Home আঞ্চলিক অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু, স্বপ্ন ভেঙেছে একটি পরিবারের

অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু, স্বপ্ন ভেঙেছে একটি পরিবারের

13

পৌরসভার অনুমোদন না নিয়ে গোপনে দোতলা বাড়ির গাঁথুনির কাজ করাচ্ছিলেন মণিরামপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অফিসের পিছনের বাসিন্দা আব্দুল হক। মণিরামপুর বাজারের বড় ওষুধের দোকান আসমা ড্রাগ হাউজের মালিক তিনি। একতলা বাড়ির ছাদের উপর দিয়ে ধাবিত হয়েছে পল্লীবিদ্যুতের উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন সংযোগের তার। কোন দক্ষ রাজমিস্ত্রি ঝুঁকি নিয়ে সেখানে কাজ করতে চাননি। অবশেষে উপজেলার শেখপাড়া খানপুর এলাকার রাজমিস্ত্রি আল আমিন (২৫), মামুন হোসেন (১৯) এবং অন্য এক শ্রমিক দিয়ে চলছিল আব্দুল হকের বাড়ির কাজ।

৩-৪ দিন কাজ চলার পর বিপত্তি ঘটে গত মঙ্গলবার (২৩ মার্চ) বিকেল তিনটার দিকে। দোতলার লিন্টনের কাজের জন্য রড বাঁধাই করে উপরে তুলতে গিয়ে ছাদের উপরদিয়ে যাওয়া বিদ্যুৎ সংযোগের শক্তিশালি তারে স্পর্শ করে রড। বিকটশব্দে ধরেওঠা বিদ্যুতের আগুনে দগ্ধ হন মামুন। একইসাথে  আহত হন আল-আমিন। তাদের উদ্ধার করে ফায়ারসার্ভিস কর্মীরা মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে নেন। তখন তাদের যশোর সদর হাসপাতালে রেফার করেন জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আলমগীর হোসেন সুমন। দুইদিন পর আল-আমিন বাড়ি ফিরে আসেন। গুরুত্বর অবস্থায় ঢাকায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয় মামুনকে। সেখানে শনিবার (২৭ মার্চ) রাতে মৃত্যু হয় দগ্ধ মামুনের। এরপর ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ বাড়িতে এনে রোববার রাতে দাফন সম্পন্ন হয় তার।

মামুন উপজেলার শেখপাড়া খানপুর গ্রামের নাজির আহম্মেদের ছেলে। অসুস্থ পিতা-মাতার দুস্থ পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন তিনি। মামুনের দিনে ৪০০ টাকা আয়ে চলত সংসার। তাকে ঘিরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতো পিতা নাজির আহম্মদ ও মা সুফিয়া খাতুন। একমাত্র ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন তারা। ছেলে হারানোর বেদনায় বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তারা। তবে একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে তার মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করছেন না মামুনের পরিবার। ঘটনাটিকে নিজেদের ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছেন তার পিতা-মাতা।

মঙ্গলবার (৩০ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১ টায় মামুনের বাড়িতে গিয়ে লোকজনের ভিড় চোখে পড়ে। আত্মীয়-স্বজন পাড়াপড়শিরা সন্তানহারা পিতামাতাকে সান্তনা দিতে এসেছেন। সেখানে ছিলেন বাড়ির মালিক আব্দুল হক। কথা বলার ফাঁকে কেঁদে উঠছেন মামুনের মা সুফিয়া খাতুন।

তিনি বলেন, ছেলেরে বিয়ে দিতে চাইছি। তারমধ্যি ও চলে গেল।আমার ছেলের মৃত্যু এভাবে লেখা ছিল। কেউ এরজন্যি দায়ী না।

একই কথা মামুনের পিতা বা চাচাদের। তারা মামুনের পিতা নাজির আহম্মদকে আব্দুল হকের হাতে তুলে দিয়েছেন। মামুনের পিতাও বিনা ক্ষতিপূরণে আব্দুল হকের সাথে সমঝোতা করে নিয়েছেন।

আব্দুল হক বলেন, মামুনের চিকিৎসার সব খরচ আমি দিয়েছি। তার কাপনের কাপড় পর্যন্ত কিনে দিয়েছি। এখন থেকে এই পরিবারটি আমার পরিবারের একটা অংশ। তাদের দায়িত্ব আমার।

স্বজনদের দাবি, শরীরে নানা রোগ বাসা বাধায় কোন কাজ করতে পারেননা নাজির আহম্মদ। মামুন যা আনত তাতে কোন রকম চলে যেত। এখন মাসুন নেই। তাদের ভরসার খুঁটি ভেঙে গেছে। বাড়ির মালিক আব্দুল হক যে দায়িত্ব নিয়েছেন সেটা যেন তিনি ঠিকমত পালন করেন।

স্থানীয় সচেতনরা বলছেন, আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে একটি তাজা প্রাণের মূল্য হয়না। মামুনের পরিবার সেটা বুঝেছেন। তবে বাড়ি নির্মানের ক্ষেত্রে মালিক বা শ্রমিকদের আরো সচেতন হওয়া দরকার। কঠোর হওয়া দরকার পল্লীবিদ্যুৎ বা পৌর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের। কারণ প্রায়ই এমনিভাবে মামুনেরমত অনেক শ্রমিককে বিদ্যুতের আগুনে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়। কাটাতে হয় মানবেতর জীবন। স্বপ্নভাঙে অসহায় অনেক পরিবারের।

দুইপক্ষের মধ্যস্থতাকারী মণিরামপুর পৌরসভার কামালপুর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বাবুল আকতার বলেন, আব্দুল হকের বাড়ির একতলা পর্যন্ত অনুমোদন ছিল। দোতলার অনুমোদন নেই। হকের দোতলার কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে আহত মামুনের চিকিৎসার সব খরচ দিয়েছেন হক। মামুন মারা যাওয়ার পর তার স্বজনরা ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ ফেরত চেয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী তার লাশ বাড়িতে এনে দাফন করা হয়েছে। কোন সমস্যায় পড়ে মামুনের পিতা-মাতা আব্দুল হকের কাছে আসলে তাদের সহায়তা দেওয়ার জন্য তাকে বলা হয়েছে।

স্থানীয় খানপুর ইউপি চেয়ারম্যান গাজী মোহাম্মদ বলেন, সকালে আব্দুল হক লোকজন নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। আমি তাকে মামুনের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। দুস্থ হলেও মামুনের পরিবারের মত ভাল পরিবার ওই মহল্লায় নেই। ওরা মামলা করতে চায়নি।

যশোর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২ মণিরামপুর সদর দপ্তরের জেনারেল ম্যানেজার অরুন কুন্ডু বলেন, যেখানে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে ওই বাড়ির ছাদের ওপর দিয়ে ৩৩ হাজার ভোল্টেজ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ অতিক্রম করেছে। নিয়ম অনুযায়ী পল্লীবিদ্যুৎ সংযোগ হতে কমপক্ষে ১০ ফুট দুরত্বে ঘর নির্মাণ করতে হবে। বাড়ির মালিক সেটা অমান্য করে কাজ করাচ্ছিলেন। ঘটনাটি শোনামাত্র আমরা সতর্কতার জন্য মাইকিং করেছি। ওইঘর আর না গাঁথার জন্য বাড়ির মালিককে চিঠি করা হবে।

– আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর)