ঢাকা অফিস ।।
রাজধানীর বনানী থেকে অবৈধ মাদকসহ শামসুন্নাহার স্মৃতি ওরফে স্মৃতিমনি ওরফে পরীমনি ও মো. নজরুল ইসলাম ওরফে রাজসহ (৩৯) চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব ।
আজ বৃহস্পতিবার কুর্মিটোলা র্যাব সদর দপ্তরে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে এসব কথা জানান র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। তিনি বলেন, ‘গত ৩ আগস্ট রাতে রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে শরিফুল হাসান ওরফে মিশু হাসান এবং তার সহযোগী মো. মাসুদুল ইসলাম ওরফে জিসানকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকার গুলশান, বারিধারা ও বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পার্টি বা ডিজে পার্টি আয়োজনের বেশ কয়েকটি স্থানের তথ্য প্রদান করে। এরই ধারাবাহিকতায় র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-১ এর অভিযানে গত ৪ আগস্ট রাজধানীর বনানী এলাকায় বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে শামসুন্নাহার স্মৃতি ওরফে পরীমনিকে (২৬), মো. নজরুল ইসলাম ওরফে রাজসজসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া অন্যান্য সদস্যরা হলেন-আশরাফুল ইসলাম দীপু (২৯) ও মো. সবুজ আলী (৩৫)।
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন বলেন, ‘তাদের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় একটি মিনি বার পরিচালনার বিভিন্ন সরঞ্জামাদিসহ ৩৩ বোতল বিভিন্ন প্রকার বিদেশি মদসহ দেড় শতাধিক ব্যবহৃত বিদেশি মদের বোতল, ইয়াবা ও শিশা সামগ্রী, এলএসডি; আইস ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস। ’
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তারকৃত পরীমনি জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, পিরোজপুরের কলেজে (এইচএসসি) জীবনে অধ্যায়ণরত অবস্থায় চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। তিনি ২০১৪ সালে চিত্র জগতে অন্তর্ভূক্ত হন। এ পর্যন্ত তিনি ৩০টি সিনেমা এবং ৫/৭টি টিভিসিতে অভিনয় করছেন। পিরোজপুর থেকে ঢাকায় এসে চিত্র জগতে একটি দৃঢ় অবস্থান তৈরিতে গ্রেপ্তারকৃত মো. নজরুল ইসলাম রাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
র্যাব আরও জানায়, পরীমনি ২০১৬ সাল থেকে অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে পড়েন। তার ফ্ল্যাট থেকে বিভিন্ন ব্রান্ডের বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি নিয়মিত অ্যালকোহল সেবন করে থাকেন। মাত্রাতিরিক্ত সেবনের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে বাসায় একটি মিনি বার স্থাপন করেছেন। মিনি বার থাকায় তার ফ্ল্যাটে ঘরোয়া পার্টি অয়োজন পরিপূর্ণতা পেত বলে তিনি জানান।
গ্রেপ্তারকৃত মো. নজরুল ইসলাম রাজসহ আরও অনেকে তার বাসায় অ্যালকোহলসহ বিভিন্ন প্রকার মাদকের সরবরাহ করত এবং পার্টিতে অংশগ্রহণ করত বলে গ্রেপ্তারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।
গ্রেপ্তার হওয়া রাজকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র্যাব জানায়, সে ১৯৮৯ সালে খুলনার একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাশ করেন। পরবর্তীতে ঢাকায় গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন বলে দাবি করেন। অতঃপর তিনি বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঠিকাদারী কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি শোবিজ জগতেও তার অনুপ্রবেশ ঘটে। বিভিন্ন সিনেমা/নাটকে তিনি নানান চরিত্রে অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে নামে-বেনামে প্রযোজনায় যুক্ত হন। রাজ মাল্টি মিডিয়া নামেও তার একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ব্যবসায়িক জগত ও চিত্র জগতের দুই ক্ষেত্রে তার সংযোগ থাকায় তিনি অতিরিক্ত অর্থ লাভের আশায় উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে নিজ অবস্থানের অপব্যবহার করেন।
গ্রেপ্তারকৃত রাজ ইতিপূর্বে শরফুল হাসান ওরফে মিশু হাসান এবং মো. মাসুদুল ইসলাম ওরফে জিসানের সহযোগিতায় ১০/১২ জনের একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেন। উক্ত সিন্ডিকেটটি রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বিশেষ করে গুলশান, বারিধারা, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পার্টি বা ডিজে পার্টির নামে মাদক সেবনসহ নানাবিধ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা করে থাকে। উক্ত পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে সিন্ডিকেট সদস্যরা বিপুল পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। অংশগ্রহণকারীরা সাধারণত উচ্চবিত্ত অভিজাত পরিবারের সদস্য। প্রতিটি পার্টিতে ১৫-২০ জন অংশগ্রহণ করতেন।
