Home আঞ্চলিক হতদরিদ্র রিকসাচালক বাবার ৪ সন্তানের মধ্যে ৩ জন প্রতিবন্ধি

হতদরিদ্র রিকসাচালক বাবার ৪ সন্তানের মধ্যে ৩ জন প্রতিবন্ধি

110

সাবজাল হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি ॥

ঠিকমত খাবার চিকিৎসা কোনটিই জোটে না। সারাবছর বিথী,যুথি,আলামিন রসুলদের অভাবের সাথে যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়। তারপরও ৪ ভাই বোনের মধ্যে ৩ ভাই বোন প্রতিবন্ধি। আর ছোট বোন যুথি এখনও সুস্থ। এমন অবস্থায় বাবা আব্দুল হাকিমের চায়ের দোকানের রোজগারই একমাত্র সম্বল। বাবার স্বল্প আয়ের সংসারে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন যুথীদের। তাদের বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার রায়গ্রাম ইউনিয়নের বনখির্দ্দা গ্রামে।

তাদের পারিবারিকসূত্রে জানাগেছে, ৪ ভাই বোনের মধ্যে বিথী বড়, মেজো আলামিন,সেজো যুথী আর ৪ বছরের রসুল সবার ছোট। তাদের মধ্যে ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ে যুথি। সন্তানদের জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যাচ্ছেন হতভাগা বাবা আব্দুল হাকিম। আর মা নেছারন বেগমের প্রতিবন্ধি ৩ সন্তান পরিচর্যা ও সারাক্ষন নজরে রাখতে নিজেও অসুস্থ পয়ে পড়েছেন। নিজেদের জীবনের ওপর দিয়ে যতই কষ্ট হোক না কেন কলিজার টুকরো সন্তানদের জন্য তাদের যেন কোন ক্লান্তি নেই। সন্তানদের এমন অবস্থা বলা যায় জন্মগত। দরিদ্র পরিবার হলেও সম্পদ বলতে যা ছিল তার প্রায় সবই শেষ। তারপরও তাদের বাবা মায়ের বিশ্বাস উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেলে তাদের বুকের ধন সন্তানেরা ভালো হয়ে যাবে।

সরেজমিনে বনখির্দ্দা গ্রামে গেলে দেখা যায়, ছোট ভাই আর ২ বোন বাড়ির মধ্যে যে যার মত বসে আছে। আর মানসিক প্রতিবন্ধি বড় ভাই আলামিন বাড়ির সামনের রাস্তায় পায়চারি করে বেড়াচ্ছে। তাদের প্রত্যেকের মুখে সব আজগবি কথা। তারা কি বলতে চাচ্ছে তা বোঝার উপায় নেই। তেমনি চলাফেরা, আচরন, অঙ্গ ভঙ্গি এক একজন মানষিক প্রতিবন্ধির মতই।

বাবা আব্দুল হাকিম জানান,মানুষের কষ্টের তো একটা শেষ আছে। কিন্ত আমার নেই। প্রতিদিন ছেলে মেয়েদের পেটের খাবার যোগাতে বাড়ি থেকে ৮ কিলোমিটার বাই সাইকেলের ওপর ভর করে কালীগঞ্জ শহরে আসতে হয়। সেখানে একটি ছোট চায়ের দোকান দিয়ে সারাদিন চা বিক্রি করি। দিনভর রোজগারের টাকায় চাল ডাল কিনে আবার সেই সাইকেল চেপে রাতে বাড়ি ফিরি। পরের দিন সাত সকালে আবার রওনা দিই। এভাবে সারাবছর চলে আমার জীবন।

তিনি আরও জানান,বড় মেয়ে বিথী জন্মের পর সুস্থ ছিল। কষ্ট করে এস.এসসি পাশ করিয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন। তার দুটি সন্তানও রয়েছে। কিন্ত জামাইয়ের সাথে বনাবনি না থাকায় প্রায় ৪ বছর ধরে মানষিকভাবে এলোমেলো হয়ে গেছে সে। বড় ছেলে আল আমিন জন্মের পর থেকে মানসিক প্রতিবন্ধি। সে প্রতিবন্ধি ভাতা পায়। ছোট ছেলে রসুলও মানষিক প্রতিবন্ধি। সন্তানদের মধ্যে মেয়ে যুথী কিছটু সুস্থ থাকলেও মাঝে মধ্যে সেও অসুস্থ হয়ে পড়ে।

আব্দুল হাকিম আরও জানান, বাবা হয়ে নিজের কাছেই মাঝে মধ্যে খারাপ লাগে। যখন ভাবি পয়সার অভাবে কলিজার টুকরো সন্তানদের ঠিকমত চিকিৎসা করাতে পারিনি। সম্পদ বলতে যা ছিল বড় ছেলে আলামিনের পেছনে ব্যয় করে নিঃস্ব প্রায়। এখন তাদের চিকিৎসার হাল ছেড়েই দিয়েছেন। তারা বিনা চিকিৎসায় বাড়িতেই ধুঁকছে। এটা পৃথিবীর কোন বাবা মায়েরই মনে বুঝ আসবে না।

মা নেছারন বেগম জানান, সন্তানদের জন্য নিজের কথা ভাবতে পারিনে। বর্তমানে ৮ সদস্যের বড় সংসার তাদের। নিজের প্রতিবন্ধি হওয়ায় তাদের সামলাতেই আমার জীবন কাটে। বাড়িতে থেকে সারাদিন তাদেরকে নজরে রাখতে হয়। একঘেয়েমি জীবনে সন্তানদের জন্য কোথাও যেতে পারিনা। নিজের গর্ভের সন্তান বিনা চিকিৎসায় ধুঁকছে। আবার অভাব আমাদের নিত্যসঙ্গী। একজন মা হিসেবে এটা সহ্য করতে পারিনা।

বনখির্দ্দা গ্রামের বাসিন্দা নাজমুল হোসেন জানান, হাকিমের পরিবারটি অত্যন্ত অসহায়। ৪ টি সন্তানের মধ্যে ৩ টি সন্তান এখন প্রতিবন্ধি। অনেক কষ্টের জীবন তাদের। বাবা অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিদিন ভোরে রোজগারের আশায় শহরের রওনা দেন। কোন রকমের ক্লান্তি তাকে কাবু করতে পারে না।

ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইকবাল হোসেন জানান,৩ টি প্রতিবন্ধি সন্তান নিয়ে আব্দুল হাকিম কষ্টে আছেন। তারপরও সংসারে সব সময় তাদের আহাকার। এমন অসহায়ত্ব দেখে বড় ছেলেকে শারীরিক প্রতিবন্ধির ভাতার ব্যবস্থা করেছেন। তাদের মত অসহায় পরিবার এখন দেখাই যায় না।