‘জনসংখ্যার বড় অংশ সরকারী নির্দেশনা অমান্য করে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করছেন। ফলে দেশে করোনা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে। মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের পরিবর্তন না ঘটলে বাংলাদেশকে করোনা সংক্রমণের চতুর্থ ধাপে’র মুখোমুখি হতে হবে’
বিশেষ প্রতিনিধি:>
মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ দেশের করোনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, দেশের করোনা পরিস্থিতি ‘মহামারী’ এর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ধাপে ধাপে করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে একের পর এক উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে সরকার। কিন্তু দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ সরকারী নির্দেশনা অমান্য করে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করছেন। ফলে দেশে করোনা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে। মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের পরিবর্তন না ঘটলে বাংলাদেশকে করোনা সংক্রমণের চতুর্থ ধাপ ‘মহামারী’ এর মুখোমুখি হতে হবে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে ঘরে অবস্থান এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিকল্প নেই। সরকারী নির্দেশনা অমান্য করে ঘর থেকে বাইরে বের হচ্ছে মানুষ।

নানান জনের নানা অজুহাত। অতি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষ ছাড়াও অপ্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়। বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোর প্রধান প্রধান সড়কেও লোকজনের চলাফেরা চোখে পড়ার মতো। আর অলি গলিতে যেন মানুষের জট। দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করার ক্ষেত্রেও বজায় রাখা হয় না সামাজিক দূরত্ব। হঠাৎ করেই এক ক্রেতার লাগালাগি করে দাঁড়াচ্ছে আরেক ক্রেতা। দলবদ্ধভাবে হেঁটে যেতে, আড্ডা দিতেও দেখা যায়। একই মোটরসাইকেলে গাদাগাদি করে ছুটে চলেন একাধিক মানুষ। আর উপজেলা পর্যায়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার যেন বালাই নেই। সুযোগ পেলেই চলে দলবদ্ধ আড্ডা। নানা কৌশলে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ছুটে চলার প্রবণতা বেশ দৃশ্যমান। সব কিছু মিলিয়ে করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে অনেক মানুষ যেন এখনও অসচেতন। তারা সচেতনভাবেই সরকারী নির্দেশনা অমান্য করে দেশের করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে ব্যাহত করছেন। আর দেশের করোনা পরিস্থিতি যাচ্ছে মহামারীর দিকে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে ছড়িয়েছে ২১টি জেলায়:
নারায়ণগঞ্জের করোনা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলেই মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। সরকারী নির্দেশনা অমান্য করে এই জেলায় শত শত মানুষ নানা কৌশলে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েন। আর তাদের মাধ্যমেই দেশের ২১টি জেলায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৫৭টিতে মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত জেলাগুলোর মধ্যে অন্তত ২১টিতে সংক্রমণ হয়েছে নারায়ণগঞ্জ থেকে যাওয়া লোকজনের মাধ্যমে। আর নারায়ণগঞ্জে সংক্রমণ হয়েছে ইতালিফেরত প্রবাসীর মাধ্যমে। এদিকে আক্রান্ত অন্য জেলার মধ্যে কয়েকটিতে সংক্রমণ হয়েছে ঢাকা ও গাজীপুর থেকে যাওয়া করোনা রোগীর মাধ্যমে। বেশ কয়েকটি জেলার সংক্রমণের কারণ স্পষ্ট হওয়া যায়নি। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
দেশের ৫৭টি জেলায় সংক্রমণ:
