ক্রীড়া ডেস্ক।।
রোনান ও ডেকলান সুলিভান বিদেশে বড় হয়েছেন। এখন খেলছেন বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক দলে। তারা একটি শিরোপাও জিতেছে বাংলাদেশের হয়ে। সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ানকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছে তারা। সেখানে তারা জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলতেই পারে।
রোনান সুলিভান জীবনে দুবার প্যানেঙ্কা পেনাল্টি নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। দুটিই হয়েছিল পৃথিবীর অন্য প্রান্তে অনুশীলনের সময়, আর একটি শটে বল ক্রসবারে লেগেছিল। কিন্তু তার যমজ ভাই ডেকলান মোটেও অবাক হননি, যখন রোনান তার দিকে ফিরে বলেছিলেন, গোলশূন্য এক টুর্নামেন্ট ফাইনালে পেনাল্টি শুটআউটের পঞ্চম ও ম্যাচজয়ী পেনাল্টিটি তিনি চিপ করে মারবেন। অনলাইনে তখন লাখ লাখ মানুষ দেখছিল বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দল ভারতের বিপক্ষে দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সাফ) চ্যাম্পিয়নশিপে খেলছে। ‘ওকে এটা বলতেও হয়নি। পুরো সময়ই আমি জানতাম, সে এটা করবে,’ সেন্ট জোসেফস ইউনিভার্সিটির ডরমিটরি রুমের সোফায় ভাইয়ের পাশে বসে ডেকলান স্মরণ করছিলেন। ‘আমি জানতাম, ম্যাচ জেতানোর জন্য শেষ পেনাল্টি নেওয়ার সুযোগ পেলে সে সেটাই করবে। এটাই তো ওর স্বভাব।’ কিছুক্ষণ পর বলটি দারুণভাবে গোলের জালে গিয়ে পড়ল, আর ৩ এপ্রিল মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে উপস্থিত হাজারো দর্শক উল্লাসে ফেটে পড়ল। ‘তুমি যদি আমাকে আগে বলতে যে ঘটনাটা এভাবে ঘটবে, আমি বিশ্বাসই করতাম না,’ বললেন রোনান। ইনস্টাগ্রামে সেভ বাংলাদেশ ফুটবল ফ্যান পেজের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান শুরু করার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দুই ভাই অনূর্ধ্ব-২০ শিরোপা উদযাপন করছিলেন। তাদের মাতৃসূত্রীয় বংশপরিচয়ের কারণে তারা কার্যত বাংলাদেশেরই ঘরের ছেলে হিসেবে এই সাফল্যের অংশীদার হয়েছিলেন। (মালদ্বীপে অভিবাসী শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় উৎস বাংলাদেশ।)
‘সেখানে একা উড়ে যাওয়া ছিল অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার। পানিটা এত নীল! এর আগে এমন কিছু কখনও দেখিনি। আমরা তো নিউ জার্সির ওশান সিটিতে যাই, যেখানে পানি বাদামি রঙের, অথচ সেটাই আমাদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা,’ রোনান বলেন। ‘তাই যখন আমরা এখানকার পানি দেখলাম, বললাম, ‘ওহ মাই গড!’ এটা সিনেমার পানির মতো লাগছিল। সিনেমার শেষে যে বিশেষ পানি দেখানো হয়Ñ আমার মনে হয়, ওটা আসলে মালদ্বীপের পানিই।’ গল্পটি যেন হলিউডের কোনো চিত্রনাট্য থেকে তুলে আনা। ফিলাডেলফিয়ার দুই কিশোর, যাদের নামও একেবারে আইরিশÑ টুর্নামেন্টের আগে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দলে ট্রায়াল দিতে আসার আগে যারা কখনও বাংলাদেশে যায়নি। এরপর তারা দেশের ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীতে বিজয়ীর বেশে ফিরে এলেন। কয়েক দিন তারা মিডিয়ার উন্মাদনা সামলানোর জন্য রাখলেন, এরপর আরও কয়েক দিন নিজেদের জন্যÑ ঘুরে বেড়ানো, খাবার উপভোগ করা এবং দাদির সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য। যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় এর আগে তারা শুধু দাদিকে দেখেছিলেন।
