মিজানুর রহমান মিলটন।।
১০ জুন। ক্যালেন্ডারের পাতায় হয়তো আর দশটা দিনের মতোই একটা সাধারণ দিন, কিন্তু আমার জীবনের ডায়েরিতে এই দিনটি এক নির্মম মহাকাব্য; জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষত আর চরম শিক্ষা নেবার দিন। ঠিক ৮ বছর আগের আজকের এই কালবেলাই আমি একটা চেনা চক্রের নিখুঁত আর বিষাক্ত পাতানো ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলাম। কাউকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করার, নিজের চেয়েও বেশি আপন ভেবে নেওয়ার কী চড়া মূল্য যে দিতে হতে পারে—তা সেদিন হাড়েমাজ্জে টের পেয়েছিলাম। বুক উজাড় করে যাদের ভালো চেয়েছি, দিনশেষে তাদেরই ছোঁয়া বিষাক্ত তীরের ক্ষত বুকে নিয়ে আমাকে একাকী লড়তে হয়েছে।
সেদিন একটা পুরো রাত আর দিন অপার্থিব বিষাদে কেটেছিল। বুকের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল এই ভেবে যে—ক্ষমতার দাপটে মানুষ এতটা নিচ, এতটা অকৃতজ্ঞ কীভাবে হতে পারে? তৎকালিন সিআইডির স্পেশাল পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম এবং তার দুই দোসর এসআই অনুপ কুমার দাশ ও এসআই অলোক চন্দ্র হালদার মিলে ক্ষমতার চেয়ারে বসে যে নীল নকশা বুনেছিল, তা দেখে থমকে গিয়েছিল আমার সরলতা।
নেপথ্যের পটভূমি: ৬০ লাখ টাকার খসড়া ও হুমকি: এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির সূত্রপাত ঘটেছিল আরও কিছুদিন আগে। আমি তখন খুলনা প্রেসক্লাবে পেশাগত দায়িত্বে ছিলাম। হঠাৎ সিআইডির একজন কর্মকর্তা এসে আমাকে জানান যে, ঢাকা সিআইডির এসএস মোল্লা নজরুল ইসলাম আমার সাথে জরুরি কথা বলবেন এবং আমাকে ওনার বাড়িতে যেতে হবে। সরল মনে আমি সেদিনই ওই লোকটির মোটর সাইকেলের পেছনে চড়ে ওনার বাড়ি চলে যাই।
সেখানে যাওয়ার পর মোল্লা নজরুল সাহেব ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সরাসরি মূল প্রসঙ্গে আসেন। তিনি বলেন, ওনার এলাকার কিছু মানুষ নাকি একটি এনজিওর কাছে ৬০ লাখ টাকা পাবে। আর সেই বিশাল অঙ্কের টাকা আমাকে পরিশোধ করতে হবে!
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। তীব্র প্রতিবাদ করে বললাম, “কেন? আমিতো ওই এনজিওর কেউ না! এনজিওর নির্বাহী কমিটি কিংবা সাধারণ কমিটি—কোথাও তো আমার নাম বা কোনো সম্পৃক্ততা নেই।”
কিন্তু ক্ষমতার অন্ধ মোহে অন্ধ মোল্লা নজরুল কোনো যুক্তি মানতে চাইলেন না। তিনি এক অদ্ভুত ও খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে বললেন, “আমি যেহেতু ওই এনজিওর ফ্ল্যাট কিনেছি, তাই আমাকেই ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে।” আমার অস্বীকৃতি দেখে তিনি আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সেখানে উপস্থিত এসআই অনুপ কুমার দাশকে নির্দেশ দিলেন—আমাকে যেকোনো মূল্যে মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার।
সেই কৃষ্ণপক্ষ: ১০ জুন ২০১৯: সেই অন্যায় আর অবৈধ নির্দেশেরই চূড়ান্ত রূপ ছিল ২০১৯ সালের ১০ জুনের সেই নাটকীয় অপহরণ ও গ্রেফতার। সেদিন দুপুর আনুমানিক দেড়টা। ঢাকায় কর্মরত তৎকালীন সিআইডি কর্মকর্তা এসআই অলোক চন্দ্র হালদার (বিপি নং ৮০১৩১৫৪১৪২) তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর (০১৭১২-৮৩২৮৬২) থেকে আমার ফোনে কল করেন। অপরপ্রান্ত থেকে অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে তিনি জানতে চান আমি কোথায় আছি এবং নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, আমার সাথে কিছু জরুরি কথা আছে।
