Home আঞ্চলিক খাকি পোশাকের জল্লাদখানা, হকিস্টিকের ভয় আর পেছনের সেই ঘাতক

খাকি পোশাকের জল্লাদখানা, হকিস্টিকের ভয় আর পেছনের সেই ঘাতক

43


মিজানুর রহমান মিলটন।।


আমিহীন অবরুদ্ধ সেই ১০ জুনের কালবেলায় একদিকে যখন পরিবার আর সহকর্মীদের মাঝে কঠিন উদ্বেগ, অন্যদিকে তখন আমার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল-“আমি তো বন্দি, তাহলে আগামীকাল কীভাবে আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় ‘দৈনিক খুলনাঞ্চল’ পত্রিকা প্রকাশিত হবে?” কিন্তু বুকের ভেতর একটা গভীর বিশ্বাস ছিল, আমার অনুপস্থিতিতেও আমার প্রিয় বন্ধু কৌশিক আর পপলু ঠিকই পারবে, ওরা কাগজ প্রকাশ করবেই। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা ওরা রেখেছিল।


১১ জুনের সকাল: সাজানো নাটক ও হাতকড়া: পরের দিন, অর্থাৎ ১১ জুন সকালে আমাকে কালিয়া থানার সেই নোংরা হাজতখানা থেকে বের করা হলো। একটা কথা বলতে আজ আর দ্বিধা নেই, আমাকে যখন খুলনা থেকে অপহরণের মতো করে তুলে নেয়া হয়, তখন ওই এনজিওর আরও তিনজন আমার সাথেই গাড়িতে বন্দি ছিল। হাজত থেকে বের করেই আমাদের দুই হাত এক জোড়া শক্ত হাতকড়ায় বন্দি করা হলো। কালিয়া থানা পুলিশ মনের সুখে আমাদের সেই হাতকড়া পরা ছবি তুলল, যা পরবর্তীতে সুপরিকল্পিতভাবে সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছিল-আমার সামাজিক মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার জন্য।


এখানেই শেষ নয়, সিআইডির সেই কর্মকর্তা অলোক চন্দ্র হালদার আমাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি ‘মানি লন্ডারিং’ মামলা দায়ের করলেন। অথচ সেই মামলায় নতুনত্ব বা সত্যতার লেশমাত্র ছিল না। ওই এনজিও কর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় যেসব পুরোনো মামলা ছিল, সেগুলোকে উল্লেখ করে মামলাটি সাজানো হয়েছিল মাত্র।


এরপর কালিয়া থানা থেকে আমাদের নসিমন জাতীয় একটি লোকাল পরিবহনে করে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে নড়াইল আদালতে নিয়ে যাওয়া হলো। ততক্ষণে আমার স্বজনেরা বুকভরা আতঙ্ক নিয়ে আদালতে এসে উপস্থিত হয়েছেন। তারা তড়িঘড়ি করে আমার জন্য একজন আইনজীবী নিযুক্ত করলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই আইনজীবীও ছিলেন মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তার স্বজাতি!


আদালতে সিআইডির পক্ষ থেকে আমার ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হলো। শুনানির সময় আমার আইনজীবী আদালতকে জানালেন যে আমি একটি পত্রিকায় সাংবাদিকতা করি। কিন্তু অজ্ঞাত কোনো এক কারণে, তিনি আমার আসল পরিচয়-আমি যে ওই পত্রিকার ‘সম্পাদক ও প্রকাশক’, তা আদালতের সামনে উচ্চারণই করলেন না! নিজের আইনজীবীর এমন রহস্যময় আচরণে আমি চরম হতাশ ও দিশেহারা হয়ে পড়লাম। কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না। আদালত আমার ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলেন।


রিমান্ড মানেই ‘ডিমান্ড’: হকিস্টিকের ভয় ও ৬৮ হাজার টাকা: শুরু হলো রিমান্ডের নামে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। গভীর রাতে, আনুমানিক রাত তিনটার দিকে জিজ্ঞাসাবাদের নাম করে আমাকে একটি নিরেট অন্ধকার রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। চোখের সামনে ভেসে উঠল এক ভয়ার্ত পরিবেশ-রুমে অপরিচিত প্রায় ১০-১২ জন সিআইডি কর্মকর্তা বসা, আর আমার ঠিক পেছনে হকিস্টিক হাতে দাঁড়িয়ে আছে ৫-৬ জন জল্লাদ। ভেতরের পরিবেশটা এতটা বীভৎস ছিল যে আমি চরমভাবে ঘাবড়ে গেলাম। কারণ আমি জানতাম, এই রিমান্ডের ঘরে কত মানুষকে পিটিয়ে পঙ্গু করে দেওয়া হয়। আজ হয়তো আমার পালা! ঠিক আমার পাশেই তখন আরেকজন আসামিকে অমানুষিক নির্যাতন করা হচ্ছিল, তার আর্তনাদে চারদিকের বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল।