এছাড়া সিন্ডিকেটটি বিদেশেও প্লেজার ট্রিপের আয়োজন করত। একইভাবে উচ্চবিত্ত প্রবাসীদের জন্যেও দুবাই, ইউরোপ ও আমেরিকায় এ ধরনের পার্টির আয়োজন করা হতো। পার্টি আয়োজনের ক্ষেত্রে আগত ব্যক্তিদের চাহিদা/পছন্দের গুরুত্ব দিয়ে পার্টি সমূহ আয়োজন করত। গ্রেপ্তারকৃত মো. নজরুল ইসলাম রাজের সিন্ডিকেট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার করতেন। সুদর প্রসারী পরিকল্পনায় তারা অগ্রসর হতেন ও স্বার্থ চরিতার্থ করতেন।
গ্রেপ্তারকৃত রাজ তার ‘রাজ মাল্টিমিডিয়া’ কার্যালয়টি অনৈতিক কাজে ব্যবহৃত হত। গ্রেপ্তার রাজের বরাত দিয়ে র্যাব জানায়, এ জাতীয় অবৈধ আয় থেকে অর্থ নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যবসায় আমদানি, ড্রেজার বালু ভরাট ও ঠিকাদারী ও শোবিজ জগতে বিনিয়োগ করেতেন। বর্ণিত ব্যবসায় বেশ কয়েকজন অবৈধ অর্থের যোগানদাতাদের সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেছেন।
প্রসঙ্গত, গতকাল বুধবার অভিযান চালিয়ে রাত ৮টা ১০ মিনিটে পরীমনিকে তার বনানীর বাসা থেকে বের করে একটি সাদা মাইক্রোবাসে নিয়ে যায় র্যাব। এরপর পরীমনিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার রাত সাড়ে ৮টায় রাজের বাসায় অভিযান চালায় র্যাব।
টানা দুই ঘণ্টার অভিযান শেষে রাজধানীর বনানীর বাসা থেকে রাত ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে রাজকে বের করে আনেন র্যাবের সদস্যরা। এরপর তাকেও নেওয়া হয়েছে র্যাব সদর দপ্তরে।
র্যাবের সূত্রে জানা গেছে, পরীমনির বাসার সেলফে সাজানো ছিল বিদেশি মদ। বিদেশি ব্রান্ডের বহু মদ মিলেছে তার বাসায়। এমনকি ফ্রিজেও ভর্তি ছিল নামি-দামি ব্রান্ডের মদ। এর পাশাপাশি তার বাসায় মিলেছে ইয়াবা ও ভয়ঙ্কর মাদক এলএসডি-আইস।
অভিযানের আগে, র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে হঠাৎ ফেসবুকে লাইভে চলে আসেন পরিমনি। লাইভে পরীমনি বলেন, ‘কারা যেন আমার বাসায় ঢোকার চেষ্টা করছে। কেউ কালো কাপড় পরে আছেন, কেউ রঙিন কাপড় পরে আছেন। এরা কারা ভাই? আমি লাইভ কাটছি না।’
পরীমনি আরও বলেন, ‘পুলিশ হলে তো দরজা খুলেই দেব। কিন্তু তারা তো পরিচয় দিচ্ছে না। মেরে ফেললে সবার সামনে মেরে ফেলে যাক। আমি লাইভ কাটব না। সবাই দেখুক। সবাইকে দেখায় দেব, এরা কী কী করে।’
এ সময় পরীর বাসার দরজা ধাক্কার শব্দ পাওয়া যায়। পরীমনি বলেন, ‘ভাই আপনারা কিছু দেখতেসেন না, কিছু বলতেসেন না। আমি যে কী পরিমাণ সিক। তিন দিন ধরে বিছানা থেকে উঠতে পারছি না। আমার পরিচিতরা কী আসবেন? একটু দেখবেন, এরা কারা। লিটারেলি আমার দরজা ভাঙচুর করতেসে।’
পরিমনির এমন ফেসবুক লাইভের পর তার বাসার সামনে জড়ো হতে থাকে গনমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ মানুষেরা। বিকেল সাড়ে ৪টায় তার বাসার সামনের সড়কের দুই পাশ আটকিয়ে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এরপর একে একে বাসার সামনে আসতে থাকে র্যাবের একাধিক টিম। সঙ্গে বনানী থানা পুলিশও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে যায়।
এরপর বেলা সাড়ে ৪টার পর র্যাব সদস্যরা পরিমনীর বাসার ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিমসহ অন্য গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। বিকেল ৫ টার দিকে পরিমনিকে আটক করা হয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় র্যাব। এরপর সন্ধ্যার দিকে তার বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মদ উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।
প্রসঙ্গত, বেশ কিছু দিন ধরে আলোচনায় রয়েছেন নায়িকা পরীমনি। কিছুদিন আগে ঢাকার সাভারের বোটক্লাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অভিযোগ করে আলোচনায় আসেন তিনি। সে ঘটনায় কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। এছাড়াও, ওই ঘটনার পরে একাধিক ক্লাবে ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে পরীমনির বিরুদ্ধে।
গত কয়েক দিন আগে পিয়াসা ও মৌ নামেরও দুজন মডেল গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের বাসা থেকেও বিপুল মাদক উদ্ধার করেছে পুলিশ।











