কিন্তু এটি হতে পারে ফিফা র?্যাংকিংয়ে ১৮১তম স্থানে থাকা বাংলাদেশের জন্য নতুন এক শুরুর দৃশ্য। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই দেশটি জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম প্রবাসী জনগোষ্ঠীর দেশ। এর বিশাল অংশ দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকলেও যুক্তরাজ্যে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি কমিউনিটি রয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালিতে তা দ্রুত বাড়ছে, পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও রয়েছে ছোট ছোট বাংলাদেশি সম্প্রদায়।
‘আমি মনে করি, আমরা সেখানে যা করেছি এবং অভিজ্ঞতাটা কতটা ভালো ছিল, সেটা অনেকেই দেখেছে। আর এখন হঠাৎ করে দেখছি, অনেক বিদেশি খেলোয়াড় বাংলাদেশের হয়ে খেলতে আগ্রহী। ইংল্যান্ডের কয়েকজন ছেলে আছে, যারা সেখানকার বেশ ভালো একাডেমিতে খেলছে। অর্থাৎ সারা বিশ্বেই আমাদের প্রতিভা আছে। এখন শুধু সেগুলোকে কাজে লাগানোর ব্যাপার,’ ডেকলান বলেন।
সুলিভান ভাইদের পরিচিতি বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র এবং এর বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। একইভাবে পরিচিত সাবেক মার্কিন জাতীয় দলের অধিনায়ক থমাস ডুলিও। একজন মার্কিন সেনাসদস্যের ছেলে ডুলি জার্মানিতে বেড়ে ওঠেন ও ফুটবল খেলেন এবং ঘটনাচক্রে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলে জায়গা পান। অনূর্ধ্ব-২০ দল ট্রফি দেশে আনার সাত সপ্তাহ পর তাকে বাংলাদেশের জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার কোচিং জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। সেখানেই তিনি এমন একটি দেশ সম্পর্কে শুনেছিলেন, যাকে তিনি এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন নতুন বিশ্বকাপ চক্রেÑ ‘ফুটবলের প্রতি উন্মাদ একটি দেশ।’ ‘আমরা এমন একটি দেশ, যারা সমর্থক হতে ভালোবাসে। এটা আমাদের বদলাতে হবে। আমাদের এমন একটি দেশ হতে হবে, যারা ফুটবল খেলে,’ ডুলি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন। ‘আমাদের এমনটাই হতে হবে এবং সেটা করার একটা পথ খুঁজে বের করতে হবে।’ রোনান, ডেকলান এবং তাদের দুই ভাই কুইন ও ক্যাভানÑ যারা দুজনই ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়Ñ যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং বাংলাদেশের হয়ে খেলার যোগ্য ছিলেন। কুইন গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলের হয়ে খেলে সেই দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে আবদ্ধ হয়ে যান। আর ম্যানচেস্টার সিটিতে যাওয়ার পথে থাকা ক্যাভান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সেরা তরুণ প্রতিভা। তাই বাংলাদেশের জন্য যমজ দুই ভাইই ছিলেন বেশি বাস্তবসম্মত বিকল্প।
‘সবকিছু শুরু হয়েছিল একটি ইনস্টাগ্রাম ডিএম থেকে, যা সত্যিই কিছুটা পাগলাটে ব্যাপার,’ ডেকলান স্মরণ করেন। বার্তাটি এসেছিল ‘ঝধাব ইধহমষধফবংয ঋড়ড়ঃনধষষ’ অ্যাকাউন্ট থেকে। শুরুতে তারা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েছিলেনÑ একটি ফ্যান পেজ কেন তাদের ক্যাম্পে আসতে বলছে, অথচ তাদের তখনও বাংলাদেশের পাসপোর্ট নেই! পরে তারা বুঝতে পারেন, অ্যাকাউন্টটি সত্যিকারের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম এবং ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সহায়ক। শেষ পর্যন্ত সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টে খেলার আগ্রহ প্রকাশ করলে সুলিভান ভাইদের ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ফাহাদ করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়।
