স্টাফ রিপোর্টার।।
২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। তবে পরীক্ষার প্রাক্কালে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এক চিত্র। একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবার পরীক্ষার জন্য ফরমই পূরণ করেনি। অন্যদিকে এবার পরীক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে খাতা পুনর্মূল্যায়ন, পরীক্ষক পর্যবেক্ষণ এবং নতুন পাবলিক পরীক্ষা আইনের আওতায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
গতকাল বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে জানানো হয়, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে
নিবন্ধিত ছিল ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ফরম পূরণ করেছে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন। অর্থাৎ ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য ফরম পূরণ করেনি, যা মোট নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে আলিম প্রথম বর্ষে নিবন্ধিত ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে ফরম পূরণ করেনি ৬১ হাজার ৬৬০ জন, যা ৪৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ভোকেশনাল শাখায় নিবন্ধিত ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ফরম পূরণ করেনি ৯০ হাজার ৩৪৫ জন। এ হার ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা তিন ধারার মধ্যে সর্বোচ্চ।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, পরীক্ষকদের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং তারা যথাযথভাবে খাতা মূল্যায়ন করছেন কিনা তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। তিনি বলেন, আগে একজন পরীক্ষকের কাছে অস্বাভাবিক সংখ্যক খাতা দেওয়া হতো। এখন সেই চাপ কমানো হয়েছে। আমরা র্যান্ডম স্যাম্পলিংয়ের মাধ্যমে খাতা মূল্যায়নের মান যাচাই করব। তিনি জানান, নতুন আইনি কাঠামোর আওতায় প্রয়োজন হলে খাতা পুনর্মূল্যায়নেরও সুযোগ রাখা হয়েছে। এমনকি ফলাফল নিয়ে অসন্তুষ্ট শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে ট্যাবুলেশন শিটের পাশাপাশি উত্তরপত্রও যাচাই করার সুযোগ পেতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সরকার সমন্বিত উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, এইচএসসির ফল প্রকাশের পর ভর্তি কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ভর্তি প্রক্রিয়া শুরুর আগেই এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
পরীক্ষা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য বা গুজব ছড়ালে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারি দেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্বে অবহেলা কিংবা ভুল প্রশ্ন বিতরণের মতো ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ও থাকবে।
এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন, মাদ্রাসা বোর্ডে ৯২ হাজার ৯০৫ জন এবং কারিগরি বোর্ডে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে।
সারাদেশে ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে ৯ হাজার ৪৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেবে। মোট ৭৭টি বিষয়ে ২১ দিনে পরীক্ষা সম্পন্ন হবে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
যশোর প্রতিনিধি জানান, আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া চলতি ২০২৬ সালে যশোর বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষায় বসতে যাচ্ছে ১ লাখ ৪৩ হাজার পরীক্ষার্থীÑ যা গত ১০ বছরের রেকর্ডে সর্বাধিক। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২০১৭ সালে ৯৫ হাজার ৬৯২ জন, ২০১৮ সালে ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৮৫ জন, ২০১৯ সালে ১ লাখ ২৬ হাজার ২২৯ জন, ২০২০ সালে ১ লাখ ২১ হাজার ৫২৮ জন, ২০২১ সালে ১ লাখ ২৮ হাজার ১৬৩ জন, ২০২২ সালে ৯৮ হাজার ২৬৯ জন, ২০২৩ সালে ১ লাখ ১০ হাজার ২৪৫ জন, ২০২৪ সালে ১ লাখ ২২ হাজার ৫১১ জন, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৩০ হাজার ৮শ জন। এবার ২০২৬ সালে ১ লাখ ৪৩ হাজার জন এইচএসসি পরীক্ষায় বসছেন।
বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, করোনাকালে নিয়মিত ক্লাস না চলায় ২০২২ ও ২০২৩ সালে পরীক্ষার্থী আশঙ্কাজনকহারে কমে যায়। এ ছাড়া অন্য কোনো কারণ আছে কিনা তা অনুসন্ধানে কাজ করে বোর্ড। এতে এসএসসিতে ড্রপআউট, বাল্যবিয়ে, কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়াসহ বেশ কিছু কারণ উঠে আসে।
এর ওপর ভিত্তি করে বোর্ড কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন মোটিভেশনাল কার্যক্রমের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হয়। অনিয়মিত ও ড্রপআউট হওয়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় শিক্ষা জীবনে ফেরাতে অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা ও রেজিস্ট্রেশন-সংক্রান্ত কিছু জটিলতা শিথিল, বাল্যবিয়ে রোধে ভূমিকা, নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ এবং শিক্ষা কর্মকর্তাদের তদারকি বৃদ্ধির ফলে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে।
যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ফারুখে আযম মু. আব্দুস ছালাম বলেন, বোর্ডের বিভিন্ন মোটিভেশনাল উদ্যোগের ফলাফল সরাসরি সংখ্যাতাত্ত্বিক পুনরুদ্ধার। অর্থাৎ, ২০২২ সালের ভয়াবহ ধসের পর ২০২৪, ২০২৫ এবং চলতি ২০২৬ সালে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা আবার আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসাটা সবচেয়ে বড় সফলতা।











































