স্টাফ রিপোর্টার।।
বাবা ছিলেন কখনো সিনেমা হলের টিকিট ব্ল্যাকার, কখনো লাইটম্যান-সেই সাধারণ অবস্থান থেকে হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে চোরাচালান ও তেলের চুরির সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি। খুলনা বিভাগীয় ‘বাংলাদেশ ট্যাংক লরী ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সাধারণ সম্পাদক পদে বসে নানা অপকর্ম ও স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে যাচ্ছেন বিতর্কিত নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নেতা সুলতান মাহমুদ পিন্টু। শেখ পরিবারের আশীর্বাদে বিনা ভোটে দখল করা মেয়াদউত্তীর্ণ কমিটিকে ঢাল বানিয়ে পুরো খুলনা বিভাগসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের স্পর্শকাতর জ্বালানি খাতকে রীতিমতো জিম্মি করে রেখেছেন এই বিতর্কিত নেতা।

টিকিটম্যান থেকে তেলের চোরাচালান ও সন্ত্রাসের রাজত্ব: স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পিন্টুর বাবা একসময় নগরীর লিবার্টি সিনেমা হলে টিকিট বিক্রি ও লাইটম্যান হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তীতে তেলের চোরাই কারবারে যুক্ত হয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি। বাবার পথ ধরেই পিন্টুও নেমে পড়েন অবৈধ তেলের চোরাচালানে। ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সাবেক শেখ পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য শেখ সোহেলের রাজনৈতিক আশ্রয়ে খুলনাজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। বহিরাগত সশস্ত্র ক্যাডারদের সঙ্গে নিয়ে মহড়া দেওয়া পিন্টুর নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়।
বিগত ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে দেশীয় অস্ত্র ও লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পিন্টু ও তার ক্যাডার বাহিনী সরাসরি হামলা চালিয়ে বিএনপি কার্যালয় এবং স্থানীয় নেতাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর চালায়। ডিবি পুলিশকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা ও গ্রেপ্তার করানোর অগণিত অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিএনপি নেতা রিয়াজ সাহেদকে হত্যাচেষ্টা মামলাসহ একাধিক গুরুত্বর মামলার আসামি এই পিন্টু।

তেল চুরি, কৃত্রিম সংকট ও কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ: ট্যাংক লরী ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পদ ব্যবহার করে যমুনা ও মেঘনা ডিপোর কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ডিপো থেকে নিয়মিত কোটি কোটি টাকার তেল চুরির সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন পিন্টু। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অবৈধ উপায়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। এই অবৈধ উপার্জনের টাকায় সম্প্রতি তিনি প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল ‘প্যারাডো’ গাড়ি ক্রয় করেছেন। একাধিক মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের এই দোসর খুলনায় প্রকাশ্যে দাপটের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, যা নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ।
ভুয়া সভার নাটক ও ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ডিপো অচলের হুমকি: অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪-২০২৫ মেয়াদের অ্যাসোসিয়েশনের কমিটি গঠনে কোনো নির্বাচন কমিশন বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা করা হয়নি। একটি মনগড়া ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ দেখিয়ে সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল কবির কাবুলকে সাথে নিয়ে পুরো সংস্থাকে কুক্ষিগত করেন পিন্টু। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে মেয়াদ পার হলেও অবৈধভাবে পদ আঁকড়ে রয়েছেন তারা।
সম্প্রতি পিন্টু ও তার সিন্ডিকেটের অসাধু সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় যমুনা অয়েল কোম্পানির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তারা চক্রান্তে মেতে ওঠে। তাকে সরানোর দাবিতে গত ২ সেপ্টেম্বর টানা ৬ ঘণ্টা তেল উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়। এমনকি আগামী ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ওই সৎ কর্মকর্তাকে অপসারণ না করা হলে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে যমুনা দৌলতপুর ডিপো থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য জ্বালানি তেল উত্তোলন বন্ধের চরম হুমকি দিয়ে নোটিশ জারি করা হয়েছে।
ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের তীব্র ক্ষোভ এবং গ্রেপ্তারের দাবি: জ্বালানি ব্যবসায়ী ও ট্যাংক লড়ি ইউনিয়নের নেতা শহিদ, শেখ ইফতিয়ার ও ফয়সাল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পিন্টুর ব্যক্তিগত অসাধু স্বার্থ চরিতার্থ করতে ঘন ঘন ধর্মঘট ডাকার কারণে সাধারণ শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। গত ৫ আগস্টের পর দেশের সর্বত্র ফ্যাসিবাদের দোসরদের হঠানো হলেও পিন্টু সিন্ডিকেটের কারণে ট্যাংক লরী ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনে এখনো কোনো পরিবর্তন আসেনি। এ বিষয়ে সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল কবির কাবুলের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে সমঝোতার অজুহাত দেন।

এ ব্যাপারে সুলতান মহামুদ পিন্টুর সাখে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
খুলনার সচেতন মহল ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের দাবি, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি খাতের মতো সংবেদনশীল জায়গায় নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী পিন্টু ও তার সহযোগীদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে কঠোর আইনি আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি মেয়াদউত্তীর্ণ এই অবৈধ কমিটি বিলুপ্ত করে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব প্রবর্তনের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।











































