মিলি রহমান।।
গলব্লাডার (পিত্তথলি) আকারে ছোট হলেও হজম প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। এটি যকৃতে (লিভার) উৎপাদিত পিত্ত (Bile) জমা রাখে এবং চর্বিযুক্ত খাবার হজমে সহায়তা করে। কিন্তু গলব্লাডারে সমস্যা দেখা দিলে তা শুধু হজমেই নয়, পুরো শরীরের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রাথমিক লক্ষণগুলো দ্রুত শনাক্ত করা জরুরি।
গলব্লাডারের রোগ কী?
গলব্লাডারের রোগ বলতে পিত্তথলি বা পিত্তনালীর (Bile Duct) এমন সব সমস্যাকে বোঝায়, যা পিত্তের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত সমস্যা হলো গলস্টোন (পিত্তথলির পাথর), পিত্তথলির প্রদাহ (Cholecystitis) এবং পিত্তনালীর বাধা। এসব সমস্যার কারণে পিত্ত স্বাভাবিকভাবে অন্ত্রে পৌঁছাতে পারে না, ফলে হজমের সমস্যা, সংক্রমণ এবং গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
গলব্লাডার সমস্যার সাধারণ লক্ষণ—————–
১. পেটের ডান পাশের ওপরের অংশে তীব্র ব্যথা
গলব্লাডারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে ব্যথা। বিশেষ করে ভারী বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর এই ব্যথা শুরু হয়। ব্যথা কখনো হালকা, আবার কখনো তীব্র ও অসহনীয় হতে পারে।
২. বমি বমি ভাব ও বমি
চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর বারবার বমি বমি ভাব বা বমি হলে তা গলব্লাডারের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। কারণ গলব্লাডার ঠিকমতো কাজ না করলে চর্বি হজমে সমস্যা দেখা দেয়।
৩. হজমে সমস্যা
প্রায়ই পেট ফাঁপা, গ্যাস, বদহজম, খাবারের পর অস্বস্তি বা পেট ভারী লাগা—এসবও গলব্লাডারের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে এসব উপসর্গ যদি নিয়মিত দেখা দেয়, তবে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
৪. জ্বর ও কাঁপুনি
গলব্লাডারে সংক্রমণ বা প্রদাহ হলে জ্বর, কাঁপুনি এবং পেটের ডান পাশে তীব্র ব্যথা দেখা দিতে পারে। এটি জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
৫. জন্ডিস
ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস) পিত্তনালীতে বাধা বা গলস্টোনের কারণে হতে পারে। এটি গুরুতর লক্ষণ এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৬. মলের ও প্রস্রাবের রঙ পরিবর্তন
পিত্তের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে মলের রঙ ফ্যাকাশে বা সাদাটে হয়ে যেতে পারে এবং প্রস্রাব গাঢ় হলুদ বা অ্যাম্বার রঙ ধারণ করতে পারে। এ ধরনের পরিবর্তনও গলব্লাডারের সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।
৭. ব্যথা কাঁধ বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া
অনেক সময় পেটের ডান পাশের ব্যথা ডান কাঁধ, কাঁধের ব্লেড বা পিঠ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই এটিকে সাধারণ পেশির ব্যথা ভেবে ভুল করেন।
৮. অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া
হজমে দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে ক্ষুধামন্দা ও ওজন কমে যেতে পারে। যদিও ওজন পরিবর্তনের আরও অনেক কারণ থাকতে পারে, তবে অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গে এটি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত—————–
- পেটের ডান পাশে তীব্র বা বারবার ব্যথা।
- জ্বর ও কাঁপুনি।
- চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া।
- বারবার বমি।
- প্রস্রাব বা মলের রঙে অস্বাভাবিক পরিবর্তন।
- হজমের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা।
- সময়মতো চিকিৎসা না নিলে গলব্লাডারের সংক্রমণ, পিত্তনালী বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা গলব্লাডার ফেটে যাওয়ার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন?
গলব্লাডার সুস্থ রাখতে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস অনুসরণ করা জরুরি—
- অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খান।।
- পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল, আঁশযুক্ত খাবার ও স্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণ করুন।।
- নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন।।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন উপসর্গ উপেক্ষা করবেন না।
গলস্টোন বা অন্যান্য জটিল সমস্যা ধরা পড়লে চিকিৎসক প্রয়োজনে ওষুধ বা গলব্লাডার অপসারণের অস্ত্রোপচার (Cholecystectomy) করার পরামর্শ দিতে পারেন।
গলব্লাডারের সমস্যা শুরুতে সাধারণ গ্যাস বা বদহজম বলে মনে হলেও সময়মতো চিকিৎসা না নিলে তা গুরুতর রূপ নিতে পারে। তাই পেটের ডান পাশে ব্যথা, জন্ডিস, জ্বর, বমি বা দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যাকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জটিলতা এড়ানো সম্ভব এবং সুস্থ জীবনযাপন করা যায়।











































