চার থেকে ছয় লেনের রাস্তা, নির্মাণাধীন খানজাহান আলী বিমান বন্দর চালু ও বন্দর জেটির নাব্যতা বৃদ্ধির দাবী ব্যবসায়ীদের
মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি।।
পদ্মা সেতুকে ঘিরে নতুন করে মোংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহারে গুরুত্ব বেড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আমদানী-রপ্তানীকারকসহ নানা শিল্প প্রতিষ্ঠানের। সেতু চালু হলে সহজ হবে ঢাকা থেকে মোংলা বন্দরের যাতায়াত, কমবে দূরত্বও। যা দূরত্বের দিক দিয়ে চট্টগ্রামের তুলনায় ঢাকা থেকে মোংলা বন্দরই অনেক কাছাকাছি। তাই ইতিমধ্যে মোংলা বন্দর, ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ আশপাশের এলাকায় চট্টগ্রাম এবং ঢাকার ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ প্রত্যাশী হয়ে উঠেছেন। তবে পদ্মা সেতুর পুরোপুরি সুফল ভোগে সেতু থেকে বন্দর পর্যন্ত চার থেকে ছয় লেনের রাস্তা, বন্দর এলাকায় ফাইভ ষ্টার মানের হোটেল, নির্মাণাধীন খানজাহান আলী বিমান বন্দর চালু ও বন্দর জেটির নাব্যতা সংকট নিরসনের দাবী সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, আগামী ২৫ জুন খুলে দেয়া হবে পদ্মা সেতু। এতে দূরত্ব কমে ঢাকার সাথে যাতায়াত সহজ হবে পদ্মার এপারের ২১ জেলার মানুষের। আর তাতে সবচেয়ে বড় সুফল আসবে মোংলা বন্দরের। চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় ঢাকা থেকে মোংলা বন্দরের দূরত্ব ও যাতায়াতের সময় কমবে অর্ধেকে। তাই চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে ছুটতে শুরু করেছেন মোংলার দিকে। মোংলা বন্দরসহ আশপাশের এলাকায় বিনিয়োগ প্রত্যাশী হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানী-রপ্তানী বৃদ্ধির পাশাপাশি এ এলাকায় শিল্প কলকারখানার সংখ্যাও বেড়ে যাবে কয়েকগুন। যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি বেকারত্ব নিরসনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে এ অঞ্চল। তবে পদ্মা সেতুর পুরোপুরি সুফল ভোগে সেতু থেকে বন্দর পর্যন্ত চার থেকে ছয় লেনের রাস্তা, বন্দর এলাকায় ফাইভ ষ্টার মানের হোটেল, নির্মাণাধীন খানজাহান আলী বিমান বন্দর চালু ও বন্দর জেটির নাব্যতা সংকট নিরসনের দাবী সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের।

মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই উন্নয়নের মাধ্যমে মোংলা বন্দরের বিশাল কর্মযজ্ঞ সৃষ্টি করেছেন। এ বন্দরে তার হাতেই মোংলা ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার তারই প্রচেষ্টায় অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজের বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে। আর পদ্মা সেতু হওয়ার কারণে মোংলা বন্দরের কর্মকান্ড আরো বেড়ে যাবে। কারণ এখানে রেল ও সড়ক যোগাযোগও প্রসার করা হচ্ছে। এতে মোংলা বন্দরকে ঘিরে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ আরো শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দ জাহিদ হোসেন বলেন, প্রথমমত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হওয়ার পরে দেশের রাজধানী ঢাকা থেকে মোংলা বন্দরের দূরত্ব চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্বের তুলনায় হ্রাস পাবে। যার ফলে ঢাকার আশেপাশের শিল্প কলকারখানার পণ্য রপ্তানী মোংলা বন্দরের মাধ্যমে শুরু হবে। এতে এ বন্দরের কার্যক্রম অনেকাংশে বেড়ে যাবে। বন্দর কর্তৃপক্ষও আধুনিক সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের সেবা নিশ্চিতে প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু আমাদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে বন্দর জেটিতে নাব্যতা বৃদ্ধির। বন্দরের নোঙ্গরে হাড়বাড়িয়ায় সাড়ে ৯ মিটার নাব্যতা আছে, আর জেটিতে মাত্র ৭ মিটার। আমরা বন্দর ব্যবহারকারী ও জাহাজ মালিকদের দাবী দ্রুত সময়ের মধ্যে জেটির নাব্যতা ৮ মিটারে উন্নীত করতে হবে। নাব্যতা বৃদ্ধি না করা হলে জাহাজ আগমন-নির্গমনে অসুবিধা হবে। সেক্ষেত্রে মোংলা বন্দর অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ফলে পদ্মা সেতুর সুফল পেতে হলে আমাদেরকে নদীর নাব্যতা বজায় রাখতে হবে।
মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর এ্যাসোসিয়েশনের সহ-সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা জেসান ভুট্টো বলেন, পদ্মা সেতুর পর ভাঙ্গা থেকে মোংলা পর্যন্ত টুলেনের রাস্তা। সেতু চালু হলে এ রাস্তায় চাপ বাড়বে তাই এ রাস্তাটি টেকসই ফোর-সিক্স লেন করা প্রয়োজন। এছাড়া মোংলা বন্দর, ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের জন্য কোন ফাইভষ্টার হোটেলের ব্যবস্থা নেই, এটির প্রয়োজন রয়েছে। আমরা ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বন্দরের কাছাকাছি নির্মাণাধীন অভ্যন্তরীণ খানজাহান আলী বিমান বন্দরটিও দ্রুত চালু করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধসহ জোর দাবী জানাচ্ছি। জমি অধিগ্রহণের পর বিমান বন্দরের সীমানা প্রাচীর সম্পন্ন হয়েছে, এখন টার্মিনাল ও রানওয়ে হলে এটা চালু করা সম্ভব। তাহলেই এ বন্দরসহ এ এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য আরো প্রাণচাঞ্চল্য হবে বলে আমি মনে করি।

মোংলা কাস্টমস সিএন্ডএফ এজেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শেখ লিয়াকত হোসেন বলেন, পদ্মা সেতুর ফলে দূরত্ব কমে চট্টগ্রামের তুলনায় মোংলা বন্দরে যাতায়াত সহজ হয়েছে। এতে চট্টগ্রাম ও ঢাকা কেন্দ্রীক ব্যবসায়ীরা এ বন্দর ব্যবহারসহ এ এলাকায় শিল্প কলকারখানা প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হয়ে পড়েছেন। অনেকেই মোংলা বন্দরের আশপাশে জমি কিনছেন আবারো কেউ কেউ জমি কেনার পর তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ কর্মও শুরু করেছেন। ফলে মোংলা বন্দরের কার্যক্রম কয়েকগুনে বেড়ে যাবে বলে মনে করছি আমি। এতে আমরা ব্যবসায়ীরা সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি আর্থিকভাবে যেমনি লাভবানও হবো তেমনি এ এলাকার বেকারত্ব ঘুচিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বি হবে এখানকার সর্বস্তরের মানুষও।
খুলনা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ড্রাস্ট্রিজ’র সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বুলু বিশ্বাস বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ উপকৃত হবে। বিশেষ করে এতে মোংলা বন্দর, ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। তাতে মানুষের বেকারত্ব কমে যাবে। এছাড়া এক সময়ে খুলনা শিল্পনগরী ছিলো, আবার খুলনা সেই শিল্পনগরীতে পরিণত হবে বলে আমরা ব্যবসায়ীরা আশা করি।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম মুসা বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে মোংলা বন্দরের উপর নতুন করে যে চাপ বাড়বে তার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা ইতিমধ্যে নেয়া হয়েছে। দেশের মেগা প্রজেক্ট রুপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র, পদ্মা সেতু, রামপাল তাপ বিদু্যুৎ কেন্দ্র ও রেলের প্রয়োজনীয় মালামালের অধিকাংশই এ বন্দর দিয়ে আমদানী, খালাস ও পরিবহণ করা হয়েছে। তাতেই প্রমাণ করে যে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। এছাড়া পদ্মা সেতুর সুফল কাজে লাগাতে আর্ন্তজাতিকভাবে নানা সংস্থার মাধ্যমে বিদেশী বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে কাজ করা হচ্ছে। সেতু চালু হলে কয়েকগুন বেড়ে যাবে এ বন্দরের কার্যক্রম তাই ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় সকল সেবা দিতেও প্রস্তুত বন্দর কর্তৃপক্ষ। অপরদিকে মোংলা বন্দরের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে নৌ, সড়ক ও বিমানসহ একাধিক মন্ত্রনালয়ের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তাই ব্যবসায়ীদের দাবী অনুযায়ী মোংলা বন্দরের আরো উন্নয়নে ফোর-সিক্স লেনের রাস্তা, খানজাহান আলী বিমান বন্দর চালুসহ অন্যান্য সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, পদ্মা সেতুর সাথে খাপখাইয়ে নিতে সক্ষমতা বাড়াতে বর্তমানে মোংলা বন্দরে ১০টি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরণের অবদান রাখা এ বন্দরকে আরো বেশি গতিশীল করতে চলমান রয়েছে মোংলা-খুলনা রেল লাইন, খানজাহান আলী বিমান বন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মত মেগা প্রজেক্টের কাজও।










