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, করোনার থাবা সবচেয়ে বেশি পড়েছে রাজধানী ঢাকা মহানগরীতে। এ বিভাগটিতেও আক্রান্তের সংখ্যা সর্বাধিক। আর করোনার প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে কম খুলনা বিভাগে। আইইডিসিআর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২১ এপ্রিল পর্যন্ত করোনায় ঢাকা বিভাগে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৫২ জন। মোট আক্রান্তের ৭২.৫ শতাংশই এ বিভাগে। ঢাকা বিভাগের আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে এক হাজার ২২৯ জন (৩৬.৩৪ শতাংশ) এবং জেলাগুলোতে এক হাজার ২২৩ জন (৩৬.১৬ শতাংশ)। এ ছাড়া অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ১২৫ জন (৩.৭০ শতাংশ), সিলেট বিভাগে ১৮ জন (০.৫৩ শতাংশ), রংপুর বিভাগে ৫২ জন (১.৫৪ শতাংশ), খুলনা বিভাগে ৯ জন (০.২৭ শতাংশ), ময়মনসিংহ বিভাগে ৯৯ জন (২.৯৩ শতাংশ), বরিশাল বিভাগে ৬৫ জন (১.৯২ শতাংশ) এবং রাজশাহী বিভাগে ২১ জন (০.৬২ শতাংশ)।
আইইডিসিআর’র তথ্যানুযায়ী, ঢাকা বিভাগের ঢাকা মহানগরীতে আক্রান্ত এক হাজার ২২৯ জন। আর ঢাকা জেলায় ৪৮, গাজীপুরে ২৬৯, কিশোরগঞ্জে ১৪৬, মাদারীপুরে ২৬, মানিকগঞ্জে ৯, নারায়ণগঞ্জে ৪৬৯, মুন্সীগঞ্জে ৫৪, নরসিংদীতে ১৩৬, রাজবাড়ীতে ১০, টাঙ্গাইলে ১৩, শরীয়তপুরে ৮ ও গোপালগঞ্জে ৩০ জন। চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ৪১, কক্সবাজারে ৫, কুমিল্লায় ২৫, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১১, লক্ষ্মীপুরে ২৫, বান্দরবানে একজন, নোয়াখালীতে ৪, ফেনীতে ৩ জন ও চাঁদপুরে ১০ জন। রংপুর বিভাগের মধ্যে রংপুরে ৭, গাইবান্ধায় ১৩, নীলফামারীতে ৯, লালমনিরহাটে ২, কুড়িগ্রামে ৩, দিনাজপুরে ১১, পঞ্চগড় ১ ও ঠাকুরগাঁওয়ে ৬ জন। রাজশাহী বিভাগের মধ্যে জয়পুরহাটে ৩, পাবনায় ৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ১, বগুড়ায় ২, নওগাঁয় ১, সিরাজগঞ্জে ২ এবং রাজশাহীতে ৯ জন। সিলেট বিভাগের মধ্যে সিলেট জেলায় ৪, মৌলভীবাজারে ২, সুনামগঞ্জে ১ ও হবিগঞ্জে ১১ জন। খুলনা বিভাগের মধ্যে খুলনা জেলায় ৩, যশোর ১, বাগেরহাটে ১, নড়াইলে ২ এবং চুয়াডাঙ্গায় ২ জন। বরিশাল বিভাগের মধ্যে বরগুনায় ১৭, বরিশালে ৩২, পটুয়াখালীতে ৭, পিরোজপুরে ৫ ও ঝালকাঠিতে ৪ জন। ময়মনসিংহ বিভাগের মধ্যে ময়মনসিংহ জেলায় ৪০, জামালপুরে ২২, নেত্রকোনায় ১৮ ও শেরপুরে ১৮ জন।
নির্দেশনা অমান্য করলেই করোনা পরিস্থিতির অবনতি অনিবার্য:
জাতীয় রোগতত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মীরজাদী সেব্রিনা ফোরা জানান, দেশে করোনার কমিউনিটি সংক্রমণ ঘটেছে। করোনা সংক্রমণের ক্রান্তিকাল পার করছে বাংলাদেশ। দেশ সংক্রমণের তৃতীয় স্তর থেকে চতুর্থ স্তরের দিকে যাচ্ছে, এটা বলা যায়। ভয়াবহ পরিস্থিতির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, করোনা প্রতিরোধে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। সরকার নির্দেশিত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতেই হবে। ঘরে অবস্থান করতেই হবে। নিজেকে, নিজের পরিবারকে এবং দেশবাসীকে বাঁচাতে হলে তা করতেই হবে। কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের বিস্তার থামাতে না পারলে সামনের দিনগুলোতে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
করোনা পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে আইইডিসিআর’র সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোস্তাক হোসেন বলেন, সরকারী নির্দেশনা মেনে ‘ঘরে অবস্থান’ এবং ‘ সামাজিক দূরত্ব ’ বজায় রাখতে পারলে এখনও দেশ করোনার মহামারী থেকে রক্ষা পেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, করোনা সংক্রমণের তৃতীয় পর্যায় কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের ঘটনা ঘটছে। কমিউিনিটি ট্রান্সমিশনের ব্যাপকতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে শত উদ্যোগ নিয়েও করোনার মহামারী থেকে রেহাই পাবে না বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মতো বর্তমান পরিস্থিতিতে পড়েও করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সফলতার মুখ দেখেছে বিশে^র অনেক দেশ। তবে আমাদের হাতে রয়েছে খুবই