Home জাতীয় অর্থনীতির সংকট কাটার আভাস, মূল্যস্ফীতির চাপ থাকছেই

অর্থনীতির সংকট কাটার আভাস, মূল্যস্ফীতির চাপ থাকছেই

9

ঢাকা অফিস||
দেশের অর্থনীতির চলমান সংকট কাটার আভাস মিলছে। আগামী দুয়েক মাসের মধ্যে অর্থনীতি তুলনামূলক কিছুটা স্বস্তির জায়গায় যেতে পারে। আর ডিসেম্বরের মধ্যে অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতার দেখাও মিলতে পারে। তবে সাধারণ মানুষ অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির যে চাপে রয়েছে তা সহজেই কাটছে না। আর স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির যে সংকট, সেখানে কিছুটা স্বস্তি মিললেও দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার। দেশের কয়েকজন শীর্ষ অর্থনীতিবিদের সঙ্গে কথা বলে এমন আভাস পাওয়া গেছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানিসহ খাদ্যপণ্যের দাম যে উঠতির দিকে ছিল তা এখন কিছুটা নিম্নমুখী। এটা স্বস্তির কারণ। দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো। বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তার কারণে আমদানি ব্যয়ে চাপ কমেছে। আমদানি ব্যয়ের যে চাপ ছিল সেটাও এখন কিছুটা স্বস্তির জায়গায়। রিজার্ভের ওপর চাপ কমতির দিকে আছে। রিজার্ভ এখন কিছুটা হলেও বাড়তে শুরু করেছে।’

তিনি বলেন, ‘অভ্যন্তরীণভাবে মূল্যস্ফীতির যে চাপ আছে তা একেবারে কমবে না। কারণ আন্তর্জাতিক কারণে দেশে কোনো একটি পণ্যের দাম বাড়লে দেশে সহজে তা কমে না। মুদ্রার বিনিময় হারও আর কমবে বলে মনে হয় না। তবে সরকার স্বল্পমেয়াদী যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা কাজে লাগতে শুরু করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব একটি মন্দার দিকে যাচ্ছে। মন্দা হলেও দেশের রেমিট্যান্সে প্রভাব পড়বে না। তবে তা রফতানির ওপর কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম আরও কমতে পারে। এতে বাংলাদেশ উপকৃতই হবে। সবমিলিয়ে মনে হচ্ছে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা দেবে। তবে এর মানে এই নয় যে, মানুষ খুব স্বস্তিতে থাকবে।’

মন্তব্য জানতে চাইলে এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ হয়তো সামনের মাসগুলোতে কমবে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম কমতে শুরু করেছে। তার প্রভাব হয়তো আমরা পাব। তবে একটু সময় লাগবে। দেশে আমদানি ব্যয় কমেছে। ডলারের দাম আরও কিছুটা হয়তো কমবে। সামনে ডলারের উপরও চাপ কমবে। রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো আছে। সামনের দিনে রফতানির উপর আর একটু জোর দিতে হবে। সব মিলিয়ে আমি মনে করি আগামী দুয়েকে মাসের মধ্যে তুলনামূলক কিছুটা স্বস্তির জায়গায় আমরা যেতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি আন্দাজ করা কঠিন। সবমিলিয়ে বিশ্ব পরিস্থিতি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। বৈদেশিক বাণিজ্য ভারসাম্যে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, সেই চাপ কিছুটা হলেও কমে আসবে। দেশে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেখা দেবে। তবে আমাদের নীতি নির্ধারণ এবং প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত।’

সংকট কাটিয়ে উঠতে দেশের অর্থনীতিতে বেশ কিছু ইতিবাচক দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে উল্লেখ করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘সংকট নিরসনের বিষয়টি নির্ভর করছে বহির্বিশ্বে পরিস্থতিটা কী দাঁড়ায় তার উপর। ইউক্রেন থেকে গম রফতানি শুরু হয়েছে, বিষয়টি ইতিবাচক। দেশের বাজারে চালের দাম এখনো কমেনি, বিষয়টি নেতিবাচক। সামনের দিনে আমাদের রফতানি প্রবৃদ্ধি কীরকম হবে, তার উপরও সংকটের বিষয়টি নির্ভর করছে।’
এই অর্থনীবিদ আরও বলেন, ‘আমাদের পোশাক রফতানির প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য— সেখানে কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে পোশাকের চাহিদা কমবে। সবমিলিয়ে কিছু ইতিবাচক দিক যেমন আছে, তেমনি নেতিবাচক দিকও আছে। তাই এখনই বলা যাবে না এই সংকট কবে শেষ হবে। সংকটের বিষয়টি মাথায় রেখেই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।’

এদিকে, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ও অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘চলমান এই সংকটটি কাটিয়ে ওঠার বিষয়টি নির্ভর করছে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও বিশ্ব অর্থনীতির উপর। আমার কাছে মনে হয় না এই সংকট দ্রুত নিরসন হবে। আগামী দুয়েক বছরের মধ্যে শেষ হবে বলে আমার মনে হয় না।’
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির সংকট কিছুটা হলেও কাটতে শুরু করেছে। এর কারণ হিসেবে রেমিট্যান্স প্রবাহ ঠিক থাকা, আমদানি ব্যয় কমা, বিশ্ববাজারে জ্বালানিতেলসহ খাদ্যপণ্যের দাম কমাকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন তারা। রফতানি আয় এখন বাড়তে থাকলেও ভবিষ্যতে তা অব্যাহত থাকা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দেশের নিটওয়্যার মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহ-সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘তুলনামূলকভাবে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে পোশাক রফতানি কমার শঙ্কা রয়েছে। অক্টোবর থেকে রফতানির ট্রেন্ড ভালো থাকবে। গেল কয়েক মাস ধরেই পোশাকের ক্রয়াদেশ কমছিল, তার প্রভাব রফিতানিতে দেখা যাবে। তবে গত বছর জুলাই ও আগস্টে রফতানি কম ছিল। সে কারণে রফতানি প্রবৃদ্ধিতে হয়তো নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাবে না। তবে চলতি বছর প্রতি মাসে যে পরিমাণ আয় হয়েছে, তার সঙ্গে তুলনা করলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে রফতানি আয় কম হবে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে দেশের পোশাক রফতানি সামনের দিনে আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ আমেরিকার ক্রেতারা চীনের প্রতি অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। যেসব দেশ প্রাথমিক উপকরণ চীন থেকে সংগ্রহ করে তাদের প্রতিও অনাগ্রহ রয়েছে আমেরিকার। সেদিক থেকে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘চট করেই সহজে যেমন সংকট কেটে যাবে না, তেমনি বাংলাদেশ তেমন কোনো গভীর সংকটে পড়েনি। বাংলাদেশের অর্থনীতি শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বড় অর্থনীতি। সরকার যদি সক্রিয় কার্যক্রম গ্রহণ করে, সঠিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সংকট দ্রুত কেটে উঠবে। কিন্তু সংকটের অনেক বিষয়ই বহির্বিশ্বের অর্থনীতির ওপর নির্ভর করছে। তাই এই বছরই সংকট কেটে যাবে তা নিশ্চিত বলা যায় না।’