যশোর অফিস।।
পুলিশের বিশেষ অভিযানে রবিউল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। এরপর তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিএনপি দাবি করছে, তিনি বিএনপির একনিষ্ঠ কর্মী। দলের জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। অন্যদিকে, স্থানীয়রা জানিয়েছে- তিনি গত ১৭ বছর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে দাপটের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। এসব ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- রবিউল তুমি কার?
গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাত দেড়টার দিকে আটক হন যশোরের চৌগাছা উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের গুয়াতলী গ্রামের রবিউল ইসলাম (৫৫) ও একই ইউনিয়নের নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি মো. সুমন (৩৫)।
মূলত রবিউল আটকের ঘটনা ও তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েই গোটা জেলায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। স্থানীয় বিএনপির পদধারী নেতারা তাকে নিজেদের দলীয় কর্মী হিসেবে প্রত্যয়ন করায় আলোচনাটি উসকে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, রবিউল ইসলাম ২০১৩ সালে গঠিত চৌগাছার নারায়ণপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য (নম্বর ৪৬)। ২০২৪ সালে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি বিএনপিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
পুলিশ বলছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও মাদক ব্যবসায়ী-সন্ত্রাসী আটকের বিশেষ অভিযানে তাদের দুজনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে রবিউল ইসলাম নারায়ণপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য। পরদিন তাদের আদালতে চালান করা হয়।
এদিকে, রবিউল ইসলামকে বিএনপির কর্মী দাবি করে তার ছেলে মো. আলামিন চৌগাছা থানার ওসি মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে ঘুস দাবির অভিযোগ তুলে খুলনা ডিআইজি বরাবর একটি দরখাস্ত দিয়েছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, আমি এবং আমার বাবা জন্মসূত্রে বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়কালে আমাদের পরিবার নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আমরা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করায় চৌগাছা থানার ওসির নির্দেশে এএসআই কাজল, এসআই বিল্লাল, এএসআই মিকাইল, এএসআই জাকির ফোর্সসহ গত ১ অক্টোবর রাত ১.১৫ মিনিটে আমার বাবাকে বাসা থেকে ডেকে বলেন- ওসি সাহেব থানায় ডাকছেন। থানায় নিয়ে বাবার কাছে ৫ লাখ টাকা ঘুস দাবি করা হয়। অস্বীকৃতি জানালে আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে নাশকতার মামলায় চালান দেওয়া হয়।
আলামিনের ওই অভিযোগের সঙ্গে নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তরিকুল ইসলাম ডাবলু ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি এমএ সালামের লেখা দুটি প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়।
নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তরিকুল ইসলাম ডাবলু প্রত্যয়নপত্রে বলেছেন, রবিউল ইসলাম বিএনপির সক্রিয় সদস্য এবং দীর্ঘদিন ধরে দলটির সঙ্গে জড়িত।
চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি এমএ সালামের প্রত্যয়নপত্রে বলা হয়েছে, রবিউল বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং জানা মতে, তিনি দলের সক্রিয় কর্মী।
রবিউল ইসলামের ছেলে মো. আলামিনের দাবি, শুধুমাত্র বিএনপি করা ও ধানের শীষের পক্ষে ভোট করায় তিনি ও তার বাবাকে পুলিশ হয়রানি করছে। কেননা এই ওসি নিজে ছাত্রলীগ করতেন। ২০১১ সালে সাব-ইন্সপেক্টর পদে চাকরিতে জয়েনকালে তিনি ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং তার পরিবার আওয়ামী সমর্থিত।
তার দাবি, আটকের পর তিনি ও তার মা ওসি সাহেবের কাছে গেলে তিনি ৫ লাখ টাকা ঘুস দাবি করেন। টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু অস্বীকৃতি জানানোয় তার বাবাকে নাশকতা মামলায় চালান দেওয়া হয়েছে।
রবিউল ইসলামের চাচাতো ভাই মো. আতিকুর রহমান লেন্টু বলেন, আমার ভাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিষয়টি ইউনিয়ন বিএনপি ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি প্রত্যয়ন করেছেন।
তার ভাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে কে বা কারা বিএনপি করতো? সব ধরে ধরে মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে। তিনি তার ভাইয়ের আওয়ামী লীগের সদস্য তালিকাকে ভুয়া বলে দাবি করেন।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নারায়ণপুর এলাকার একজন রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি জানান, ১৭ বছর আগে রবিউল বিএনপি সমর্থক ছিলেন। পরে আওয়ামী আমলে তিনি নারায়ণপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন মুকুলের ডান হাত ছিলেন। নৌকাকে বিজয়ী করতে তিনি সেসময় অনেক কাজ করেছেন। ২০২৪ সালে পটপরিবর্তনে তিনি ফের বিএনপি হয়ে যান।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ২০২৪ সালের ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য জানান, ২০১৩ সালের ১৫ নভেম্বর গঠিত ইউনিয়ন কমিটির ৪৬ নম্বর সদস্য ছিলেন রবিউল ইসলাম। ২০২৪ সালে ৯ সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। সেখানে অবশ্য, রবিউল ইসলামের নাম নেই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চৌগাছা থানার ওসি মামুনুর রশিদ বলেন, রবিউল আওয়ামী লীগের কমিটির সদস্য। তাকে বিশেষ অভিযানে আটক করে আইন অনুযায়ী আদালতে চালান দেওয়া হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে ঘুস দাবি ও বিএনপির কর্মীকে আওয়ামী লীগের নেতা সাজিয়ে মামলা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি বলেন, আমার সঙ্গে আসামির কোনো আত্মীয়-স্বজনের দেখা হয়নি। কার কাছে টাকা চাইবো? টাকা চাওয়ার বিষয়টি তো একা একা সম্ভব নয়; কাউকে আমার কাছে আসতে হবে। বিষয়টি আমার ঊর্ধ্বতনকে জানিয়েছি।
তিনি বলেন, অবশ্য দুজন আমাকে ফোন করেছিলেন। একজন হলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি সালাম এবং অপরজন আতিকুর রহমান লেন্টু, যিনি সার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও মাদক-সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িতদের আটকের এই অভিযানে কাউকেই আমি ছেড়ে দিতে পারি না।










































