স্টাফ রিপোর্টার
খুলনাসহ দক্ষিনাঞ্চলের আলোচিত সমালোচিত দরবেশ নামে পরিচিত এস এম মুশফিকুর রহমান আবারো জাতীয় পার্টিতে। শনিবার দুপুরে বনানীস্থ কার্যালয়ের মিলনায়তনে যশোর জেলা জাতীয় পার্টি সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সভায় উপস্থিতি এবং বক্তব্য রাখার মধ্যদিয়ে তিনি আবারো তার অবস্থান জানান দিলেন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের এমপি ও মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু উপস্থিত ছিলেন এ সময়ে।
গল্পটি ২০১৭ সালের। খুলনা জুড়ে একটি আলোচিত নাম ছিলো দরবেশ। হঠাৎ করে তার ডাকে সাড়া দিয়ে খুলনায় আসেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিন ঘণ্টার ঝটিকা সফরে হেলিকপ্টারে খুলনায় দলীয় প্রধান এবং দরবেশকে কেক কেটে খাইয়ে মিডিয়ার সামনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেন।
কিন্তু তার আসার আগের রাতে জাতীয় পার্টি খুলনা মহানগর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ নগরীর ৫ থানার অধিকাংশ ক্ষুব্ধ নেতাকর্মী দল ত্যাগ করেন। দলীয় প্রধানের অভিনব এই কেক কাটা অনুষ্ঠান বর্জন করেন মহানগর জাপা নেতাকর্মীরা। দরবেশ এসএম মুশফিকুর রহমানকে এরশাদ মেয়র প্রার্থী ঘোষণা দেয়ায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় খুলনা জাতীয় পার্টি।

দলের একসময়কার শীর্ষ নেতা, খুলনা মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবুল শেখ কাশেম হত্যা মামলার আসামি হয়েও দলে প্রবেশ করায় গণপদত্যাগ করেছেন নেতাকর্মীরা। তার কারণে যারা দল ত্যাগ করেছেন তাদের আর দলে প্রবেশ করতে দেবেন না- এমন ঘোষণাও দিয়েছেন এসএম মুশফিকুর রহমান ওরফে দরবেশ। খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকার ভোটার না হয়েও মেয়র প্রার্থী ঘোষণা দেয়ার রহস্য খুঁজছিলেন ওই সময়ে অনেকে।

সূত্র জানায়, ১৯৯৫ সালের ২৫শে এপ্রিল সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন তৎকালীন মহানগর জাপার সাধারণ সম্পাদক শেখ আবুল কাশেম। ওইদিন নগরীর ব্যস্ততম পিকচার প্যালেস মোড় এলাকায় দিনদুপুরে শেখ আবুল কাশেমকে প্রকাশ্যে গুলি করা হয়। তখন নগরজুড়ে মানুষের মুখে মুখে শোনা যায় মুশফিকের গুলিতেই কাশেম নিহত হয়। সেই হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হন এসএম মুশফিকুর রহমান। এরপর তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান। দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করায় খুলনার মানুষ প্রায়ই তাকে ভুলতে বসেছিলেন।
আলোচিত দরবেশ মুশফিক একসময় ছিলেন খুলনা আর্ট কলেজের ছাত্র। ছাত্রদলের ব্যানারে নির্বাচিত হয়েছিলেন জিএস। বেশ কিছুদিন ভাস্কর্যশিল্পী হিসেবে ছিলেন পরিচিত। লম্বা চুল ঘাড়ে ব্যাগ নিয়ে যাযাবরের মতো চলাফেরা করতেন। কাশেম হত্যাকাণ্ডের পর রং তুলি ছেড়ে চলে যায় পর্দার অন্তরালে। আবার দুই দশক পরে লম্বা জুব্বা, মাথায় পাগড়ি, মুখে লম্বা দাড়ি রেখে দরবেশ বেশে ভয়ঙ্কর এই সন্ত্রাসী ফিরে আসে জনসম্মুখে।
জাতীয়পার্টিতে যোগদানের আগে তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির রাজনীতি করার কারণে ২০০৭ সালের উপনির্বাচনে বাগেরহাট-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। তখনও খুব বেশি আলোচনায় আসতে পারেননি তিনি। জনশ্রুতি রয়েছে, সে সময় তিনি বাগেরহাট সদর আসনের সংসদ সদস্য এমএইচ সেলিম (সিলভার সেলিমের) ছত্রছায়ায় রাজনীতি করতেন। এরপর ২০১৭ সালের ২৪শে জানুয়ারি তিনি ঢাকায় এরশাদের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন। আর তাতেই জাতীয় পার্টির খুলনার নেতাকর্মীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এমনকি তারা দল ত্যাগের কথাও জানিয়ে দেন হাইকমান্ডকে। তবে খুলনার নেতাকর্মীদের সকল চাপ ও মতামত উপেক্ষা করে পার্টির চেয়ারম্যান আলোচিত এই দরবেশকে দলে নেয়ায় নেতাকর্মীদের মাঝে দল-ত্যাগের হিড়িক পড়ে যায়। এদিকে মুশফিকুর রহমান জাতীয়তাবাদীর রাজনীতি ছেড়ে জাতীয় পার্টিতে যোগদান এবং খুলনার মেয়র প্রার্থী হওয়ার সেই রহস্য রয়ে গেছে আজও অনুদঘাটিত।

খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে মাত্র ১ হাজার ৭২ ভোট পেয়ে জাতীয় পার্টির সঙ্গে নিজেও ডুবিয়েছিলেন। দলের বিপর্যয়ের কারণে গত ১৭ মে তাকে জাতীয় পার্টি থেকে বহিস্কার করা হয়েছিলো।
এসএম মুশফিকুর রহমান জানান, তিনি কখনো কারো ছত্রছায়ায় ছিলেন না। তার কাছে জাতীয় পার্টির রাজনীতি ভালো লেগেছে তাই তিনি যোগ দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, যারা দল ত্যাগ করেছে তাদের আর ফিরিয়ে আনা হবে না। কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এদের মধ্যে উৎপাদনশীলতা বলতে কিছু নেই। নতুন নেতৃত্ব এলে দল চাঙ্গা হয়। জনবল বৃদ্ধি হয়। কাশেম হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মামলাটি এখনো বিচারাধীন। আসামি হলেই কেউ দোষী হয় না।










































