Home জাতীয় বিএনপি’র রুদ্ধদ্বার বৈঠক: আন্দোলনের বিকল্প নেই

বিএনপি’র রুদ্ধদ্বার বৈঠক: আন্দোলনের বিকল্প নেই

9

ঢাকা অফিস ।।

বিএনপি’র শীর্ষ নেতাদের সংগে দ্বিতীয় দিনে যুগ্ম-মহাসচিব ও সম্পাদকদের সংগে বৈঠকে সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। বেশিরভাগ নেতাই জেলা-উপজেলায় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা তুলে ধরেছেন।

বৈঠকে দল পুনর্গঠন, জোটের রাজনীতি, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলাসহ বিভিন্ন বিষয়েও আলোচনা হয়। এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া’র মুক্তি এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে এক দফা আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই বলেও মতামত দেন বৈঠকে উপস্থিত নেতারা।

বুধবার (১৫ সেপ্টেম্বর) গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিকাল ৪টায় শুরু হওয়া বৈঠক রাত ১২টার দিকে শেষ হয়। দীর্ঘ এই বৈঠকে সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব, যুগ্ম-মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদক ও সহ-সম্পাদক পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে নেতারা আশঙ্কা করছেন- আওয়ামী লীগ ২০১৪ ও ২০১৮-এর মতো আবারও একতরফা নির্বাচন করার কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে। এই অবস্থায় নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে একদিকে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে, অন্যদিকে সরকার পতনের আন্দোলনে জোরালো হতে হবে।

বৃহস্পতিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিএনপি’র অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা বৈঠকে যোগ দেবেন। এরপর দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠক আহ্বান করা হবে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের সংগেও বৈঠকের সিদ্ধান্ত রয়েছে বিএনপি’র। সবার মতামতের পর চূড়ান্ত করা হবে আন্দোলনের কৌশল।

বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা তাদের বক্তব্যে সমালোচনা করে বলেন, যারা গত নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন, তাদের বেশিরভাগই নিজ নিজ আসন বাদ দিয়ে গুলশান, বনানীতে থাকেন। ফলে তাঁদের নিজ নিজ এলাকার সাংগঠনিক শক্তি হারিয়ে ফেলছেন। যারা বড় বড় কথা বলেন, তাঁরা আন্দোলনে কেউ নামেন না।

নেতাদের বেশিরভাগই আন্দোলনে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। অনেক নেতা বিএনপি’র অতীত কার্যক্রম পর্যালোচনা করে নতুনভাবে পথচলার পরামর্শ দিয়েছেন। অনেকে নিজ এলাকার কমিটি গঠনে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছেন। আবার বেশ কয়েকজন সাবেক ছাত্রনেতা জামায়াত নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে এর বিরোধীতাও করেছেন অনেকে। বক্তব্যে তারা বলেছেন, আওয়ামী লীগ খেলাফত মজলিশের সংগে চুক্তি করতে পারে, হেফাজতের সংগে ঐক্য গড়তে পারে তাতে তাদের দলে নেতিবাচক কোনো শব্দ উচ্চারিত হয় না। বিএনপি কাকে নিয়ে চলবে তা একমাত্র হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।

বৈঠকে বিএনপি’র বেশিরভাগ নেতা আন্দোলনে যাওয়ার পাশাপাশি সংগঠনের নানান অসঙ্গতি তুলে ধরেন। বিএনপি’র বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন বছরের পর বছর মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে, সাংগঠনিক ইউনিট কমিটি গঠন প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে। এভাবে দলকে শক্তিশালী করা সম্ভব নয় বলেও নেতারা জানান।

একজন যুগ্ম-মহাসচিব তাঁর বক্তব্যে বলেন, সবাইকে দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, বেগম খালেদা জিয়া’র জন্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। এসময় তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির কাছে ৪২ বিশিষ্ট

নাগরিকের দেওয়া চিঠি প্রসঙ্গে বলেন, বিএনপি’র উচিত তাদের সংগে যোগাযোগ রক্ষা করা।

বিএনপি নেতা জি কে গউছ বলেন, অঙ্গ সংগঠনের কমিটি গঠনে ঢাকা থেকে নেতারা এলাকায় গিয়ে বিলাসবহুল জীবন-যাপন করেন, পদ প্রত্যাশীদেরকে বিভিন্ন উপঢৌকন নিয়ে সেখানে যেতে হয়। না দিলে নেতারা অসন্তুষ্ট হন। আবার এলাকার নেতাদেরকে ঢাকায় ডেকে এনে দিনের পর দিন রাখা হয়। কেন্দ্রীয় নেতাদের যারা খুশি করতে পারেন তাদেরকেই নেতৃত্বে আনা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

বিএনপি’র সহ-সম্পাদক শাহাবুদ্দিন সাবু বলেছেন, আন্দোলন শুরু করার আগে যে নেতারা বিদেশে চিকিৎসা নেন তাদের আগেই চিকিৎসা নিতে হবে। আন্দোলন চলাকালে সব নেতার পাসপোর্ট মহাসচিবের কাছে জমা দিতে হবে।

বৈঠকে নেতারা ২০১৪-এর নির্বাচনে অংশ না নেওয়া আবার ২০১৮-এর নির্বাচনে শর্তহীনভাবে অংশ নেওয়া এবং সেই নির্বাচনে নির্বাচিত এমপিদের সংসদে যোগদানের বিষয়ে তারেক রহমান-এর কাছে জানতে চান। বৈঠকের মধ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য উপস্থিত দুই জন এমপি সভা কক্ষ ত্যাগ করে চলে যান বলে জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় জলবায়ুবিষয়ক সহ-সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, আন্দোলনের বিকল্প নেই। সেজন্য দল এবং সংগঠনকে গোছাতে হবে। দল এবং অঙ্গ সংগঠন পুনর্গঠনের কাজ শেষ করে সর্বশক্তি ও সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনে নামতে হবে। এককভাবে অথবা যেসব রাজনৈতিক দল নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়, ভোটের অধিকার চায় তাদেরসহ নানান শ্রেণি-পেশার মানুষদের নিয়ে একটি প্ল্যাটফর্মে অথবা যুগপৎভাবে আন্দোলনে নামতে হবে।

তিনি বলেন, বিগত দিনে যে যে পর্যায়ে ব্যর্থতা এসেছে, সেসব ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য দায়ী সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। যেসব এমপি, মন্ত্রী, নেতা আন্দোলন-সংগ্রামে শামিল হননি, স্থানীয় নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেননি তাদের প্রয়োজনে অব্যাহতি দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে অভিমত দেন।

বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন সম্পাদক জানান, রুদ্ধদ্বার এই বৈঠকে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নেতাদের উদ্দেশে বলেন, রাজনীতিতে যার যা কাজ, তা তিনি সম্পাদন করলে যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব। নেতারা যে বক্তব্য দিলেন, তা যদি তারা অন্তরে ধারণ করেন তাহলে দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলন নিশ্চয়ই সফল হবে। তাই নিজের বক্তব্য বাস্তবায়ন করার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

বৈঠকের পরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, আগামী নির্বাচন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সংগে তৃতীয় বৈঠক হবে। শনিবার দলের নিয়মিত বৈঠকে নির্বাহী কমিটির সভা ও পেশাজীবী সংগঠনের সংগে বৈঠকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।