ হাজার ৪৬৮তে। এর মধ্যে নেপাল অংশে ৫১৭ জন বিদেশিসহ ৯১০ জন এবং তিব্বত অংশে ২৬০ জন বিদেশিসহ ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। যদিও চরম দুর্যোগে বিশৃঙ্খলা, মৃতদেহের পরিচয় শনাক্তকরণ জটিলতা ও দ্বৈত নাগরিকদের গণনার কারণে এই সংখ্যা ওঠানামা করছে বলে এএফপি জানিয়েছে।

নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, তাদের তালিকাভুক্ত ৬৬৭ জন নিখোঁজ দর্শনার্থীর মধ্যে ১২৭ জনই নেপালি পর্যটক। তবে কতজন স্থানীয় বাসিন্দা নিখোঁজ রয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে প্রায় ১০০ জন চীনা নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।

এ ছাড়া বিভিন্ন দেশ ও ট্যুরিজম বোর্ডের হিসাবে নিখোঁজদের মধ্যে ভারতের ১৭৮ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ জন, ইউক্রেনের ৫৫ জন, মালয়েশিয়ার ৫০ জনের বেশি, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ৩০ জন নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার ৯ জন জলবিদ্যুৎকর্মী, সিঙ্গাপুরের ৯ জন, জার্মানির ৮ জন ও রাশিয়ার ৮ জন এবং অন্যান্য দেশের একাধিক পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে উদ্ধারকর্মীরা গতকাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ডের নাগরিকসহ বেশ কয়েকজন বিদেশিকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন।

কাদা-পাথরের স্রোতে মুছে গেছে গ্রাম, তছনছ অবকাঠামো
ঝড়ের গতিতে নেমে আসা কাদা, পাথর ও বরফের মিশ্রণ সীমান্ত-সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকাকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস সংস্থার (আইএফআরসি) মুখপাত্র টমাসো দেল্লা লোঙ্গা জানান, নেপাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী ৮ থেকে ১০ মিটার উঁচু পানির ঢেউয়ে পুরো গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বেশ কিছু এলাকা এমনভাবে ধসে গেছে, যা দেখে মনে হয়, সেখানে কখনও কোনো জনবসতি ছিল না এবং প্রায় ১০ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে।

জরুরি উদ্ধার তৎপরতা সত্ত্বেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় প্রাণহানির প্রকৃত চিত্র পেতে সময় লাগছে। রাসুয়া জেলার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকে জানান, নদীর পাশের বসতিগুলো একেবারে ভেসে গেছে এবং তাঁর নিজের পরিবারের পাঁচজন সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন। পর্যটনকেন্দ্র ও সীমান্ত-সংলগ্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ, যানবাহনসহ পুরো এলাকা এখন কাদার স্তূপে পরিণত হয়েছে।
তিমুরে সীমান্ত চৌকি থেকে বেঁচে ফেরা নেপালি কাস্টমস এজেন্ট ওমকার যোশি বলেন, সব শেষ হয়ে গেছে। এলাকাটি এখন একটি বিশালাকার কবরস্থান। সেখানে শুধু রক্তে ভেজা বালি আর পাথর পড়ে আছে।
চীনা আধা-সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা লি কিপু বলেন, উজানে জমে থাকা হ্রদের অস্থিরতা এবং সরু পাহাড়ি রাস্তার কারণে উদ্ধারকাজ চরম ব্যাহত হচ্ছে।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, জীবিত উদ্ধার হওয়া অনেকের হাড় ভেঙে গেছে এবং ত্বক দগ্ধ হওয়ার মতো ক্ষত তৈরি হয়েছে।

স্বজনের খোঁজে সেনাবাহিনীর একটি আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন কয়েকজন। গতকাল বৃহস্পতিবার নুয়াকোটের বাত্তার বাজার এলাকায়- এএফপি
স্বজনের খোঁজে সেনাবাহিনীর একটি আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন কয়েকজন। গতকাল বৃহস্পতিবার নুয়াকোটের বাত্তার বাজার এলাকায়- এএফপি

ভোতে কোশি নদীর তীর খালি করার নির্দেশ
প্রথম দফা দুর্যোগের ক্ষত না শুকাতেই নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিব্বত সীমান্তে চোসেন নদী ও পুরেপু সাংপো নদীর সংযোগস্থলে বিশাল ধস নেমে একটি বিরাট কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়েছে। হ্রদটিতে এরই মধ্যে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমা হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনে আরও ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে গেলে নিম্নাঞ্চলে ভোতে কোশি নদীতে ফের ভয়ংকর হড়পা বান নামবে। এ কারণে রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার নদীতীরের বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ দুর্ঘটনাকবলিত অন্যতম প্রধান কেন্দ্র নুয়াকোট জেলার বিদুরসহ আশপাশ এলাকা পরিদর্শনে যান। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দ্রুত ত্রাণ দেওয়া এবং সেনাবাহিনীর উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং তিব্বতের জিরোং দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। সেখানে প্রায় ৮০০ উদ্ধারকর্মী, ড্রোন ও তল্লাশি কুকুর মোতায়েন করেছে বেইজিং।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘের জরুরি ত্রাণ তহবিল থেকে ২০ লাখ ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয়কে দুর্যোগ মোকাবিলায় ২৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি (প্রায় ১৬ কোটি ডলার) জরুরি সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর একজন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা পাঠানোর পাশাপাশি ৫ লাখ ডলার জরুরি সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া ভারত, বাংলাদেশ, কানাডা, শ্রীলঙ্কা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপান জরুরি অর্থ, খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা সামগ্রী পাঠিয়েছে।
এদিকে, ভোত কোশি নদীর বন্যায় ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনো দেশের উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে নেপাল সরকার। দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীই এই উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় সক্ষম।

কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল সরকার বিদেশি কোনো ফোর্সের বদলে একক ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক সহায়তা আহ্বান করছে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
নেপালে দুর্যোগ ও প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং গতকাল বৃহস্পতিবার জানায়, নেপালে ব্যাপক প্রাণহানি আর ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় গভীর শোক ও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এর আগে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ এবং দেশটির জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আন্তরিক সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এ ছাড়া এ ঘটনায় গভীর শোক-সমবেদনা জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত বুধবার রাতে দল দুটির পক্ষ থেকে পৃথকভাবে এই শোক ও সমবেদনা জানানো হয়।