Home আঞ্চলিক কেশবপুরে খেজুর রসের সন্ধানে গাছ তুলতে ব্যস্ত গাছিরা

কেশবপুরে খেজুর রসের সন্ধানে গাছ তুলতে ব্যস্ত গাছিরা

21

আলমগীর হোসেন, কেশবপুর প্রতিনিধিঃ

শীত মৌসুম আসলেই কেশবপুরে গাছিরা খেজুর রসের সন্ধানে গাছ তুলতে বা গাছ কাঁটতে ব্যাস্ত হয়ে পড়েন। আগের মতো খেজুর গাছ এখন আর নেই। ইটভাঁটিতে খেজুর গাছ পোড়ানো ও জলাবদ্ধতায়সহ নানা কারনে খেজুর গাছ দিনে দিনে কমে গেছে। সে কারণে খেজুরের রস ও গুড় এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। পেশাদার গাছির সংখ্যাও কমছে। তারপরও খেজুর রসের গুড় দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি হয় বলে গাছিরা জানিয়েছেন। খেজুর রস সংগ্রহের জন্য এখন কেশবপুরের সর্বত্র গাছিরা প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গাছ কাঁটার কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার কড়ছেন।

এ বছর মৌশুমের শুরুতে খেজুর রস আহরণ এবং নির্ভেজাল গুড় তৈরী এবং সেটা বাজারজাত করার জন্য শেখ হাসিনা সফটওয়ার টেকনোলজি পার্ক যশোরের কেনাকাটা ডট কম কেশবপুরের সাতবাড়িয়া ও ত্রিমোহিনী ইউনিয়নের ৭০জন খেজুর গাছিদের প্রশিক্ষণ ও খেজুর গাছ থেকে রস আহরণের উপকরণ দিয়েছে। কেনাকাটা ডট কম এই চাষীদের কাছ থেকে সরাসরি খেজুর গুড় কিনে তা বাজারজাত করবে।

কেশবপুর উপজেলার ভালুকঘর, মূলগ্রাম, বেলকাটি, সাগড়দাঁড়ি, ফতেপুর, চিংড়া, হাসানপুর, ধর্মপুর, আওয়ালগাতি, ভান্ডারখোলা, চাঁদড়া, দেউলি, বাগদাহ, সাবদিয়া, মজিদপুর, মধ্যকুল, ব্রহ্মকাটি, রামচন্দ্রপুর, ব্যাসডাঙ্গা, পাঁজিয়া, গড়ভাঙ্গা, কলাগাছি, গৌরিঘোনা, ভেরচি, মাগুরখালি, মঙ্গলকোট, বড়েঙ্গা, কন্দর্পপুর, পাথরা, কেদারপুরসহ অনেক গ্রামে গাছিরা খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন ঠিলে, খুংগি, দড়া, গাছি দাঁ, বালিধরাসহ খেজুর গাছ কাঁটার কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন গাছিরা।

শ্রমজীবি গাছিরা জানান, প্রতি বছরে খেজুর গাছ কেটে ফেলার কারণে রস ও গুড়ের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক গাছের মালিকরা খেজুর গাছ কেটে ইটভাঁটায় বিক্রয় করে ফেলেছেন।

খেজুর গাছের মালিকরা জানান, আগের মতো পেশাদার গাছি (শ্রমিক) এখন নেই। অনেকে বৃদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। সারা গ্রামে এখন একজন গাছিও পাওয়া যায় না। সেজন্য একজন শ্রমিককে খেজুর গাছ তুলতে প্রায় ৩ থেকে ৫ শত টাকা করে দিতে হয়। গাছের পরিমান ও গাছির সংখ্যা কমে যাওয়া খেজুর রস ও গুড়ের দাম ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া আগে প্রতিটি গাছে এক কাটায় এক ভাড় করে রস হতো। কিন্তু এখন এর অর্ধেক রস হচ্ছে। এ্যালমুনিয়ামের কড়াইতে রস জালিয়ে গুড় তৈরী করতে সকাল থেকে দুপর পর্যন্ত সময় লাগে। জিরেন রস দিয়ে দানাগুড়, ছিন্নি গুলা, পাটালী তৈরী করা হয়। আর ঘোলা রস (যে রস পরেরদিন হয়) দিয়ে তৈরী হয় ঝুলা (তরল) গুড়। নলেন রসের পাটালী খেতে খুবই সুস্বাদু হয় বলে বাজারে কদর অনেক বেশী এই নলেন গুড়ের।

কেশবপুর তথা যশোরে খেজুরের রসের খ্যাতি বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।

সচেতন মহল বলেছেন সরকারি সড়কের দু’পাশে যদি পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ লাগানো হয় তাহলে প্রতিবছর খেজুর গুড় বিক্রি করে সরকার প্রচুর টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে। আর এতে “যশোরের যশ খেজুরের রস” সেই ঐতিয্য ধরে রাখা সম্ভব হবে।

উপজেলা কৃষি অফিসার মহাদেব সানা জানান, কেশবপুরের খেজুর গাছ বৃদ্ধি করার জন্য তারা প্রতি বছর উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও নদীর পাড়ে খেজুরের বীজ বপন করে আসছেন। বর্তমানে কেশবপুরের প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ গাছ থেকে রস আহরণ করা হয়। আর গোটা উপজেলায় প্রায় ১৫’শ গাছি খেজুর রস আহরণ করেন।

ঐতিয্যবাহী কেশবপুরের খেজুর গুড় বাজারজাত করতে সোমবার কেশবপুরের ত্রিমোহিনী ও সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের ৭০জন খেজুর গাছিকে যশোর শেখ হাসিনা সফটওয়ার টেকনোলজি পার্কের কেনাকাটা ডট কম এক প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। এ সকল গাছির কাছ থেকে তারা ভেজালমুক্ত গুড় তৈরী করিয়ে তা বাজারজাত করবে। এজন্য প্রশিক্ষণ শেষে তাদের গাছ কাটার উপকরণও দেয়া হয়েছে।

কৃষি বিভাগের এল জি এস পি থ্রি এর আওতায় ত্রিমোহিনী ইউনিয়নস্থ কৃষি ভবনে অনুষ্ঠিত গাছি প্রশিক্ষণ ও উপকরণ বিতরণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান।

প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক মোঃ তমিজুল ইসলাম খান। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, যশোর স্থানীয় সরকারের উপ পরিচালক মোঃ হুসাইন শওকত, যশোর কৃষি অধিদপ্তরের উপ পরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মহাদেব চন্দ্র সানা প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কেনাহাট ডট কম এর নাহিদুল ইসলাম।

আয়োজকরা জানান, উপজেলার দুটি ইউনিয়নের ৭০ জন গাছিকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভেজালমুক্ত খেজুর গুড় তৈরী করার উপর গুরুত্বারোপ করার পাশাপাশি গাছিরা যাতে ন্যায্য মূল্য পায় তার সুব্যবস্থা করা। গাছি নারায়ন চন্দ্র নাজমুল, আনসার আলী, আব্দুল কাদের জানান, কেনা কাটা ডট কম এ ধরণের আয়োজন করায় তারা খুশি এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা নিরাপদ রস আহরণ ও গুড় তৈরীতে সক্ষম হবেন।