আমি আর সহ্য করতে না পেরে উপস্থিত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সরাসরি প্রশ্ন করলাম, “আপনারা কি আমার ওপর শারীরিকভাবে কোনো টর্চার করবেন?” তিনি কুৎসিত এক হাসি দিয়ে বললেন, “বোঝেনই তো, রিমান্ড মানেই ‘ডিমান্ড’। স্যারদের খুশি করতে হবে।”
আমি তখন নিজের জীবন বাঁচাতে বললাম, “থানার বাইরে আমার ছোটভাই রিফাত আছে, আপনারা দয়া করে তার সাথে কথা বলুন।” যথারীতি তারা বাইরে গিয়ে আমার ভাইয়ের সাথে কথা বললেন এবং আমার জান বাঁচানোর তাগিদে সেই রাতেই নগদ ৬৮ হাজার টাকা গুনে নিলেন এই খাকি পোশাকের খুনেরা।


টাকা পেয়ে তারা টেবিলে বসল জিজ্ঞাসাবাদের নামে গল্প সাজাতে। আমাকে অবান্তর সব প্রশ্ন করা হতে লাগল-আমি নাকি ওই এনজিওর প্রেস জোরপূর্বক লিখে নিয়েছি, ফ্ল্যাট লিখে নিয়েছি, পত্রিকা লিখে নিয়েছি ইত্যাদি ইত্যাদি! আমি বুকে সাহস নিয়ে শক্ত ভাষায় উত্তর দিলাম, “আমি এই পত্রিকা ও প্রেসের বৈধ মালিক। আর এর মালিকানা কোনো এনজিও দেয়নি, দিয়েছেন স্বয়ং জেলা প্রশাসক। আপনারা চাইলে ডিসি অফিস থেকে খোঁজ নিতে পারেন। আর ফ্ল্যাটের কথা বলছেন? তারা বিক্রি করেছে, আমি ন্যায্য মূল্যে কিনে নিয়েছি। দাতার নিজস্ব বাসভবনেই সেই রেজিস্ট্রি দলিল সম্পন্ন হয়েছে। আমি একজন নিয়মিত করদাতা। প্রতি বছর যথানিয়মে আয়কর রিটার্ন দিয়ে আসছি এবং আমার ট্যাক্স ফাইলে প্রতিটি সম্পদের বিবরণ স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে। এমনকি খুলনার মিউচুয়াল ট্রাষ্ট ব্যাংকে আমার নামে লোনও আছে।” আমার এতসব আইনি ও বৈধ নথিপত্রের সামনে সিআইডির সেই দুর্নীতিবাজ চক্র সেদিন কোনোভাবেই আমাকে দোষি প্রমাণ করতে পারল না।


বুক ফাটা কান্না ও সহকর্মী নামধারী ঘাতক: টানা তিন দিন আর চার রাত রিমান্ডের সেই নরকবাস শেষে আমাকে আবারও আদালতে তোলা হলো। কিন্তু দাপুটে সিআইডি কর্মকর্তা অনুপ কুমার দাশের হিংস্রতা তখনও শান্ত হয়নি। আদালতে তুলে নড়াইলের সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি মামলায় আমাকে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ (Shown Arrest) দেখানো হলো এবং নতুন করে আবারও ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হলো। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই মামলার মূল বাদী নিজেই আমাকে এজাহারে আসামি করেননি! কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনুপ কুমার দাশ নিজ দায়িত্বে আমাকে সেই মামলায় জড়িয়ে দিলেন। আদালত এবারও আমার ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলেন।