কম সময়। তিনি আরও বলেন, মানুষের আচরণে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশবাসীর বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বন্ধ না হলে সামনে করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহ মুহূর্ত অপেক্ষা করছে। ড. মোস্তাক হোসেন অভিযোগ করেন, করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রেও এলাকাবাসীর সহযোগিতা মিলছে না। করোনা টেস্ট করালেই কেউ করোনা রোগী হয়ে যায় না। লকডাউনের ভয় পেয়ে অনেক এলাকায় করোনার পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহে বাধা দেয়া হচ্ছে। ফলে নমুনা পরীক্ষার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নমুনা সংগ্রহ করতে দেখলেই সেই বাড়ি বা এলাকা লকডাউন করে দেয়া ঠিক হবে না। এতে আতঙ্কিত হয়ে নমুনা সংগ্রহে বাধা দিয়ে থাকে এলাকাবাসী। আইইডিসিআর’র চূড়ান্ত রিপোর্টে পজিটিভ এলেই লকডাউনের বিষয়টি ভাবা উচিত।
স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক ডাঃ এম এ আজিজ বলেন, করোনাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে সংস্পর্শের মাধ্যমে। আক্রান্ত মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের সংস্পর্শ এড়ানোই তাই নতুন সংক্রমণ ঠেকানোর একমাত্র উপায়। করোনা প্রতিরোধে সফলতা পেয়েছে এমন দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। ৩১ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু ধেয়ে আসা করোনার মহামারী পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পারছেন না দেশের অনেক মানুষ। ঘরে অবস্থান করার পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতেই হবে। অন্যথায় দেশের করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবেই।
বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আহমেদুল কবীর বলেন, দেশের সামনে কঠিন সময় আসছে। এখনই পুরো দেশে লকডাউন করা জরুরী। অতি দরকার না হলে ঘরে অবস্থান করতে হবে। অপ্রয়োজনে বাইরে বের হলে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েই যাচ্ছে। এমন ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডীন এবং প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডাঃ এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, করোনাভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতি একটি বৈশি^ক মহামারী। এটি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বিশে^র উন্নত দেশগুলো অসহায় হয়ে পড়ছে। বিশে^্র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও আতঙ্কমুক্ত থাকতে পারে না। করোনা প্রতিরোধে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। প্রতি মুহূর্তের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় সরকারী উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন অব্যাহত রয়েছে। ৩১ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গৃহীত সকল উদ্যোগ বাস্তবায়নে জাতীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে গঠিত কমিটি কাজ করছে। দেশের মানুষ ঘরে অবস্থান এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলেই সফলতার মুখ দেখবে করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। করোনার মহামারী থেকে রেহাই পাবে দেশবাসী।
প্রস্তুতির বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি রশীদ-ই-মাহবুব জনকণ্ঠকে বলেন, সরকার দেরিতে হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি দেয়া, দেশের বিভিন্ন স্থান লকডাউন করা, লম্বা সরকারী ছুটি দেয়া, পরীক্ষার আওতা বৃদ্ধি, সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি, লোকজনকে নিজ নিজ বাসায় ঢুকিয়ে দেয়া, কোয়ারেন্টাইন বিশেষ করে বাসায় রাখতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ-এসব পদক্ষেপ ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।









































