আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের জাতীয় গড় দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার জ্বালানির মূল্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডির তথ্য অনুযায়ী, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার কারণে সরবরাহ সংকুচিত হওয়ায় ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
বিশ্বের সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে ট্রাক, ট্রেন, জাহাজ ও ভারী যন্ত্রপাতিতে ডিজেল গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি চালাতেও এর ব্যাপক প্রয়োজন রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও পড়তে পারে।
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। চলতি বছর এমনিতেই উচ্চ ব্যয়ের কারণে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা চাপে রয়েছেন। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে বিষয়টি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের জন্য রাজনৈতিকভাবেও নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে।
তেলের দামই সাধারণত জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০৭ দশমিক ৬৩ ডলারে এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ১০২ দশমিক ৪৮ ডলারে স্থির হয়।
গ্যাসবাডির বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ‘প্রতিটি ট্রাক, প্রতিটি পণ্য পরিবহন, প্রতিটি প্যাকেজ এবং প্রতিটি বাজারসদাই এখন আরও ব্যয়বহুল হয়ে গেল।’ তার মতে, রেকর্ড ডিজেলের দাম পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে ব্যয় বাড়িয়ে আবারও মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে।
কানসাসভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওসিস এনার্জির জ্বালানি পরিচালক অ্যালেক্স রায়ান বলেন, পাঁচ মাসের মধ্যে ডিজেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এতে তাদের নগদ অর্থপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষকরাও জ্বালানির বাড়তি দামে উদ্বিগ্ন। কৃষি ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হাইলিওর প্রধান নির্বাহী আর্থার এরিকসন বলেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ফসলের দাম কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক ও খামারি আগে থেকেই আর্থিক চাপে রয়েছেন। নতুন করে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের তেল শোধন সক্ষমতা বাড়ানো এবং জ্বালানির ব্যয় কমানোর দিকে নজর দিচ্ছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স বলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকলে তেল ও গ্যাসের দাম কমবে বলে প্রশাসন আশা করছে।
তবে সাম্প্রতিক এক রয়টার্স-ইপসোস জরিপে জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় কোন দলের নীতি বেশি কার্যকর এ প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের চেয়ে ৮ পয়েন্ট এগিয়ে ছিল। ট্রাম্পও বুধবার স্বীকার করেছেন, তেলের দাম বৃদ্ধির চাপ থেকে স্বস্তি নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে নাও আসতে পারে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। সংঘাতের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
এর পাশাপাশি ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার বন্ধ থাকায় দেশটির ডিজেল রপ্তানিতেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। চীনের জ্বালানি রপ্তানিতে বিধিনিষেধও বৈশ্বিক ডিজেলের সরবরাহ আরও সংকুচিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মজুতও স্বাভাবিকের তুলনায় কম। দেশটির জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাবে, ডিজেলের মজুত পাঁচ বছরের গড়ের চেয়ে ১৩ শতাংশ কম, বর্তমানে যা ১০ কোটি ৬৩ লাখ ব্যারেল। গত সপ্তাহে শোধনাগারগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় পরিচালিত হওয়ায় মজুত কিছুটা বেড়েছে।
তবে সামনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এলএসইজি-র তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল পরিশোধন মুনাফার সূচক রেকর্ড ১১২ দশমিক ১৭ ডলারে উঠেছে। একই সময়ে বছরের এই সময়ের তুলনায় দেশটির পরিশোধিত জ্বালানির মজুত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে।
র্যাপিডান এনার্জির পরিশোধিত পণ্য বিভাগের পরিচালক লিন্ডা গিসেকে বলেন, শোধনাগারগুলো উচ্চ সক্ষমতায় চললেও আগামী দুই মাসে মৌসুমি রক্ষণাবেক্ষণ শুরু হওয়ায় ডিজেলের মজুত পুনর্গঠন করা কঠিন হবে। বৈশ্বিক ডিজেল সরবরাহও সংকুচিত থাকায় আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত ডিজেলের মুনাফা ও দাম উচ্চ এবং অস্থির থাকার আশঙ্কা রয়েছে।










