‘কলেজ শুরু হওয়ার আগে আমাদের হাতে কিছুটা সময় ছিল। সেখানে গিয়ে খেলা, দেশের প্রতিনিধিত্ব করা এবং সংস্কৃতির আরও অংশ হয়ে ওঠাÑ দারুণ ব্যাপার হতো,’ রোনান বলেন।
পরবর্তী তিন মাস ছিল ‘কিছুটা পাগলাটে প্রক্রিয়া’Ñ মূলত তাদের মায়ের বাংলাদেশের পাসপোর্ট না থাকায় বাংলাদেশের পাসপোর্ট পাওয়াটা সহজ ছিল না। তবে মার্চে যমজ দুই ভাই নিউইয়র্ক থেকে দিল্লি, এরপর দিল্লি থেকে ঢাকায় উড়ে আসেন। এটি ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা।
তবে ঢাকায় তাদের জন্য লালগালিচা বিছানো ছিল না। দলে জায়গা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তাও ছিল না। তারা ৩০ জনেরও বেশি খেলোয়াড়ের একটি ক্যাম্পে যোগ দেন। সেখানে আরও তিনজন ‘অরিজিন’ খেলোয়াড় ছিলেন, যাদের সুলিভান ভাইরা আগে থেকেই চিনতেন এবং সহজে যোগাযোগ করতে পারতেন। কোচও ইংরেজি বলতেন, কিন্তু মাঠে বিভিন্ন মাত্রায় ভাষাগত বাধা ছিল।
‘আপনি যখন বিদেশি, তখন শুরুতে বল পাওয়া কঠিন হয়, কারণ আপনি ভাষাটা বলতে পারেন না। হয়তো ছেলেরা আমাদের এখানে আসায় খুব একটা খুশিও ছিল না। কিন্তু কয়েকবার বল পাওয়ার পর আপনি যখন দেখাতে পারেন আপনি কী করতে পারেন, তখন বিষয়টা সহজ হয়ে যায়,’ রোনান বলেন।
কয়েক দিন অনুশীলনের পর তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন যে দলে জায়গা পাবেন। সামাজিকভাবেও তাদের একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে যেতে থাকে।
ডুলি দৃঢ়ভাবে মনে করেন, বাংলাদেশি শিকড় রয়েছে এমন খেলোয়াড়দের নিজেদের জাতীয় দল বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। তার এশিয়ান কোচিং যাত্রা শুরু হয়েছিল ফিলিপাইনে, যেখানে বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে নেওয়ার বিরোধিতা করা অনেক সমর্থকের আপত্তি তিনি উপেক্ষা করেছিলেন। বাংলাদেশের জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দলের সংস্কৃতিতে উৎসাহিত হয়েছেন। বিশেষ করে লেস্টার সিটির মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীর নেতৃত্ব ও বিনয়কে তিনি গুরুত্ব দেন।
‘হামজা আসায় সবাই খুশি ছিল। তারা বোঝেÑ খেলোয়াড়রা বোঝেÑ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলা খেলোয়াড়রা তাদের সাহায্য করতে পারে, কারণ তারা তাদের অনুসরণ করতে পারে,’ ডুলি বলেন। ‘তাদের মানসিকতা কেমন, তারা কী ধরনের পরিশ্রম নিয়ে আসেÑ এসব থেকে শেখা যায়। তারা কীভাবে পরিস্থিতি সামলায়, সেখান থেকেও শেখা যায়।’ বিদেশে যত বেশি খেলোয়াড় খোঁজা হচ্ছে, ততই নতুন খেলোয়াড় পাওয়া যাচ্ছেÑ অবশ্যই সবাই বড় কোনো ইউরোপীয় লিগে খেলে না, কিন্তু এমন পর্যায়ের খেলোয়াড়ও আছেন যারা জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সামগ্রিক মান বাড়াতে পারেন।
তবে বিষয়টি ভারসাম্যেরও। খেলোয়াড়দের ব্যাপারে ডুলি ‘হাজার হাজার’ বার্তা পাচ্ছেন এবং স্বীকার করছেন, ‘আমাদের সতর্ক থাকতে হবে’Ñ বিশেষ করে বাজেটের সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে।
