Home আঞ্চলিক সুরক্ষিত ল্যাবের যন্ত্র চুরি, চোরের অনুকূলে মামলা

সুরক্ষিত ল্যাবের যন্ত্র চুরি, চোরের অনুকূলে মামলা

12

বাগেরহাট প্রতিনিধি।।

বাগেরহাটের রামপালে অবস্থিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র যেন ‘চোরের জন্য ভাঙা বেড়ার ঘর’। এখানে কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যতটা সহজ, তার চেয়েও সহজ যে কোনো সরঞ্জাম, উপকরণ, যন্ত্র প্রভৃতি চুরি করা। কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায়ই খোয়া যায় কিছু না কিছু। গত ১৫ মাসে র‌্যাব ও আনসারের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে ৫৩ চোর। উদ্ধার হয়েছে অন্তত ১ কোটি টাকা মূল্যের মালপত্র। সম্প্রতি ফের চুরি হয়েছে এখানে। এবার যেনতেন জিনিস নয়, খোদ কয়লা পরীক্ষার যন্ত্রই খোয়া গেছে। এটি ছাড়া যাচাই করা যাবে না আমদানি করা কয়লার মান। সেই যন্ত্র উদ্ধারে মামলাও হয়েছে। তবে আইনি এই প্রক্রিয়ায় আসলে চোরকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে সংশ্নিষ্টরা মনে করেন।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুরক্ষায় পুলিশ, আনসার ও নিরাপত্তারক্ষীসহ ২৯৩ জন দায়িত্ব পালন করেন। এর বাইরেও বিভিন্ন কক্ষে একাধিক কর্মকর্তা থাকেন। এখানকার অন্যতম সুরক্ষিত পরীক্ষাগারগুলো। এমনই একটি ঘর কয়লা টেস্টিং ল্যাব-২। গত ১৪ জানুয়ারি এখান থেকে খোয়া যায় ৪৭ লাখ টাকা মূল্যের যন্ত্রটি। অথচ বিষয়টি যখন আঁচ করা যায়, তখন কক্ষটি তালাবদ্ধ ছিল। দরজার সামনে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করেন। সেই যন্ত্র উদ্ধারে পরদিন রামপাল থানায় মামলা করেন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও নিরাপত্তা) মো. অলিউল্লাহ। এতে কাউকে আসামি করা হয়নি। নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সরাসরি দায়ী করার সুযোগ থাকলেও অভিযুক্তদের অজ্ঞাত লেখা হয়েছে। এমনকি মামলার অনেক তথ্যেও গরমিল আছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলেন, যন্ত্রটি চুরি যাওয়ার সম্ভাব্য সময়ে ওই ল্যাবের সামনে এক ভারতীয় নাগরিকের প্রাইভেটকার দাঁড়ানো ছিল। মামলা হওয়ার আগে গাড়িটি বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশ ত্যাগ করে। এ ছাড়া দু’জন ব্যক্তির সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে ছিল ল্যাবটি। তাঁদেরও দায়ী করা যেত। কিন্তু রহস্যজনক কারণে মামলায় কাউকে বিবাদী করা হয়নি। মূলত অভিযুক্তদের বাঁচাতেই এই অপকৌশল নেওয়া হয়েছে। এমনকি দায়িত্বে অবহেলার জন্যও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যাচাই করা হয়নি সিসি ক্যামেরার ফুটেজও। এ জন্য ঘটনার ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও যন্ত্রটি উদ্ধার হয়নি।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ১৪ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টায় কেন্দ্রের জুনিয়র সহকারী ম্যানেজার কেমিস্ট আবদুল মালেক ল্যাব বন্ধ করার সময় টেস্টিং যন্ত্রটি টেবিলের ওপরে ছিল। তিনি চলে যাওয়ার আগে তালার চাবি ল্যাব-১-এর মুসা পারভেজকে দিয়ে ল্যাব টেকনিশিয়ান সাদ্দাম হোসেন ও তানভীর রহমানকে হস্তান্তর করতে বলেন। মুসা তাঁদের চাবি দেন। রাত ১০টায় সে স্থানে ডিউটিতে আসেন জাকারিয়া আল রাজী এবং মাসুম বিল্লাহ। তাঁরা পরদিন সকাল ৭টায় ডিউটি শেষ করেন। এ সময় সাদ্দাম হোসেন এবং মাসুম বিল্লাহ দায়িত্ব নেন। সকাল ৯টার দিকে রুম ক্লিনার আবদুল নোমান ল্যাব-২ পরিস্কার করতে গিয়ে টেবিলে যন্ত্রটি দেখতে না পেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান।

রামপাল থানার ওসি মোহাম্মদ শামসুদ্দিন বলেন, যন্ত্র চুরির ঘটনায় তদন্ত চলছে। সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এর বেশি প্রকাশ করা যাচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, যন্ত্র চুরির ঘটনায় অভ্যন্তরীণ কেউ জড়িত আছেন। ল্যাব এলাকায় সার্বক্ষণিক লোক থাকা সত্ত্বেও মামলায় কারও নাম না দেওয়ার বিষয়টিও সন্দেহজনক। অভিযুক্তদের বাঁচাতেই নামকাওয়াস্তে একটি মামলা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও নিরাপত্তা) অলিউল্লাহর মুঠোফোনে কল করলে তিনি চুরি ও এজাহারে তথ্যের গরমিলের বিষয়ে কিছু জানেন না বলেই ফোন কেটে দেন। এর পর আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।