আমি সরল বিশ্বাসে ওনাকে প্রশ্ন করলাম, “আপনারা কোথায়?” তিনি জানালেন, ওনারা তখন খুলনার হাদিস পার্কের সামনে আছেন। দুপুরের কড়া রোদে ওনারা কষ্ট করছেন ভেবে আমি পেশাদারিত্ব ও সৌজন্যতার খাতিরে আন্তরিকতার সাথে জানতে চাইলাম, “আপনারা দুপুরে খেয়েছেন কি-না?” যখন জানালেন ওনারা তখনও খাননি, তখন আমি ওনাদের ‘সিটি ইন’ hotels-এ আসার আমন্ত্রণ জানালাম। আমি তখন মিউচ্যুয়াল ট্রাষ্ট ব্যাংকে ছিলাম। সেখান থেকে কাজ শেষ করে আমার সঙ্গে আরিফুর রহমান টুকু ও ফাহিমকে নিয়ে সিটি ইন হোটেলে যাই এবং ওনাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। কিছুক্ষণের মধ্যেই সিআইডির এসআই অনুপ কুমার দাশ (বিপি নং ৮৬১৪১৭৪২৩১) এবং এসআই অলোক হালদার সেখানে এসে পৌঁছান। আমি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে হোটেলে ওনাদের আপ্যায়ন করি। কিন্তু আতিথেয়তার আড়ালে যে কতটা ভয়াবহ এক ফাঁদ পাতা ছিল, তা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল।
আতিথেয়তার আড়ালে অপহরণ:
আপ্যায়ন শেষে আমরা যখন নিচে নেমে এলাম, তখন দেখি ভবনের সামনে সিআইডি অ্যাপ্রন পরিহিত প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন লোক দাঁড়িয়ে আছে। আমি গেট দিয়ে পা বাড়াতেই অপেক্ষায় থাকাদের মধ্য থেকে একজন হঠাৎ আমাকে ‘সালাম’ দিয়ে শক্ত করে আমার হাত ধরে ফেলল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা আমাকে টেনেহিঁচড়ে তাদের মাইক্রোবাসে তুলতে লাগল।
হতভম্ব হয়ে আমি বারবার জানতে চাইলাম, “কারণটা কী? কেন আমাকে নেওয়া হচ্ছে?” কিন্তু কোনো উত্তর মিলল না। উল্টো নিমেষেই আমার হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হলো আমার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন। গাড়ি স্টার্ট হতেই দায়িত্বরত অফিসার ড্রাইভারকে কড়া গলায় নির্দেশ দিলেন, “৫ মিনিটের মধ্যে শহর ত্যাগ করো।”
গাড়ি ছুটে চলল। ওখান থেকে আমাকে সরাসরি খুলনা জেলখানা ঘাটে নিয়ে আসা হলো এবং ফেরিতে তোলা হলো। পুরোটা পথ আমি এক বুক আতঙ্ক আর বিস্ময় নিয়ে অনবরত অনুনয় করেছি কারণটা জানার জন্য, কিন্তু তারা পাথরের মতো নীরব রইল। ফেরিতে থাকা অবস্থায় হঠাৎ গাড়ির ভেতর থেকে আমি আমার সঙ্গী টুকুর কণ্ঠ শুনতে পেলাম। বুঝতে পারলাম, শুধু আমি নই, ওরাও এই নিখুঁত ষড়যন্ত্রের শিকার। এরপর সেখান থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো নড়াইলের কালিয়া থানায়। সেখানে আগে থেকেই তৈরি রাখা একটি এনজিওর সাজানো পাতানো মামলায় আমাকে আসামি দেখানো হলো এবং পরের দিনই নড়াইল আদালতে প্রেরণ করা হলো।
৫ দিন ৬ রাতের নরকবাস ও ২৯টি মামলার পাহাড়:
পরবর্তীতে নড়াইল সদর থানার একটি অন্ধকার কক্ষে আমাকে রিমান্ডের নামে আটকে রাখা হলো। সেই ৫ দিন আর ৬ রাতের স্মৃতি আজও আমার লোম খাড়া করে দেয়। মাথার ওপর কোনো ফ্যান নেই, কোণায় একটা নিভু নিভু লাইট জ্বলছে। রুমের ভেতরের টয়লেটটি সম্ভবত বিগত ৫-৬ মাস ধরে পরিষ্কার করা হয়নি; পুরো টয়লেটজুড়ে কিলবিল করছিল নোংরা পোকা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, কতটা অমানুষিক ও নারকীয় কষ্ট ছিল সেই দিনগুলোতে। শোয়ার মতো একটা মাদুর পর্যন্ত ছিল না; কনকনে মেঝে আর বালুর মধ্যেই পিঠ ঠেকিয়ে পার করেছি ওই বিভীষিকাময় সময়টা। খাওয়া নেই, গোসল নেই। রিমান্ডের সেই নরকযন্ত্রণা সহ্য করে যখন প্রথম মেডিকেল চেকআপে গেলাম, ডাক্তার জানালেন আমার শরীর থেকে ১৩ কেজি ওজন কমে গেছে!
