Home আঞ্চলিক বিক্রি হয়ে গেল সুন্দরবনের শতবর্ষী স্মৃতিবিজড়িত লঞ্চ ‘বনরানী’ ও ‘বনকন্যা’

বিক্রি হয়ে গেল সুন্দরবনের শতবর্ষী স্মৃতিবিজড়িত লঞ্চ ‘বনরানী’ ও ‘বনকন্যা’

3

শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি।।

সুন্দরবনে এক শতকেরও বেশি সময় ধরে দাপিয়ে বেড়ানো ঐতিহাসিক ও বিলাসবহুল দুটি রাজকীয় লঞ্চ ‘এমএল বনরানী’ ও ‘এমএল বনকন্যা’ নিলামে বিক্রি করে দিয়েছে বন বিভাগ। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে অচল ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পর অবশেষে টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করে দেওয়া হলো প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ববাহী জলযান দুটি।

নিলামে বিক্রির বিস্তারিত:

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সরকারি প্রক্রিয়া মেনে টেন্ডার ডাকের মাধ্যমে ১১২ বছর বয়সী ‘এমএল বনকন্যা’ বিক্রি করা হয় ২০ লাখ ২৭ হাজার টাকায় (গত ১১ মে)। অন্যদিকে ১১৮ বছর বয়সী ‘এমএল বনরানী’ বিক্রি হয়েছে ২৬ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ টাকায় (গত ৩০ মার্চ)।

ইতিহাস ও রাজকীয় স্মৃতি:

জলযান দুটির লগবই সূত্র অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে বৃহত্তর সুন্দরবনে বন কর্মকর্তাদের যাতায়াত ও তদারকির সুবিধার্থে কলকাতার ঐতিহাসিক খিদিরপুর ডকইয়ার্ডে জাহাজ দুটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

এমএল বনকন্যা: ১৯০২ সালে তৎকালীন ৩৮ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়।

এমএল বনরানী: ১৯০৮ সালে ৫২ হাজার ৯৪৭ টাকা ব্যয়ে স্টিম ইঞ্জিন দিয়ে তৈরি করা হয়, যার তৎকালীন নাম ছিল ‘হেরিয়ার’। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এর নাম রাখা হয় ‘এমএল বনরানী’।

পরবর্তীতে ২০০১ সালে সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম দুটি বিভাগে বিভক্ত হলে বনরানী পশ্চিম বিভাগে এবং বনকন্যা পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের প্রশাসনিক অধীনে চলে যায়। বার্মিজ সেগুন কাঠের দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যময় এই লঞ্চ দুটিতে ভ্রমণ করেছেন আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটেনের রাজকুমারসহ দেশ-বিদেশের অনেক রাষ্ট্রদূত ও রাজকীয় ব্যক্তিত্ব।

অনাদর আর অবহেলায় অবসান: বনরানীর সর্বশেষ চালক জাফর মাস্টার ও সাবেক লস্কর মো. হারুন মোল্লা জানান, ২০১৬ সালে শেষবারের মতো বনরানীকে চালানো হয়েছিল। এরপর থেকে কোনো মেরামত বা পরিচর্যা না করায় খুলনা চানমারি ঘাট এলাকায় এগুলো দীর্ঘদিন অযত্নে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে খুলনা শিপইয়ার্ডের মাধ্যমে জাহাজ দুটি পুনর্নির্মাণ ও সচল করার জন্য প্রায় সাত কোটি টাকার একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

স্মৃতি রক্ষায় রেপ্লিকা তৈরির পরিকল্পনা: ঐতিহাসিক দুটি স্মারক হাতছাড়া হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, “বনরানী ও বনকন্যার অসাধারণ একটি ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য রয়েছে। নতুন প্রজন্মকে এই শতবর্ষী ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে এদের দুটি হুবহু রেপ্লিকা তৈরির পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।”