কেএমপির সংবাদ সম্মেলনে লোমহর্ষক তথ্য প্রকাশ, ঘাতক পিতা আকাশ মাদকাসক্ত ও টিকটকার; গ্রেপ্তার মা কারাগারে
স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনা মহানগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া দশম শ্রেণির স্কুলছাত্রী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৭) হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক ও নৃশংস বিবরণ প্রকাশ করেছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পারিবারিক কলহের জেরে নিজের জন্মদাতা পিতার কাঠের লাঠির আঘাতেই মাথায় গুরুতর জখম ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যায় ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই ছাত্রী। পরবর্তীতে ঘটনা ধামাচাপা দিতে পিতা-মাতা মিলে লাশ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে ছেঁড়া লুঙ্গি দিয়ে পেঁচিয়ে মোটরসাইকেলে করে নিরালা এলাকায় ফেলে আসেন।
শনিবার (১১জুলাই) সকালে কেএমপি সদর দপ্তরে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান। এ সময় ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমানসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

যেভাবে ঘটে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড: সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার জানান, নিহত নির্জনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে চরম বিরোধ চলছিল। গত বুধবার (৮ জুলাই) বিকেলে নির্জনার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের এই নিয়ে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা তাকে চড় মারেন। ঘরের ভেতরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে বাবা মো. আলিম হোসেন আকাশ সেখানে গিয়ে একটি কাঠের লাঠি দিয়ে নির্জনার মাথার পেছনে সজোরে আঘাত করেন। এতে মাথায় গুরুতর জখম হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই নির্জনার মৃত্যু হয়।
মেয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে আইনি জটিলতা ও লোকলজ্জা থেকে বাঁচতে ঘাতক পিতা-মাতা মিলে ঘরেই লাশ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরেন। এরপর রাতের আঁধারে মোটরসাইকেলে করে লাশটি বহন করে নিয়ে নগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কে ফেলে রেখে দুই জনেই আত্মগোপন করেন। গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে স্থানীয়দের খবরে পুলিশ বস্তাবন্দী রক্তাক্ত মরদেহটি উদ্ধার করে।

নাটক সাজিয়েও পার পাননি ঘাতক মা, বাবা এখনো পলাতক: তদন্তের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিহত ছাত্রীর পরিচয় শনাক্তের পর মা আরিফা ইয়াসমিন সীমাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রথম দিকে তিনি মেয়ের ২টি বিয়ে ও প্রেমিকের ওপর দোষ চাপিয়ে সাংবাদিকদের কাছে বিভ্রান্তিকর নাটক সাজালেও, পুলিশের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে শেষ পর্যন্ত নিজের ও স্বামীর সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। শুক্রবার (১০ জুলাই) বিকেলে খুলনা সিএমএম আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডের পুরো দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন তিনি। জবানবন্দি শেষে আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। তবে প্রধান অভিযুক্ত ঘাতক পিতা আলিম হোসেন আকাশ এখনো পলাতক রয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা: পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঘটনার পর পলাতক বাবা আলিম হোসেন আকাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে একটি ভুয়া চিঠি প্রকাশ করে দাবি করেন— নির্জনা স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। এমনকি, যেদিন রাতে নির্জনার মরদেহ উদ্ধার হয়, সেদিনই তার ফেসবুক আইডি থেকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়া হয়, যেখানে লেখা ছিল, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কোনো পরিকল্পনা আছে, সকল কষ্ট এবং দুঃখে আলহামদুলিল্লাহ।’ পুলিশ ধারণা করছে, আলামত ও তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই খুনিরা এই ছক কষেছিল।
মাদকাসক্ত ও নিয়মিত টিকটকার ছিলেন পিতা আকাশ: অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘাতক আলীম হোসেন আকাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন নিয়মিত ‘টিকটকার’ হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। তিনি নিজের স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বিভিন্ন টিকটক ভিডিও তৈরি করে নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করতেন। নিজেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবসায়ী দাবি করলেও পুলিশ নিশ্চিত করেছে, আকাশ মূলত একজন চরম মাদকাসক্ত ব্যক্তি।
কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানান, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ চৌকস দল ঘাতক পিতাকে গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। খুব দ্রুতই তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।









































