খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্ল্যাটফর্ম ‘এফডব্লিউসিএমএস’ (FWCMS)-এ শুক্রবার ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, যারা দেশটিতে কর্মী পাঠাতে পারবে। এর আগে গত ২১ আগস্ট ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। এদের ‘সিন্ডিকেট’ আখ্যা দিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবং বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের পর, এক সপ্তাহের মাথায় মালয়েশিয়া ৩১২টি সহযোগী এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করল।
সিন্ডিকেট হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় প্রথম তালিকায় থাকা ২৫টি এজেন্সির অধীনে ১০টি করে ২৫০টি এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ বলা হয়েছে। বাকি ৬২টিকে সরকারি এজেন্সি বোয়েসেলের সহযোগী বলা হয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমান সরকারের অনুরোধে মালয়েশিয়া শুধুমাত্র বাংলাদেশকেই এই বিশেষ সুযোগ দিয়েছে, যা ঐতিহাসিক অর্জন। নেপাল, ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ এ সুবিধা পায়নি। সরকারি এজেন্সি বোয়েসেল বিনা খরচে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোরও সুযোগ পেয়েছে।
শুক্রবার প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। তবে জনশক্তি ব্যবসায়ীরা বলছেন, অতীতেও তালিকার বাইরে থাকা এজেন্সিগুলো সিন্ডিকেটের নামে কর্মী পাঠাতে পারত। ২৫ এজেন্সির বাইরে থাকা এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়া থেকে চাহিদাপত্র এনে নিজ নামে কর্মী পাঠাতে পারলে সেটি হবে অর্জন। কিন্তু ‘সিন্ডিকেটের’ এজেন্সির নামে কর্মী পাঠাতে হলে তা হবে অতীতের অনিয়মেরই পুনরাবৃত্তি।
গত ২১ আগস্ট মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএসের মাধ্যমে ২৫টি বাংলাদেশি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়। বলা হয়েছিল, এই এজেন্সিগুলোই কর্মী পাঠাবে। একই পদ্ধতিতে ২০১৬ সালে ১০টি এবং ২০২২ সালে ২৫টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়েছিল মালয়েশিয়া, যারা পরবর্তীতে ‘সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিতি পায়।
এবারও কাজ পাওয়া ২৫টি এজেন্সিকে সিন্ডিকেট বলা হচ্ছে। এর অধিকাংশই অখ্যাত। লাইসেন্স পাওয়ার পর একজন কর্মীও পাঠায়নি— এমন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
২০২২ সালের ২৫ এজেন্সির অধিকাংশের মালিক ছিলেন তৎকালীন এমপি-মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের নেতারা। সেবার কর্মীপ্রতি ৭৯ হাজার টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু কর্মীদের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকার বেশি আদায়ের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। ব্যাপক অনিয়মের পর ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া।
মন্ত্রণালয় যা বলছে
আবারও পুরোনো পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্তে বিরোধী দলগুলো সরকারের সমালোচনা করছে। বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন তালিকার বাইরে থাকা এজেন্সির মালিকেরা। এই বিতর্কের মধ্যে শুক্রবার প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলেছে, ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তাতে রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাই করার দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়াকে দেওয়া হয়েছিল; যা ছিল ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বহিঃপ্রকাশ। এই সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তাই মালয়েশিয়া সরকারের শর্ত বাংলাদেশের পক্ষে পরিবর্তন করা সহজ নয়। তবে বর্তমান সরকার দর-কষাকষিতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করেছে। বাংলাদেশ সরকার সফলভাবে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কল্যাণ ও সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এ প্রচেষ্টার ফলে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগ দিতে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে। বিমানভাড়াসহ সব ধরনের অভিবাসন ব্যয়মুক্ত এই কর্মীদের প্রথম বহর সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর মাধ্যমে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হবে।
তবে কবে এই ফ্লাইট যাবে, তা জানানো হয়নি মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভা নেপাল ও বাংলাদেশের জন্য ২৫টি করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমোদন দিয়েছে, যা মালয়েশিয়া সরকারের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকায় ছিল।
এতে আরও বলা হয়, ফ্যাসিবাদী সরকারের সুবিধাভোগী এবং সিন্ডিকেটে জড়িত এজেন্সিগুলো বাদ দিয়ে বাকিগুলোকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দিতে বাংলাদেশ সরকার দৃঢ়ভাবে অনুরোধ জানিয়েছিল মালয়েশিয়াকে। এ অনুরোধে বিশেষ বিবেচনায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ দিয়েছে। দেশটির মন্ত্রিসভার বাছাই করা ২৫ এজেন্সির সঙ্গে আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দিচ্ছে। এই সুযোগ ঐতিহাসিক অর্জন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আগামী ৩১ ডিসেম্বর বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষে রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের অংশ হিসেবে আমরা চাই সব রিক্রুটিং এজেন্সি যেন নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। তবে চলমান উদ্যোগে ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া সীমাবদ্ধতায় যে অন্তর্বর্তী সরকার আবদ্ধ, আশা করি তা সবাই উপলব্ধি করবেন।’
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ৪০টি মেডিকেল সেন্টার দেশটির অনুমোদিত ছিল। শুক্রবার মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়া সরকার অনুমোদিত বিদ্যমান তালিকা থেকে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিতর্কিত মেডিকেল সেন্টার বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ১৬টি মেডিকেল সেন্টারের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের সতর্ক করে মন্ত্রণালয় বলেছে, কোন প্রক্রিয়ায় জনশক্তি পাঠানো শুরু হবে, তা এখনো প্রক্রিয়াধীন। মন্ত্রণালয় যথাসময়ে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা জানাবে। এর আগে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন, মেডিকেল টেস্ট করা কিংবা পাসপোর্ট জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানানো হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা যা বলছেন
৩১২টি এজেন্সিকে সহযোগী হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগকে অতীতেরই পুনরাবৃত্তি বলছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, অতীতেও সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা ৭০০-৮০০ এজেন্সি কর্মী পাঠিয়েছে। তবে নিজ নামে নয়, সিন্ডিকেটে থাকা এজেন্সির লাইসেন্স ব্যবহার করে ছাড়পত্র নিতে হতো। এতে কর্মীদের ব্যয় বাড়ত।
ব্যবসায়ীরা প্রশ্ন তুলেছেন, এফডব্লিউসিএমএসে যে ৩১২ এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে— তারা নিজ নামে কর্মী পাঠানোর ছাড়পত্র পাবে কি না। অতীতে এফডব্লিউসিএমএসে ১ হাজার ৪০০ এজেন্সি তালিকাভুক্ত ছিল উল্লেখ করে তারা জানান, সরাসরি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পেয়েছিল প্রথমে ১০টি, পরে ২৫টি এবং শেষে ১০০টি এজেন্সি।
চাহিদাপত্র এনে ২৫ এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠাতে হলে ওই এজেন্সিগুলোকে অতিরিক্ত ফি দিতে হবে কি না সে প্রশ্নও তুলেছেন তারা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, তালিকার বাইরে থাকা বৈধ এজেন্সি, যাদের মালয়েশিয়ায় নিজস্ব মার্কেটিং ব্যবস্থাপনা রয়েছে, তারা কীভাবে কর্মী পাঠাবে—এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর ছাড়া শুধু ৩৩৮ এজেন্সির তালিকা করে বাজার সিন্ডিকেটমুক্ত হয়েছে বলার সুযোগ নেই। তাদের দাবি, এমন অবস্থায় ২৫টি এজেন্সিই মূল নিয়ন্ত্রণে থাকবে, বাকিরা তাদের অধীনস্থ হয়ে সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে, যা অতীতেও ছিল।










