‘যে কেউ ফ্রি-কিক নেওয়ার একটা ভিডিও পাঠালেই যে সে ভালো খেলোয়াড়, কিংবা আমাদের সাহায্য করতে পারবেÑ তা নয়। এই দেশেও আমাদের ভালো খেলোয়াড় আছে, যাদের আমরা আসলে সামর্থ্যরে মধ্যে রাখতে পারি,’ তিনি বলেন। ‘আমরা কোনো খেলোয়াড়কে নিয়ে আসার জন্য ২ বা ৩ হাজার ডলার খরচ করব না, আর সে বেঞ্চে বসে থাকবে। তাই যারা আসছে, তারা যদি সত্যিই আমাদের সাহায্য করতে পারে, তাহলে ঠিক আছে। অন্যথায় ওই অর্থ দিয়ে স্থানীয় সব খেলোয়াড়কে ক্যাম্পে এনে দুই সপ্তাহ প্রতিদিন দুবার অনুশীলন করালে দেখবেন, তারা অনেক, অনেক ভালো হয়ে উঠছে।’
ডুলির মতে, এমন একটি ভালো খেলোয়াড়ের দলকে কোচিং করানো, যারা মাঠজুড়ে দৌড়াতে পারে এবং খেলাটা নিয়ে তাদের চিন্তাভাবনা বদলাতে পারেÑ ‘বেশির ভাগ খেলোয়াড় চিন্তা করে না, তারা শুধু খেলে’Ñ এবং ভুল কমাতে পারে, তাহলে দলকে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত করা সম্ভব। তিনি মনে করেন, ফিফা র?্যাংকিংয়ে ১৫০-এর ঘরে ওঠা অবশ্যই সম্ভব। অবশ্য এর চেয়েও বড় একটি স্বপ্ন রয়েছে। চার সুলিভান ভাইয়ের ইনস্টাগ্রাম কমেন্ট সেকশন বহু বছর ধরে বাংলাদেশের পতাকায় ভরে আছে। মালদ্বীপে থাকাকালে যমজ দুই ভাই ফোন দেখছিলেন এবং অনলাইনের উন্মাদনা কীভাবে সম্পূর্ণ অন্য এক স্তরে পৌঁছে গেছে, তা দেখছিলেন। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাদের নজরে পড়ে।
‘আমাকে এমন এডিট বানিয়ে পাঠানো হচ্ছিল, যেখানে দেখা যাচ্ছে আমি এমন একটা কুকুর নিয়ে হাঁটছি, যেটাকে ভারতের পতাকার মতো রাঙানো হয়েছে। ব্যাপারটা পাগলাটে ছিল। সেখানে অনেক উত্তেজনা ছিল, নিশ্চিতভাবেই। অনেক টেনশন,’ রোনান বলেন।
মালদ্বীপে পাওয়া সেই উন্মত্ত সমর্থন মাঠে তাদের এমন এক পরিবেশের অভিজ্ঞতা দেয়, যা আগে কখনও অনুভব করেননি। সেই অবাস্তব অভিজ্ঞতা ঢাকায় তাদের বীরের মতো অভ্যর্থনা পাওয়ার মধ্যেও অব্যাহত থাকে।
‘ওটা অনেক বড় ব্যাপার ছিল। অনেক ফুল পেয়েছি, অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আমার মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশে আমাদের দলটাই যেন নতুন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়,’ ডেকলান বলেন। সত্যিই, ঢাকায় ঘুরে বেড়ানোর সময়ও সুলিভান ভাইরা আলাদা করে নজরে পড়তেন। ডেকলানের ভাষায়, ‘আমরা সাদা, অন্তত এখানকার সবার চোখে।’
‘আমরা অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা করেছি, আর সবাই এত খুশি এবং কৃতজ্ঞ ছিল যে আমরা ট্রফিটা দেশে ফিরিয়ে এনেছি। তারা সত্যিই, সত্যিই অনেক উচ্ছ্বসিত ছিল।
আমেরিকায় যুব ফুটবলে এমন কিছু আপনি দেখতে পাবেন না।’
আর কোনো দেশের জাতীয় দলের সিনিয়র খেলোয়াড়দের জন্য বিমানবন্দরে এমন মিডিয়া উপস্থিতিও সম্ভবত খুব বেশি দেখা যায় না, যেমনটা ডুলির দলের ক্ষেত্রে হয়েছিল। জুনে সান মারিনোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলতে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে ডুলিকে এমন দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হয়।
‘আমার মনে হচ্ছিল, আমরা বিশ্বকাপে যাচ্ছি,’ ডুলি বলেন। ‘আমি ভাবছিলাম, এটা অসাধারণ! আর আমরা যদি বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারি, তখন দৃশ্যটা কেমন হবেÑ আমি কল্পনাই করতে পারি না।’