সেদিন নড়াইল আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমার বুক ফেটে কান্না আসছিল। হে ওপরওয়ালা! এ কোন দেশে বাস করছি আমরা? যেখানে কোনো অপরাধ না করেও শুধু ক্ষমতার লোভে একটা মানুষকে এভাবে পিষে ফেলা যায়? আবারও আমাকে সেই আগের নোংরা, পোকায় মাকড়ে ভরা সেলটিতে এনে রাখা হলো। আবারও আমার পরিবারের কাছে টাকা ডিমান্ড করা হলো এবং আমার স্বজনেরা নিরুপায় হয়ে তাদের সেই লোভের থাবা পূরণ করলেন।
দুই দিনের রিমান্ড শেষে যখন আমাকে আবারও আদালতে নেওয়ার জন্য থানা থেকে বের করা হলো, তখন আমার আয়নায় নিজের দিকে তাকানোর মতো অবস্থা ছিল না। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, সমস্ত শরীরে হাজতখানার ধুলাবালি আর চোখে ক্লান্তির অন্ধকার। থানা থেকে বের হওয়ার সময় গেটে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাধারণ পথচারী আমার এই জরাজীর্ণ ও অপরাধীর মতো রূপ দেখে পুলিশকে প্রশ্ন করে বসলেন-“আচ্ছা, এই লোকটা কি কোনো ধর্ষণ মামলার আসামি?” একজন সৎ ও কলমযোদ্ধা সাংবাদিকের জন্য এর চেয়ে বড় অপবাদ আর বুকে বিঁধে থাকা তীর আর কী হতে পারে?
তবে এই পুরো ট্র্যাজেডির সবচেয়ে অন্ধকার আর কুৎসিত দিকটি জানতে পারলাম রিমান্ডে থাকাকালীন সময়েই। আমাকে যখন সিআইডি কর্মকর্তারা জেরা করছিলেন, ঠিক তখন খুলনারই একজন পরিচিত সাংবাদিক (যার নাম ও পরিচয় আমি সময়মতো প্রকাশ করব) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা-কে ফোন দিলেন। ওই কর্মকর্তা ফোনটি কেটে না দিয়ে ‘লাউড স্পিকারে’ দিয়ে আমাকে শোনালেন।


ফোনের ওপার থেকে আমারই এক সময়ের সহকর্মী, সাংবাদিক নামধারী সেই ঘাতক অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেন-“মিলটনকে ভালো করে পিটিয়েছেন তো? যদি না পিটিয়ে থাকেন, তবে ওরে আরও ভালোভাবে পেটান!” বিগত ফ্যাসিবাদের দালালি করে খাওয়া, সুবিধাভোগী সেই কুলাঙ্গার সাংবাদিক আজও বুক ফুলিয়ে আমার সামনে ঘুরে বেড়ায়। সে জানে না, খাকি পোশাকের অনুপ কুমার দাশ আর অলোকদের মতো তারও মুখোশ একদিন এই খুলনার মাটিতেই টেনে হিঁচড়ে খুলে ফেলা হবে।


৮ বছর পর কেন এই খেরোখাতা খোলা?
প্রিয় পাঠক, এই লেখাটি পড়ার পর আপনাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগতে পারে-যে ঘটনা ঘটেছিল দীর্ঘ আট বছর আগে, এতগুলো বছর পার হয়ে যাওয়ার পর আজ কেন আমি স্মৃতির এই খেরোখাতা খুলে বসলাম? কেন এতদিন চুপ ছিলাম?


জবাবে অত্যন্ত দুঃখ আর ক্ষোভের সাথে বলবো-বিগত ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে এই দেশে মুক্তমনে লেখার বা সত্য প্রকাশের কোনো পরিবেশ ছিল না। চারদিকে ছিল স্বৈরাচারের দাপট, আইনের পোশাক পরা অপরাধীদের রাজত্ব আর সত্যের কণ্ঠরোধ করার হাজারো আয়োজন। তখন খাকি পোশাকের এই জল্লাদদের বিরুদ্ধে কলম ধরা মানেই ছিল নিজের এবং পরিবারের জন্য আরও বড় বিপদ ডেকে আনা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে বুটের তলায় পিষে ফেলা সেই বৈরী সময়ে মাথা উঁচু করে সত্যি কথা বলার ন্যূনতম কোনো সুযোগ ছিল না বলেই আমাকে দীর্ঘ আটটি বছর বুকের ভেতর এই নির্মম ক্ষত আর অন্যায়ের আগুন চেপে বাঁচতে হয়েছে।


আজ দিন বদলেছে, ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে। আজ প্রকাশের স্বাধীনতা কিছুটা হলেও ফিরে এসেছে বলেই এই সত্যকে পাঠকের দরবারে তুলে ধরার সাহস পাচ্ছি।


বুকের ভেতর জমানো সেই কষ্ট আর দীর্ঘশ্বাস আজ আর আমায় দুর্বল করে না। রিমান্ডের সেই হস্টিকের ভয়, হাতকড়ার অপমান আর চেনা মানুষের এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা আমাকে প্রতিদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার নতুন শক্তি দেয়। অন্যায় করে সাময়িকভাবে সত্যকে চাপা দেওয়া গেছে, আমার প্রিয় প্রেসটাকে আজ দীর্ঘ ৮ বছর ধরে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে; কিন্তু আমার ভেতরের সত্যকে ওরা মারতে পারেনি। প্রকৃতির আদালত চালু হয়েছে, মূল হোতা আজ শ্রীঘরে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে, আর বাকিদের হাতে হাতকড়া পরাও এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। জয় আমাদের হবেই! (চলবে)