Home Lead দখল-দূষণে প্রাণ হারাচ্ছে ভৈরব, হুমকিতে বাগেরহাটের প্রাণপ্রবাহ

দখল-দূষণে প্রাণ হারাচ্ছে ভৈরব, হুমকিতে বাগেরহাটের প্রাণপ্রবাহ

1



বাগেরহাট প্রতিনিধি ||

একসময় ভৈরব নদ ঘিরে গড়ে উঠেছিল বাগেরহাট শহরের জনপদ, বাজার-ঘাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য। সেই নদীই এখন দখল আর দূষণের চাপে অস্তিত্ব সংকটে। নদী রক্ষার অঙ্গীকার, উচ্ছেদ অভিযান ও বিভিন্ন উদ্যোগের পরও বাস্তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক সংগঠন এবং প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে নদীতীরের বড় একটি অংশ। একই সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্যের দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাগেরহাট শহরের উত্তর দিক থেকে প্রবাহিত হয়ে সুপারিপট্টি খেয়াঘাট অতিক্রম করে পূর্ব দিকে গেছে ভৈরব নদ। দক্ষিণাংশটি দড়াটানা নদী নামে পরিচিত। নদীর পশ্চিম তীরে গড়ে উঠেছে শহরের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা। কিন্তু নদীর দুই তীরজুড়ে এখন অবৈধ দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনার বিস্তার।

নদীর তীর ধরে এগোতেই চোখে পড়ে ময়লার স্তূপ। বিভিন্ন স্থানে কাঁচাবাজার, দোকানঘর, ডেকোরেটর প্রতিষ্ঠানের মালামাল ও ব্যবসায়িক সামগ্রী রেখে নদীর পাড় দখল করা হয়েছে। কোথাও কোথাও নদীর স্বাভাবিক সীমানাও চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ডাকবাংলো এলাকায় নদীর প্রায় ২৫ ফুট ভেতরে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। দড়াটানা নদীর ভদ্রপাড়া খেয়াঘাট এলাকায় কয়েক বছর আগে নদীর অংশ ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে দুই তলাবিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স। পাশের একটি চর ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে পার্ক। এতে নদীর প্লাবনভূমির একটি অংশ হারিয়ে গেছে। এ ছাড়া পার্কের প্রায় ৩০০ মিটার দক্ষিণে সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের আওতায় জেটি নির্মাণের জন্য নদীর ভেতরে পাইলিং করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন ড্রেন ও নালা থেকেও প্রতিনিয়ত বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে ভৈরব নদ রক্ষায় ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। পরে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। নদীর তীরে বৃক্ষরোপণ এবং সামাজিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নদী রক্ষার শপথ নেন। তবে সময়ের সঙ্গে সেই অঙ্গীকার টেকেনি।

পৌর এলাকার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, “প্রতিদিন এই নদীর পাড় দিয়েই চলাচল করি। চারদিকে ময়লার স্তূপ, দুর্গন্ধে হাঁটা দায়। ব্যবসায়ীরা যেন নদীর পাড়কে নিজেদের সম্পত্তি মনে করে মালামাল রেখে দখল করে রেখেছেন।”

পার্কের সামনে কথা হয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী মিরাজ শেখের সঙ্গে। তিনি বলেন, “মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনটি অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে। কয়েক মাস আগে ভেতরে একটি খাবারের দোকান চালু হয়েছিল, সেটিও এখন নেই। ভবনটি কার্যত কোনো কাজে ব্যবহার হচ্ছে না।”

ষাটোর্ধ্ব জেলে সুলাইমান মুন্সি বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই নদীতে মাছ ধরছি। আগে এই নদীর মাছ বিক্রি করেই অনেকের সংসার চলত। এখন সারাদিন জাল ফেলেও তেমন মাছ পাওয়া যায় না। নদীতে ময়লা ফেলা আর দখলের কারণে নদী ছোট হয়ে গেছে, মাছও কমে গেছে।”

এ বিষয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন বলেন, “পরিবেশ রক্ষায় আমাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত নদী পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।”

বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মনজুরুল হক রাহাদ বলেন, “ভৈরব নদ বাগেরহাটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ব্যক্তি নদীর পাড় দখল করে রেখেছেন। দ্রুত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বাগেরহাটের কোনো নদী বা খাল যাতে দখল না হয় সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”