‘আমরা যদি বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারি, আমার মনে হয় দেশটাই বিস্ফোরিত হয়ে যাবে,’ রোনান বলেন।
‘আমি যখন ৬৪ দলের বিশ্বকাপের কথা ভাবি, তখন মনে হয়, ‘দেখো, আমরা যদি এসব খেলোয়াড়কে দলে আনতে পারি, তাহলে আমাদের যোগ্যতা অর্জনের একটা সুযোগ আছে। এটাই স্বপ্ন। এটাই চূড়ান্ত লক্ষ্য,’ ডেকলান বলেন।
তিনি তার বন্ধু, সাবেক ইউনিয়ন একাডেমির সতীর্থ ও পেন স্টেটের উইঙ্গার নেহান হাসান এবং স্ট্যানফোর্ডের স্ট্রাইকার ট্রেভর ইসলামকে সম্ভাব্য সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আশা করেন, ভবিষ্যতে আরও অনেক খেলোয়াড় এই তালিকায় যুক্ত হবেন।
‘আমাদের তাদের বোঝাতে হবে। আমাদের বলতে হবে, এই দেশে তুমি সত্যিই একটি উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারো,’ যোগ্য খেলোয়াড়দের প্রসঙ্গে ডুলি বলেন।
ডুলি আরও বলেন, এশিয়ান কাপÑ যেখানে বাংলাদেশের পুরুষ দল ইতিহাসে মাত্র একবার খেলেছেÑ অথবা বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া একটি প্রক্রিয়া। তবে একই নিঃশ্বাসে তিনি বলেন, ‘এটা দ্রুতও ঘটতে পারে।’
তিনি ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার ও ফুলহ্যাম একাডেমির খেলোয়াড় ফারহান ওয়াহিদ এবং ২৫ বছর বয়সী লুই ওয়াটসনের কথা উল্লেখ করেন। ওয়াটসন ইংল্যান্ডের চতুর্থ স্তরের লিগে খেলা একজন আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার। তারা ডুলির প্রকল্পের পরবর্তী সম্ভাব্য অংশ হতে পারেন। হামজা চৌধুরী এবং কানাডায় জন্ম নেওয়া মিডফিল্ডার শামিত শোমÑ যিনি গ্রীষ্মে নিউইয়র্ক কসমসের সঙ্গে চুক্তি করেছেনÑ এই প্রকল্পের ভিত্তি। ডুলি জোর দিয়ে বলেন, গোলরক্ষকের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণভাবে শক্তিশালী করতে হবে।
শরতের প্রীতি ম্যাচগুলোর পর বাংলাদেশের ফুটবল প্রকল্পের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য ধাপ হবে নভেম্বরে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সিনিয়র পর্যায়ের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। বাংলাদেশ মাত্র একবার, ২০০৩ সালে নিজেদের মাটিতে, এই টুর্নামেন্ট জিতেছে।
এটাই ডুলির প্রধান লক্ষ্য। তবে এরপর তিনি দেশের অভ্যন্তরে ফুটবলের উন্নয়নে আরও বেশি যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তার দৃষ্টিতে এটি ওপর থেকে নিচে নামা একটি প্রক্রিয়া : জাতীয় দলের সাফল্য আগ্রহ, স্পনসরশিপ ও বিনিয়োগ বাড়াবে; আর এর মাধ্যমে তৈরি হবে একটি যথাযথ ফুটবল কাঠামো, যেখানে যুব একাডেমিগুলো থেকে খেলোয়াড় উঠে এসে পেশাদার ও প্রাপ্তবয়স্ক লিগে যোগ দেবে।
ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্টে ওঠার আগ পর্যন্ত ডুলি একটি হোটেলে থাকছেন। জানালা দিয়ে তিনি ঘনবসতিপূর্ণ বহুতল ভবনগুলোর দিকে তাকান এবং আফসোস করেনÑ দৃষ্টিসীমায় মাত্র একটি-দুটি স্কুল দেখা যায়, যেখানে ফুটবল খেলার মাঠ রয়েছে।
পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এটাই আরও গভীর চ্যালেঞ্জÑ অবকাঠামো, সংস্কৃতি এবং মানসিকতার চ্যালেঞ্জ।
‘আমরা চাই, শিশুরা যেন আর্জেন্টিনার সমর্থক হতে না চায়। তারা যেন খেলোয়াড় হতে চায়Ñ যারা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে, ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলবে,’ তিনি বলেন।










