এরপর শুরু হলো আইনি নিপীড়নের আরেক অধ্যায়। এক-এক করে খুলনা, যশোর, নড়াইল ও গোপালগঞ্জে আমার নামে মোট ২৯টি মিথ্যা মামলা ঠুকে দেওয়া হলো। টানা ৪ মাস ১৪ দিন আমাকে অন্ধকার কারাগারে বন্দি জীবন কাটাতে হলো। শুধু তাই নয়, একজন সংবাদকর্মীর মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে এবং সত্যের কণ্ঠরোধ করতে আদালত থেকে আমার প্রিয় পত্রিকা অফিস ও ছাপাখানাটি বন্ধ করে দেওয়া হলো—যা আজ দীর্ঘ ৮ বছর ধরে তালাবদ্ধ, নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে। ছাপাখানার সেই নীরবতা যেন প্রতিদিন আমাকে বিচারহীনতার গল্প শোনায়।
এমনকি কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়ার পর, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে চার্জশিট থেকে নাম বাদ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ৪ লাখ টাকাও হাতিয়ে নিলেন। কিন্তু হায়! টাকা নিয়েও সেই লোভী চক্র আমাকে চার্জশিট থেকে বাদ দেয়নি।
প্রকৃতির অমোঘ বিচার ও পুনর্জন্ম:
তারা ভেবেছিল চক্রান্তের বেড়াজালে আটকে আমার অস্তিত্ব, আমার সাংবাদিকতা আর মাথা উঁচু করে বাঁচার লড়াইটাকে চিরতরে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, মানুষের তৈরি করা অন্যায় আদেশের চেয়ে ওপরওয়ালার এজলাসের বিচার অনেক বেশি নিখুঁত আর শক্তিশালী।
প্রকৃতির কী অদ্ভুত প্রতিশোধ! আজ ৮ বছর পর সময়ের চাকা ঘুরে গেছে। সেই ষড়যন্ত্রকারীদের নেতৃত্বদানকারী দাপুটে সিআইডি কর্মকর্তা মোল্লা নজরুল আজ নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে শ্রীঘরে, জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি। আর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সেদিন যারা তার আজ্ঞাবহ হয়ে টেবিল সাজিয়েছিল, সেই এসআই অনুপ কুমার দাশ ও এসআই অলোক চন্দ্র হালদার হয়তো এখনও বাহিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে; কিন্তু তারা জানে না, পাপ কখনো বাপকেও ছাড়ে না। খুব শীঘ্রই তাদেরও এই পৃথিবীর আদালতে আইনের মুখোমুখি হতে হবে, হাতকড়া পরতে হবে ইনশাআল্লাহ।
সেই কঠিন সময়টা, সেই একাকী লড়াইটা আমাকে সেদিন হয়তো কাঁদিয়েছিল, কিন্তু আজ এই দীর্ঘ সময় পর এসে আমি বুঝতে পারি-ওটা আসলে আমার পুনর্জন্ম ছিল। মানুষ চেনার, খাকি পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল অপরাধীদের মুখোশ টেনে হিঁচড়ে খুলে ফেলার এক নির্মম পাঠশালা ছিল ওটা। কে বিপদে পাশে থাকার আর কে কেবল সুসময়ের কোকিল কিংবা পেছনের ঘাতক-তা আজ আমার আয়নার মতো পরিষ্কার।
বুকের ভেতর জমানো সেই কষ্ট আর দীর্ঘশ্বাস আজ আর আমায় দুর্বল করে না, বরং প্রতিদিন নতুন করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি দেয়। আমি বিশ্বাস করি, অন্যায় আর চক্রান্ত করে সাময়িকভাবে কোনো সত্যকে চাপা দেওয়া গেলেও, দিনশেষে সত্য আর সততার আলো ঠিকই অন্ধকারের বুক চিরে বেরিয়ে আসে।
যাঁরা সেদিন আমার সরলতার সুযোগ নিয়ে পেছনে ছুরি মেরেছিলেন, তাঁদের প্রতি আমার আজ কোনো ক্ষোভ নেই। আমি শুধু তাঁদের প্রকৃতির চরম বিচার আর নিয়তির আদালতের মুখোমুখি ছেড়ে দিলাম। সত্যের জয় নিশ্চিত, আজ হোক কিংবা কাল। চলবে
( লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক-দৈনিক খুলনাঞ্চল)










































