অনলাইন ডেস্ক।।
নেপালের ত্রিশূলী নদীতে ভয়াবহ বন্যায় একটি পুরো জনপদ যেন মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বাড়িঘর, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা-সবই ভেসে গেছে পানির স্রোতে। শৈশবের সেই গ্রামটির এমন পরিণতি নিজের চোখে না দেখেও ভিডিও, ছবি আর একের পর এক ফোনকলের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করেছেন নেপালের সাংবাদিক অর্জুন পৌডেল।
বুধবার সকালে কাঠমান্ডুতে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে স্ত্রী ফোন করে তাকে জানান, ত্রিশূলী নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। সোল বাজার ও বেত্রাবতী এলাকার পরিস্থিতি ভয়াবহ। লোকজন রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে, আতঙ্কে ছোটাছুটি করছে। প্রথমে কথাটি বিশ্বাস করতে পারেননি অর্জুন। কারণ, সোল তার নিজের গ্রাম। নদীর তীর থেকে গ্রামটি প্রায় ১০০ মিটার উঁচুতে। তার ৪৪ বছরের জীবনে এমন কোনো বন্যা তিনি দেখেননি, যা ওই গ্রামে পৌঁছাতে পারে।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর খবরের ওয়েবসাইটে ত্রিশূলীতে ভয়াবহ বন্যার খবর দেখে তার উদ্বেগ বাড়ে। তিনি ফোন করেন সাংবাদিক বন্ধু নিরঞ্জনকে। তার পরিবারের সদস্যরাও সোল বাজারে থাকেন। নিরঞ্জন জানান, তিনি মা-বাবা, চাচা-চাচি-কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। কোনো ফোনই বাজছে না।
এরপর শুরু হয় একের পর এক ফোনকল। অবশেষে এক আত্মীয়ের বাড়িতে যোগাযোগ করা সম্ভব হলে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আসে ভয়াবহ খবর-‘গ্রামে আর কিছু নেই। বেশির ভাগ মানুষই চলে গেছে।’
এরপর একে একে পরিচিতদের কাছ থেকে ভিডিও ও ছবি আসতে থাকে। সেই ছবিতে দেখা যায়, বেত্রাবতী বাজারের বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।
অর্জুনের পরিবারের সদস্যরাও এই দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাননি। তার বড় ফুফু, তার ছেলে মধু ও তার স্ত্রী পানিতে ভেসে যান। আরেক ফুফুও মারা যান। তার নাতি সিজান ও সিজানের স্ত্রীও একই স্রোতে নিখোঁজ হন। সিজানের ছেলে ও পুত্রবধূরও কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তার মামা সেদিন সকালে গবাদিপশুর জন্য ঘাস কাটতে বেরিয়েছিলেন। আর ফেরেননি।
স্থানীয় ওয়ার্ড চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপালের সঙ্গেও কথা বলেন অর্জুন। তিনি জানান, সকালে পৌরসভা কার্যালয়ে এসে আটকা পড়েছেন। গ্রামে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। কেউ কেউ পাহাড়ের খাড়া ঢালে উঠে কোনোভাবে প্রাণে বেঁচেছেন।
স্থানীয় একটি স্কুলের এক শিক্ষক ফোনে জানান, তিনি নিজেই তার পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পাচ্ছেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বেত্রাবতীর প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। স্কুলের একটি ভ্যানও পানিতে ভেসে গেছে। আশপাশে আহত মানুষ পড়ে আছেন-কারও পা ভেঙেছে, কারও চোখে গুরুতর আঘাত লেগেছে। দ্রুত হেলিকপ্টার পাঠিয়ে তাদের উদ্ধারের অনুরোধ করেন তিনি।
এদিকে অর্জুনের বন্ধু নিরঞ্জনের পরিবারের সদস্যদেরও কেউ বাঁচেননি। তার বাবা-মা, চাচা-চাচি ও ছোট বোন হিমানিকে পানির স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে নিরঞ্জনের চাচা ফোন করে অর্জুনকে বলেন, ‘আমরা শেষ।’ এরপর ফোনটি কেটে দেন তিনি।
বেত্রাবতী শুধু একটি বাজার নয়, ঐতিহাসিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। নেপাল ও তিব্বতের মধ্যে যুদ্ধের পর এখানেই শান্তিচুক্তি হয়েছিল। উত্তর গঙ্গা ধামও এই এলাকায় অবস্থিত, যেখানে প্রতিবছর হাজারো মানুষ পূর্বপুরুষদের স্মরণে যান। বন্যায় এসব স্থাপনারও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
বন্যার পানিতে সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ায় পুরো এলাকাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের হেডগেট ও পরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে পুরো জেলা অন্ধকারে রয়েছে। এমনকি ২০১০-১১ সালে নেপালে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ-সংকটের সময়ও তাদের গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়নি বলে স্মরণ করেন অর্জুন।
বন্যায় ত্রিশূলী নদীর ওপর পুরোনো ও নতুন-দুই সেতুই ধ্বংস হয়েছে। ভেঙে গেছে ভৈঁসে সেতুসহ একাধিক ঝুলন্ত সেতু। ফলে জেলা সদর বিদুরের সঙ্গে অনেক এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ভৈরামকোট, সামারি, টোকসার, দেওরালি, কিসপাং, কাউলে, ভালছে, সালমেসহ বহু গ্রাম কার্যত বিচ্ছিন্ন। পাশের ধাদিং জেলার থারপুও যোগাযোগের বাইরে চলে গেছে। পুরো রাস্তা যোগাযোগব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে রাসুয়া জেলা।
হাসপাতালে যাওয়ার পথও বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, এখন কেউ অসুস্থ হলে তাকে হয়তো বাড়িতেই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কারণ হাসপাতালে নেওয়ার মতো রাস্তা নেই, সেতু নেই, যানবাহন চলাচলেরও সুযোগ নেই। এমনকি অনেক এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় লবণও পাওয়া যাচ্ছে না।
বন্যায় শুধু ঘরবাড়ি নয়, মানুষের খাবারের জোগানও নষ্ট হয়েছে। কৃষিজমি ভেসে গেছে। ঘরে থাকা শস্যও কাজে লাগানো যাচ্ছে না, কারণ শস্য ভাঙানোর মিলগুলোও ধ্বংস হয়ে গেছে।
অর্জুন প্রায় দেড় দিন ধরে নিজের গ্রামে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু জেলা সদর বিদুরেই আটকে আছেন। গ্রামে যাওয়ার কোনো পথ নেই।
শৈশবের সবুজ সেই গ্রাম কয়েক মিনিটের বন্যায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এখন তার মনে একটাই প্রশ্ন-আবার কবে তার গ্রাম আগের মতো হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কারও জানা নেই। গ্রামের প্রবীণরাও বারবার একই প্রশ্ন করছেন-এই জায়গা কি কখনো আবার আগের মতো হয়ে উঠবে?









































