Home আঞ্চলিক গাছ নয় যেন বিজ্ঞাপনের খুঁটি: যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পরিবেশ ও সৌন্দর্য বিপর্যস্ত

গাছ নয় যেন বিজ্ঞাপনের খুঁটি: যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পরিবেশ ও সৌন্দর্য বিপর্যস্ত

0

জহিরুল ইসলাম, ঝিকরগাছা (যশোর) প্রতিনিধি।।

যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের ঝিকরগাছা অংশে সারিবদ্ধ শতবর্ষী ও ঐতিহ্যবাহী গাছগুলো যেন রূপ নিয়েছে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের খুঁটিতে। গাছের কান্ডে বড় বড় পেরেক ও ধাতব বস্তু ঠুকে টাঙানো হচ্ছে নানা ধরনের সাইনবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন। এতে একদিকে মহাসড়কের নান্দনিকতা ও পরিবেশগত সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পেরেক বিদ্ধ হয়ে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দীর্ঘদিনের পুরোনো এসব গাছ।

সরেজমিনে ঝিকরগাছা উপজেলা মোড়, হসপিটাল রোড, থানার মোড়, গাজীরহাটি মহিলা কলেজ মোড়, চারাতলা, গদখালী, নবীনগর ও নাভারন পুরাতন বাজারসহ মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে চরম বিশৃঙ্খলা। সড়কের দু’পাশের কড়ই, মেহগনিসহ নানা প্রজাতির গাছের কান্ডে হাতুড়ি দিয়ে পেরেক মেরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র, কোচিং সেন্টার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচারণামূলক পোস্টার-ফেস্টুন। কোথাও পুরোনো সাইনবোর্ডের ওপর নতুন ব্যানার সাঁটানো হয়েছে, আবার কোনো কোনো গাছে চার-পাঁচটি পর্যন্ত পেরেক ঠোকা। ফলে সবুজে ঘেরা ঐতিহ্যবাহী মহাসড়কটির স্বাভাবিক সৌন্দর্য এখন অনেকটাই ম্লান।

গাছের স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি:

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছের কাণ্ডে পেরেক বা ধাতব বস্তু প্রবেশ করালে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়। ওই ক্ষত দিয়ে বর্ষার পানি, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক প্রবেশ করে গাছের ভেতরে পচন ধরায়। এতে গাছের খাদ্য ও পানি চলাচলের শিরা-উপশিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে গাছগুলো দুর্বল হয়ে অকালে মরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

আইন আছে, প্রয়োগ নেই:

বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন, ২০২৬-এর ৯(১৩) ধারা অনুযায়ী বাণিজ্যিক উৎপাদন ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে গাছে পেরেক মারা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একই আইনের ১০(৩) ধারায় এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে আইন থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে এর কোনো প্রয়োগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন এলাকাবাসী।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও দায় ঠেলার চিত্র:

গাছগুলোর মালিকানা ও দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা যশোর জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার এম. এ. মনজু জানান, “গাছে পেরেক মারা যে দণ্ডনীয় অপরাধ তা আমরা জানি। কিন্তু জনবল সংকট ও ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকায় জেলা পরিষদ সরাসরি অভিযান চালাতে পারে না। উপজেলা প্রশাসন বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।”

সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (চঃদাঃ) মো. আওয়াল-উর-রহমান বলেন, “গাছগুলোর রক্ষাণাবেক্ষণের মূল দায়িত্ব জেলা পরিষদের। তবে জনস্বার্থে উপজেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিলে ভালো হয়।”

অন্যদিকে বন অধিদপ্তরের ডেপুটি রেঞ্জার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আরিফুল আলম বলেন, “গাছে পেরেক মারা দেখলে তা তুলে ফেলার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ঝিকরগাছা উপজেলা প্রশাসনের সভায় বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের তাগিদ দেওয়া হবে। এছাড়া স্থানীয় পৌরসভাও চাইলে এগুলো অপসারণ করতে পারে।”

ঝিকরগাছার নবযোগদানকৃত সহকারী কমিশনার (ভূমি), নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পৌর প্রশাসক শপথ বৈরাগী আশ্বাস দিয়ে বলেন, “আমি সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সাথে কথা বলে গাছে সাঁটানো এসব অবৈধ বিজ্ঞাপন অপসারণে দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”

মহাসড়কের পরিবেশ, নান্দনিক সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্যবাহী গাছগুলোকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে অনতিবিলম্বে সকল অবৈধ ব্যানার-ফেস্টুন উচ্ছেদ এবং পেরেক মারার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ঝিকরগাছাবাসী।