স্পোর্টস ডেস্ক।।
উত্তর আমেরিকায় যখন জাঁকজমকপূর্ণ ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালের প্রস্তুতি চলছে, তখন ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় ঘটে গেল এক অভাবনীয় দৃশ্য। ইসরায়েলি হামলায় টিকে যাওয়া ফুটবলারদের নিয়ে গত বৃহস্পতিবার সেখানে একটি প্রতীকী সিক্স-এ-সাইড বিশ্বকাপ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।
ধ্বংসস্তূপের মাঝে সবুজ ঘাসের সেই মাঠের দৃশ্যটি যেন কোনো যুদ্ধভিত্তিক সিনেমার রূপালি পর্দা থেকে উঠে আসা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামলা শুরু হওয়ার পর গাজা থেকে লাইভ স্ট্রিম করা প্রথম ফুটবল ম্যাচ ছিল এটি।
ম্যাচটিতে মুখোমুখি হওয়া এক দলের গায়ে ছিল ফিলিস্তিনের জাতীয় রঙ এবং অন্য দলটির গায়ে ছিল স্পেনের জার্সি। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্পেনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সমর্থনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই গাজার আকাশে ফিলিস্তিনি পতাকার পাশাপাশি উড়ছিল স্পেনের পতাকা।
এই প্রতীকী ম্যাচই প্রমাণ করে, রোববারের ফাইনালে স্পেনের পক্ষে এই যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের কতটা আবেগ ও অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে। একই সঙ্গে এটি ফিফার জুরিখ সদর দপ্তরের বন্ধ দরজার পেছনে লেখা ‘ফুটবলকে রাজনীতিমুক্ত রাখার’ নিয়মের অসারতাও প্রমাণ করে।
ফিফা প্রেসিডেন্ট জান্নি ইনফান্তিনোর অস্বস্তি বাড়িয়ে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনালে মুখোমুখি হওয়া দেশ দুটি রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেস যেখানে ইউরোপে ফিলিস্তিনের অধিকার, অন্তর্ভুক্তি ও বামপন্থী মতাদর্শের সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠস্বর; ঠিক তার বিপরীতে আর্জেন্টিনার প্রধানমন্ত্রী হাভিয়ের মিলেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম কট্টর সমর্থক।
ডানপন্থী রক্ষণশীল নেতা মিলেইয়ের একটি বিখ্যাত উক্তি হলো, ‘বিশ্বে একমাত্র যে বামটি (বামপন্থী) কাজ করে, সেটি হলো মেসির বাম পা।’ তিনি সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার ঘোর বিরোধী, কট্টর ইসরায়েল সমর্থক এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
আর্জেন্টিনার এই উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক হাওয়া ফুটবল মাঠেও প্রভাব ফেলেছে। এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন ইনফ্লুয়েন্সারকে (আইশোস্পিড নামে পরিচিত) বর্ণবাদী গালি দেওয়া এবং মিশরের সমর্থকদের ওপর বিয়ার ছুড়ে মারার মতো অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ২০২২ সালের বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের কিছু খেলোয়াড় কাতারেই বাসের ভেতর বর্ণবাদী গান গেয়েছিলেন।
ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর প্রহসন হলো, যে স্পেন একসময় লাতিন আমেরিকাকে উপনিবেশ বানিয়ে সেখানকার আদিবাসীদের উচ্ছেদ করেছিল, আজ সেই স্পেনের শাসকরা বহুত্ববাদ ও সমাজতন্ত্রের কথা বলছে; আর তাদের একসময়ের উপনিবেশ আর্জেন্টিনায় ক্ষমতায় রয়েছে মিলেইয়ের উগ্র ডানপন্থী সরকার। এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দেশের মধ্যে আর্জেন্টিনাই একমাত্র দল, যাদের স্কোয়াডের সব খেলোয়াড়ই শ্বেতাঙ্গ। অন্যদিকে, স্পেনের দলে রয়েছেন লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের মতো অভিবাসী বংশোদ্ভূত ফুটবলার, যারা পেদ্রি ও ফেরান তোরেসের মতো জাতিগত স্প্যানিশদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খেলছেন।
দিয়েগো ম্যারাডোনা যেখানে ফুটবল ইতিহাসের মহানায়ক হওয়ার পাশাপাশি শরীরে চে গুয়েভারার ট্যাটু নিয়ে রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার ছিলেন, সেখানে আধুনিক ফুটবলের মহানায়ক লিওনেল মেসি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফ্রেমবন্দী হতেও তার কোনো দ্বিধা নেই। বিপরীতে, স্পেনের ১৯ বছর বয়সী তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল বার্সেলোনার বিজয় প্যারেডে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধাবস্থার প্রভাবে ২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিমধ্যেই রাজনীতিতে কলঙ্কিত। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান দলকে তাদের বেস ক্যাম্প করতে হয়েছে মেক্সিকোতে এবং ম্যাচের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এছাড়া, আফ্রিকার বর্ষসেরা রেফারি, সোমালিয়ার ওমর আরতানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে টুর্নামেন্ট পরিচালনা করতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকারই দেওয়া হয়নি।
তাই লা রোজাদের (স্পেন) সঙ্গে আলবিসেলেস্তেদের (আর্জেন্টিনা) এই লড়াইয়ে মাঠের ফুটবলের চেয়ে রাজনীতির সুরই বেশি চড়া। স্পেনের জয় হলে দূর গাজার আকাশে স্প্যানিশ পতাকা আনন্দের প্রতীক হয়ে উড়বে। আর আর্জেন্টিনা জিতলে তা কেবল মেসি ভক্তদের জন্যই উপহার হবে না, বরং উল্লাসে মাতবেন ডানপন্থার সবচেয়ে বড় তিন আইকন; মিলেই, ট্রাম্প এবং আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন জানানো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।











































