কয়রা প্রতিনিধি।।
ঈদগাহ মাঠে অনেক মানুষের ভিড়। দলে দলে ভাগ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সবাই। তাদের কারও হাতে ব্যাগ, কারও হাতে ফাইল। তাদের দলে আছেন আইনজীবী ও এলাকার রাজনৈতিক নেতারাও। মাঠের পাশে চায়ের দোকানের সামনে চেয়ার, টেবিল ও বেঞ্চে বসে দুই পক্ষের বিরোধ মেটাতে চেষ্টা করছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। গত ২২ আগস্ট (শনিবার) খুলনার কয়রা উপজেলা সদরে দেখা যায় এই দৃশ্য। ঈদগাহ মাঠের উল্টো দিকেই কয়রা সদর থানার প্রধান ফটক।
থানার প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকে ডান পাশে তাকালেই গোলঘর। সেই গোলঘর ও সামনের মাঠেও একই দৃশ্য। ভাগ হয়ে বসে সালিশ করছেন পুলিশের কর্মকর্তারা। দুই পক্ষের আইনজীবীর মাধ্যমে ‘শুনানি’ চলছে সেখানে। থানার ভেতর অফিস কক্ষেও দেখা যায় এমন সালিশ। সেখানেও মানুষের ভিড়ে তীব্র হই-হট্টগোল। একটা ঘটনার সালিশ শেষ হতে না হতেই আরেকটি নিয়ে বসছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
প্রায় প্রতিদিনই এভাবে সালিশের জন্য কয়রা থানায় আসছেন মানুষ। সালিশের কোনোটিতে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আবার কোনোটির পরবর্তী দিন জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সালিশে একেকটি পক্ষে আইনজীবী, গণ্যমান্য ব্যক্তি, স্থানীয় সার্ভেয়ারসহ ১০-১২ জন করে লোক। তারা নিজ নিজ পক্ষের যুক্তি-কথা তুলে ধরেন। দুই পক্ষের শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন বিচারকের ভূমিকায় থাকা পুলিশ কর্মকর্তা।
কয়রার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের অভিযোগ, পুলিশ অপরাধী ধরতে বা অপরাধ দমনে তেমন তৎপর নয়। তাদের তৎপরতা বেশি সালিশ-বৈঠকে। এলাকায় ইয়াবা ও অনলাইন জুয়া মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া চেতনানাশক ব্যবহার করে চুরির ঘটনায়ও উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি কালনা বাজারের ব্যবসায়ী আনিছুর রহমানের বাড়িতে সিঁদ কেটে সাড়ে ৩ লাখ টাকা চুরি হয়ে গেছে। তাঁর ভাষ্য, থানায় অভিযোগ করেও প্রতিকার মেলেনি।
গত ১৮ আগস্ট উপজেলার উলা গ্রামে মাছের ঘের দখল নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষ হয়। বিষয়টি জানিয়ে থানায় বারবার কল করা হলেও ঘটনাস্থলে যায়নি পুলিশ। পরে জরুরি সেবা নম্বরে (৯৯৯) কল করা হলে পুলিশ সেখানে যায়। ততক্ষণে সেখানে ৭ জন গুরুতর আহত হন। ১৯ আগস্ট আহতদের পক্ষে মামলা করেন রবিউল ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।
গত ১৫ মার্চ ১৫ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে বাড়ির সামনে থেকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় মামলা করেন স্বজনরা। ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও তাকে উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এ ছাড়া চলতি বছরে দুটি হত্যাকাণ্ড হয়েছে কয়রায়। এর মধ্যে শিমলারাইট গ্রামের এছার আলী হত্যাকাণ্ডের মামলায় এক আসামি কারাগারে। তবে ওষুধ ব্যবসায়ী ভবতোষ মৃধা হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনও উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।
২২ আগস্ট জমিসংক্রান্ত বিরোধের সালিশে এসেছিলেন পল্লীমঙ্গল গ্রামের বৃদ্ধ সবেদ আলী। তিনি জানান, এ নিয়ে এক মাসে চারবার থানায় আসতে হয়েছে তাঁকে। প্রতি দফায় তাঁর খরচ গেছে ৫-৬ হাজার টাকা। কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না।
একই দিন জমি নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধের সালিশে এসেছিলেন শিরিনা খাতুন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অসুস্থ বাবা। শিরিনার অভিযোগ, প্রতিপক্ষ প্রভাব খাটিয়ে সালিশে তাদের ঠকিয়েছেন।
একটি সালিশে অংশ নেওয়া আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, লোকজন ডাকে, তাই আসতে হয়। তবে এসব সালিশে লিখিত কোনো রায় দেওয়া হয় না। দুই পক্ষের দুজন আইনজীবীর মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তবে এসব সালিশের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়রা থানায় দিনে গড়ে ৭টি সালিশ করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। শুক্র ও শনিবার সালিশ হয় বেশি। এসব সালিশে আসা লোকজনের দেওয়া তথ্যমতে, বাড়ি থেকে যাতায়াত, আইনজীবী ও অন্যান্য খরচসহ প্রতিটি সালিশে ৫-৭ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে খরচ বেড়ে ১০-১৫ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। একাধিকবার আসতে হলে খরচ হারে বাড়ে।
পুলিশ সালিশে ব্যস্ত থাকায় এলাকায় অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক আইন সহায়তা কেন্দ্রের (আসক) জ্যেষ্ঠ সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু বকর সিদ্দিক। তিনি বলেন, বর্তমানে মাদক ও চুরির ঘটনা বেড়েছে। নারী ও শিশু অপহরণের ঘটনাও ঘটছে। এসব বিষয়ে পুলিশের আগ্রহ নেই। অনেক আসামি পুলিশের সামনে ঘুরে বেড়ালেও আটক করা হয় না।
কয়রা থানার ওসি রাশেদুল আলমের ভাষ্য, পুলিশ অপরাধ দমনে সবসময়ই তৎপর। তবে এই এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধ বেশি। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে দুই পক্ষকে ডেকে নিয়ে বসতে হয়। সেখানে দুই পক্ষের আইনজীবীরা থাকেন, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা থাকেন। তাদের মতামত নিয়ে সালিশে সমাধান করা হয়। তবে এটা যে পুলিশের কাজ নয়, তা স্বীকার করেন তিনি। পাশাপাশি দাবি করেন, অপরাধ দমনে পুলিশকে কিছুটা কৌশলী হতে হয়। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে দুই পক্ষকে ডেকে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। এতে সমস্যা হলে সালিশি বৈঠক বন্ধ করে দেওয়া হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলা শাখার সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কুদরত ই খুদা বলেন, পুলিশের মূল দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, অপরাধ প্রতিরোধ করা, অপরাধী ধরা ও অপরাধের তদন্ত করা। মানুষ পুলিশকে ভয় পায়। এ কারণে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ বা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে পুলিশের কাছে যায়। পুলিশের মধ্য থেকে ভয়ের সংস্কৃতি দূর করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, এসব সালিশ বৈঠককে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির দালালচক্র গড়ে ওঠে। তারা থানায় আসা লোকজনকে ভুল বুঝিয়ে বা ভয় দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়।
খুলনা জেলা জজ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোমরেজুল ইসলাম গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, জমি নিয়ে বিরোধ বা টাকাপয়সা নিয়ে লেনদেনের সালিশের এখতিয়ার পুলিশের নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার করে উভয় পক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। জমির বিবাদ আদালতের বিষয়। এ নিয়ে সালিশ-বিচার পুলিশের কাজ নয়।








































