Home Lead কেসিসিতে চাকরি বাণিজ্য: কোটি টাকা লুটে অবসরের চেষ্টা প্রধান সহকারীর!

কেসিসিতে চাকরি বাণিজ্য: কোটি টাকা লুটে অবসরের চেষ্টা প্রধান সহকারীর!

136

শামিম শিকদার।।


খুলনা সিটি করপোরেশনে (কেসিসি) নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিকে পুঁজি করে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক ভয়াবহ জালিয়াতির খবর পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের সর্বস্বান্ত করে বিপুল অংকের এই অবৈধ অর্থ পকেটে পুরে এবার সব ধরনের সরকারি আর্থিক সুবিধা নিয়ে নির্বিঘ্নে সটকে পড়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন মূল অভিযুক্ত ও করপোরেশনের প্রশাসনিক শাখার প্রধান সহকারী মো. নাঈমুজ্জামান।

তার বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ও কেসিসির নিজস্ব তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা মেলার পর, চলতি সপ্তাহেই তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

পেনশনের টাকাও রেহাই পায়নি নাঈমের খপ্পর থেকে: অনুসন্ধানে জানা যায়, কেসিসির শূন্য পদে স্থায়ী ও অস্থায়ী নিয়োগকে কেন্দ্র করে ১০ থেকে ১২ জন চাকরিপ্রত্যাশীকে টার্গেট করেন নাঈমুজ্জামান। কাউকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, কাউকে আবার উচ্চমান সহকারী পদের লোভ দেখিয়ে জনপ্রতি ৭০ হাজার থেকে শুরু করে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেন তিনি।

তার পাতা ফাঁদের অন্যতম নির্মম শিকার কেসিসিরই অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ভারতী মণ্ডল। নিজের ছেলে জয়ন্ত মণ্ডলের স্থায়ী চাকরির আশায় সারা জীবনের উপার্জিত পেনশনের পুরো ১৮ লাখ টাকাই তুলে দিয়েছিলেন সহকর্মী নাঈমুজ্জামানের হাতে। একইভাবে উচ্চমান সহকারী পদের জন্য নিজের শেষ সম্বল জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে ১৭ লাখ টাকা দিয়েছিলেন মো. শাহাদাৎ হোসেন নামের এক ভুক্তভোগী।

চাকরি তো দূরের কথা, টাকা ফেরত চাইলে বাউন্স হওয়া বা ভুয়া চেক দিয়ে দিনের পর দিন ঘোরানো হয়েছে ভুক্তভোগীদের। শাহাদাৎ হোসেনকে দেওয়া জনতা ব্যাংক ও ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মোট ১৭ লাখ টাকার দুটি চেকই ইতিমধ্যে ব্যাংক থেকে ডিজঅনার হয়েছে। আরেক ভুক্তভোগী সিরাজুল ইসলামের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে এখন অফিসে আসাই বন্ধ করে দিয়েছেন এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা।

বাঁচতে ‘স্বেচ্ছায় অবসর’ ও আর্থিক সুবিধার চাতুর্য: চাকরিপ্রত্যাশীদের কান্নায় যখন পরিস্থিতি উত্তপ্ত, তখন অপরাধ আড়াল করতে এবং আইনি জটিলতা থেকে বাঁচতে গত জুন মাসে চতুরতার আশ্রয় নেন নাঈমুজ্জামান। নিজেকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে তিনি তড়িঘড়ি করে ‘স্বেচ্ছায় অবসরের’ (ভিআরএস) আবেদন জমা দেন। শুধু তাই নয়, কোটি টাকা লোপাটের পরও নির্লজ্জের মতো সরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটিসহ সব ধরনের আর্থিক সুবিধা দাবি করেছেন তিনি।

এমনকি কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরের সিএ (গোপনীয় সহকারী) মিজানুর রহমানের এক আত্মীয়ও রেহাই পাননি নাঈমের হাত থেকে। তার কাছ থেকেও সাড়ে ৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বহু তাগাদা ও কৌশলে উদ্ধার করা হয়।

গা ঢাকা দিয়েছেন অভিযুক্ত, চলতি সপ্তাহেই বিভাগীয় মামলা: বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলে ভুক্তভোগী ভারতী মণ্ডল আদালতে মামলা দায়ের করেন। পাশাপাশি মো. খোরশেদ আলম, মো. শাহাদাৎ হোসেন ও মো. সিরাজুল ইসলামসহ চারজন ভুক্তভোগী কেসিসি কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন।

এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ড. পেরু গোপাল বিশ্বাস। তবে কেসিসির সচিব মো. রেজা রশীদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কঠোর বার্তা দিয়েছেন।

তিনি জানান, “নাঈমুজ্জামানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করা হয়েছে এবং চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে টাকা নেওয়ার প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। তার বিরুদ্ধে চলতি সপ্তাহেই বিভাগীয় মামলা করা হচ্ছে। এই গুরুতর অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার অবসরের আবেদন বা কোনো আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। তদন্ত অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বর্তমানে অভিযুক্ত মো. নাঈমুজ্জামান মুঠোফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে রয়েছেন। কেসিসির মতো একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে এমন প্রকাশ্য ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ কীভাবে চলল, তা নিয়ে এখন নগরজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু বিভাগীয় মামলা নয়, দ্রুত এই প্রতারককে গ্রেফতার করে তাদের আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধার করা হোক।