Home আঞ্চলিক ক্ষুধার কোনো দাম নেই, দাম শুধু ভালোবাসার: সাতক্ষীরার রশীদ সরদারের ‘গরীবে নেওয়াজ’

ক্ষুধার কোনো দাম নেই, দাম শুধু ভালোবাসার: সাতক্ষীরার রশীদ সরদারের ‘গরীবে নেওয়াজ’

4

স্টাফ রিপোর্টার।।

টিনের জীর্ণ ছাউনি, চারপাশে বাঁশের চটার বেড়া। সাইনবোর্ডে মোটা অক্ষরে লেখা—‘মাথায় তৈল দেন, গামছা নিন, গোসল করুন, ভাত খান। পয়সা থাকলেও খাবেন, না থাকলেও খাবেন।’ সাতক্ষীরার বাঁকাল এলাকায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এমন এক মমতার আশ্রয়, যার নাম ‘গরীবে নেওয়াজ’। এ যেন নিছক কোনো ভাতের হোটেল নয়, বরং ক্ষুধার্ত আর নিঃস্ব মানুষের এক পরম ভরসাস্থল। যার কারিগর ৬৮ বছরের বৃদ্ধ আবদুর রশীদ সরদার। পকেটে টাকা থাকুক বা না থাকুক, ক্ষুধার্ত মুখে আকুলতা নিয়ে এসে দাঁড়ালে এই হোটেল থেকে কাউকে কোনোদিন খালি পেটে ফিরতে হয় না।

শৈশবে এতিম হয়ে অভাবের তাড়নায় মানুষের ফেলে দেওয়া ডাবের খোসা আর কাঁঠালের বিচি কুড়িয়ে খেয়ে দিন পার করেছিলেন রশীদ সরদার। ক্ষুধার সেই জ্বালা আর নিঃসঙ্গতার তীব্র যন্ত্রনা তিনি নিজের হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। জীবনের সেই কঠিন স্মৃতি আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই তাগিদ থেকেই ২০১২ সালে মাত্র ৩৫০ টাকার বাকির সদাই নিয়ে শুরু করেছিলেন এই হোটেল। সঙ্গে ছায়ার মতো ছিলেন স্ত্রী ফজিলা খাতুন। যিনি আজও রাত তিনটায় উঠে পরম মমতায় রান্না বসান, যাতে হাসপাতালে আসা অসহায় রোগী, স্বজন কিংবা পথচলতি কোনো দরিদ্র মানুষ পেট ভরে দুটি ডাল-ভাত খেতে পারে। মানুষের সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ ২০ টাকা দেন, কেউ ৫০ টাকা, আবার কারো কাছে এক পয়সা না থাকলেও জোটে সম্মানের সঙ্গে গরম ভাত।

প্রতিদিন সাত-আট পদের সাধ্যমতো তরকারি রান্না হয় রশীদের রান্নাঘরে। নিজের হাতে মানুষের পাতে খাবার তুলে দিয়ে রশীদ সরদার তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, ‘গরিব মানুষের কষ্ট আর ক্ষুধার যন্ত্রণা আমি বুঝি। মেডিকেল হাসপাতালের পাশে বসে অসহায় মানুষের কান্না রোজ দেখি। আপনার পয়সা আছে কি না, তা আমার হিসাবের বিষয় না, আপনি খেতে চেয়েছেন—আমার সাধ্য থাকলে আমি খাওয়াব।’ খাজা মঈনুদ্দীন চিশতির ভক্ত রশীদ আজমিরে যেতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু নিজের এই ছোট্ট হোটেলটিকে বানিয়েছেন মানবতার এক দরবার। যেখানে পকেটের হিসেব নয়, মানুষ আর ক্ষুধার আকুতিই সবচেয়ে বড় সত্য।